রাসূল সা.-এর হিজরতপূর্ব কুরআনি নির্দেশনা


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:৫৭

॥ শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ॥
রাসূল সা.-এর ঘটনাবহুল ও সংগ্রামমুখর মক্কার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে। তার আন্দোলন-সংগ্রাম যুগের নানা বন্ধুরপথ অতিক্রম করে উপনীত হয় বিজয় যুগে। রাসূল সা.-এর মক্কার জীবনের সর্বশেষ ঘটনা হিজরত। আবার এই হিজরতই হলো মাদানী জীবনের সূচনাপর্ব। অতএব আমরা হিজরতের আলোচনা একটি আলাদা অধ্যায়েই করতে চাই। তার আগে মক্কার জীবনে শেষ তিন বছরের মক্কার প্রতিকূলতা এবং মদিনার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার প্রিয়নবীকে যেসব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তার ওপর অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা জরুরি মনে করছি। মক্কী অধ্যায়ের এই পর্যায়ে আল কুরআনের যেসব সূরা ও আয়াত নাজিল হয়েছে, তার সবটাই অর্থবহ প্রণিধানযোগ্য এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। আমরা নিজেরা ঐ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে তা অধ্যয়ন করলেই তার মর্ম ও বাস্তবতা উপলদ্ধি করা সম্ভব হবে।
মক্কী অধ্যায়ের সর্বশেষ স্তরে অবতীর্ণ সূরা আন’আমের সবটাই আসন্ন প্রতিষ্ঠিতব্য ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার পূর্ব প্রস্তুতিমূলক হেদায়াতে ভরপুর, আমরা এ সূরা থেকে মাত্র চারটি অংশের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করব। মক্কার কাফেরদের চরম বিরোধিতায় অতিষ্ঠ হয়ে ঈমানদারদের অনেকের মনে দ্রুত আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো অলৌকিক সাহায্যের প্রত্যাশা অস্থিরতার জন্ম দেয়। এহেন মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা সামনে রেখে আল্লাহ তায়ালা যে হেদায়াত প্রদান করেন, তা নিম্নরূপ- “(হে মুহাম্মদ!) আমি জানি তারা যেসব বানোয়াট কথাবার্তা বর্ণনা করে, তাতে তোমার দুঃখ হয়, তুমি কষ্ট পাও। কিন্তু জেনে রাখ, এরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে না, প্রকৃত পক্ষে এই জালেমরা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনাবলীই অস্বীকার করছে। তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদেরও এভাবেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, অস্বীকার করা হয়েছে। তাদেরকে যে সব জ্বালা-যন্ত্রণা করা হয়েছে, তার ওপর তারা ধৈর্যধারণ করেছেন। অতঃপর তারা আমার সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। আল্লাহর এই বাণী এবং বিধানের কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধনের শক্তি কার নেই। অতীতের নবী রাসূলদের ইতিহাস সম্পর্কে তো অবহিত করাই হয়েছে। তাদের এই বৈরী আচরণ যদি তোমাদের সহ্য না হয়, তাহলে পারলে জমিনে কোনো সুরঙ্গ পথ তালাশ করো, অথবা সিঁড়ি লাগিয়ে আসমান থেকে নিদর্শন নিয়ে আনার চেষ্টা করে দেখতে পারো। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে তাদের সবাইকে হেদায়েতের ওপর একত্রিত করতে পারতেন। অতএব অজ্ঞ মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। সত্যের দাওয়াতে তারাই সাড়া দিতে সক্ষম হয় যারা (মনোযোগের সাথে) সত্যকে শুনতে প্রস্তুত। আর যারা মৃত (বিবেকহীন) তাদেরকে তো কবর থেকেই উঠানো হবে।” (সূরা আল আন’আম : ৩৩-৩৬)।
তদানীন্তন আরব বিশ্বের মুশরিক, ঈসায়ী ও ইহুদিদের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হযরত ইব্রাহীম আ., শিরকের বিরুদ্ধে তার ভূমিকাকে আল্লাহ তুলে ধরেছেন এভাবে; “স্মরণ কর ইব্রাহীম আ.-এর ঘটনা। যখন তিনি তার পিতাকে সম্বোধন করে বললেন, আপনি কি মূর্তিগুলোকেই আপনার খোদা বানিয়ে নিচ্ছেন। আমি তো আপনাকে এবং আপনার কওমকে প্রকাশ্যভাবে বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত দেখতে পাচ্ছি। আমি এভাবেই ইব্রাহীমকে আ. আসমান-জমিনের যাবতীয় রহস্য পর্যবেক্ষণ করিয়েছি। যাতে করে তিনি পূর্ণ একিনের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। অতএব যখন তার জন্য রাত ঘনিয়ে এলো এবং তিনি একটি তারকা দেখতে পেলেন বললেন, এই আমার রব। কিন্তু যখন সে তারকা ডুবে গেল তখন বলে উঠলেন, আমি এভাবে ডুবে যাওয়া কোনো কিছু পছন্দ করি না। এরপর যখন চাঁদের ঔজ্জ্বল্য দেখলেন তখন বললেন, এটাই আমার রব, কিন্তু চাঁদ ডুবে গেল, তখন বললেন, আমার রব যদি আমাকে পথ না দেখাতেন, তাহলে আমিও পথ ভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। অতঃপর যখন সূর্যের রোশনি দেখলেন, এটা আমার রব এটা সবচেয়ে বড়। অতঃপর এটি যখন অস্ত গেল তখন তিনি বললেন, হে আমার কওমের লোকেরা তোমরা আল্লাহর সাথে যেগুলোকে শরিক করো আমি সেসব থেকে আমার সম্পর্ক ছিন্ন করছি। আমি তো একনিষ্ঠ চিত্তে ধাবিত হচ্ছি সেই মহান সত্তার প্রতি, যিনি আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন। আমি কখনো শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আল আন’আম : ৭৪-৭৯)।
তওহীদ গ্রহণ ও শিরক বর্জনের মাধ্যমে যে ইসলামী সমাজ গড়ে উঠবে আর অল্প কিছু দিন পরেই সেই সমাজের মৌলিক বিধানের প্রাথমিক ধারণাও দেওয়া হয়েছে এই পর্যায়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুহাম্মদ সা.! তাদেরকে বলে দাও, আসো, আমি তোমাদের এই মর্মে অবহিত করি যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে কী কী বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ১. এক আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না। ২. পিতা মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে। ৩. দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তানকে হত্যা করবে না। আমি তোমাদেরও রিজিকের ব্যবস্থা করি এবং তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করি। ৪. প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কোনো অশ্লীলতার ধারে কাছেও যাবে না। ৫. অন্যায়ভাবে কারো জীবননাশ করবে না, আল্লাহ যাকে পবিত্র এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তোমরা যাতে বুঝে শুনে চলতে পারো এজন্যেই আল্লাহ তায়ালা এই হেদায়াত তোমাদেরকে দান করেছেন। ৬. বিধিসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া ইয়াতিমের মালের ধারেকাছেও যাবে না। (আর যদি বিধিসম্মতভাবে দায়িত্ব নেওয়া হয়) তাহলে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্তই হবে তার সময় সীমা। ৭. ওজনের ব্যাপারে ন্যায়-ইনসাফ সমুন্নত রাখো। আমরা মানুষের ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বোঝা বা দায়িত্বভার অর্পন করি না। ৮. আর যখন কথা বলতে হয় ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতে কথা বলবে। এমনকি যদি কোনো নিকট আত্মীয়দের বিপক্ষেও যায়। ৯. এবং আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা রক্ষা করো। তোমরা যাতে উপদেশ গ্রহণে সক্ষম হও এজন্যেই এই হেদায়াত প্রদান করা হলো। ১০. আর নিশ্চিত হও এটাই আমার নির্ধারিত সরল সঠিক পথ। তোমরা এ পথেই চল, অন্য কোনো পথ ও পন্থা অনুসরণ করবে না। (এমনটি করলে) তোমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে দিক ভ্রান্ত করে ছাড়বে। আল্লাহ তায়ালার এই নসিহত তোমাদেরকে সকল প্রকারের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্যে রক্ষা কবজ স্বরূপ।” (সূরা আল আন’আম : ১৫১-১৫৪)।
আল্লাহ প্রদত্ত এই সত্য-ন্যায়ের পথের যথার্থতার ওপর সুদৃঢ় আস্থাই ছিল তখনকার পরিস্থিতির দাবি, সেই সাথে এ ঘোষণারও প্রয়োজন ছিল যে এটা মুহাম্মদের কোনো নতুন সৃষ্টি করা পথ নয়, আরবের মুশরিক ও আহলে কিতাব (ইসায়ী ও ইহুদি) সকলের আদি পিতা ও কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ইব্রাহীমও আ. এ পথেরই অনুসারী ছিলেন। সেই সাথে এ ঘোষণাও প্রয়োজন ছিল যে, এক আল্লাহর রেজামন্দি ও সন্তুষ্টি ছাড়া পার্থিব কোনো স্বার্থই এ পথের পথিকদের কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আল্লাহ তায়ালার এই পর্যায়ের হোদায়াত; “হে মুহাম্মদ সা.! বলে দাও, আমার রব (আল্লাহ) আমাকে অবশ্য অবশ্যই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। পরিপূর্ণ সত্য দীন যাতে কোনো বক্রতা নেই। এটা তো ইব্রাহীম আ.-এর পথ ও পন্থা যা তিনি গ্রহণ করেছিলেন একনিষ্ঠভাবে। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বল, আমার নামাজ, আমার কুরবানিসহ যাবতীয় বন্দেগী, আমার জীবন, আমার মরণ সব কিছু সেই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের জন্যে যার কোনো শরিক নেই। এ ব্যাপারেই আমি আদিষ্ট। আর সবার আগে আমি তার অনুগত বান্দা হিসেবে তার দরবারে আত্মসমর্পনকারী।” (সূরা আল আন’আম : ১৬১-১৬৩)।
মক্কা থেকে মদিনায় রাসূলের সা. সাহাবীগণের হিজরত পর্যায়ক্রমে শুরু হয়ে যায়। খোদ রাসূল সা. আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায়। তার জন্যে মদিনার স্টেজ তৈরি প্রায়, এমন সময় কুরাইশ নেতৃবৃন্দ চূড়ান্ত আঘাত হানার চিন্তাভাবনা করতে থাকে। তারা সলাপরামর্শ করতে থাকে, মুহাম্মদকে সা. তারা কি হত্যা করবে, না কোথাও বন্দি করে রাখবে। ঠিক এমনি এক মুহূর্তে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নাজিল করেন আহসানুল কাছাছ সূরা ইউসুফ। হযরত ইউসুফের আ. ভাইদের যে আচরণে ইউসুফ আ.-কে কুয়ায় নিক্ষিপ্ত হতে হয়। বণিকদের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া গোলাম হিসেবে মিশরের বাদশাহর দরবারে আশ্রয় পাওয়ার পর হতে হয় জঘন্য চক্রান্তের শিকার। আল্লাহ তায়ালা তার এই প্রিয়নবীকে নিষ্পাপ জীবনের হেফাজতে সাহায্য করেন। তিনি জেল জীবন পছন্দ করলেন কিন্তু চরিত্র বিসর্জন দিলেন না। কারাবন্দী অবস্থা থেকে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইউসুফকে আ. তৌফিক দিলেন রাজদণ্ডের অধিকারী হবার। তার জীবননাশের ষড়যন্ত্রকারী ভাইদের কাছে ফিরে গেলেন পূজনীয় হিসেবে এবং তাদের প্রতি ঘোষণা করলেন ক্ষমা। পুরা সূরাটাই রাসূল সা. এবং তার সাথীদের জন্যে সবর ও ইস্তেকামাতের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস এবং সেই সাথে নিকট বিজয়ের সম্ভাবনার হাতছানি।
সূরা ইব্রাহীম এবং সূরা হিজরও এই পর্যায়ে নাজিল হয়। আমরা সব সূরার বিষয় বস্তু নিয়ে আলোচনা এই নিবন্ধে আনতে পারব না। আমি এরপর সূরা নহলের বিষয় বস্তুর প্রতি সিরাতে রাসূলের পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সূরা ‘আন’আম ও সূরা নহলের’ নাজিলের সময়কাল প্রায় কাছাকাছি। এ সূরায় শিরকের অসারতা ও যুক্তিহীনতা প্রমাণ করে তওহীদের যথার্থতা ও যৌক্তিকতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সেই সাথে নবীকে অস্বীকার করার খারাপ পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে এবং হকের বিরোধিতার ও এ পথে বাধা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কুফল সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
মক্কার কাফের-মুশরিকগণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বলতে থাকে আমরা এত প্রকাশ্যে নবীকে প্রত্যাখ্যান করছি, তার বিরোধিতা করছি, তবুও কেন এখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন আযাব আসে না, যে আযাবের তোমরা আমাদেরকে ভয় দেখাও। এটাকেই তারা মুহাম্মদ সা.-এর নবী না হওয়ার দলিল মনে করে বার বার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। তাদের জবাবে বলা হয়, নির্বোধ লোকেরা, আল্লাহর আযাব তো তোমার মাথার ওপর অপেক্ষমাণ। যেকোনো মুহূর্তে যা আপতিত হতে পারে। এটাকে এভাবে কামনা কর না। আল্লাহ কিছুটা অবকাশ দিয়েছেন সেই সুযোগটা গ্রহণ করে প্রকৃত সত্য অনুধাবনের চেষ্টা করো। এভাবে সত্য উপলব্ধি করানোর লক্ষ্যে এই হেদায়াত প্রদানের সাথে সাথে নিম্নোক্ত পাঁচটি বিষয় আমরা লক্ষ করতে পারি এ সূরায় শিক্ষণীয় দিকনির্দেশনা রূপে।
১. গোটা সৃষ্টি লোকের (আফাক ও আনফুস) সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহের চিত্তাকর্ষক বর্ণনার মাধ্যমে শিরকের অসারতা ও অযৌক্তিকতা যেমন প্রমাণ করা হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে তওহীদের যথার্থতা যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা।
২. নবী মুহাম্মদ সা.-এর নবুয়্যতের প্রত্যাখ্যানকারী ও সত্যকে অস্বীকারকারীদের যাবতীয় অভিযোগ, সন্দেহ সংশয়, যুক্তি ও বাহানাসমূহের এক এক করে জবাব দেওয়া হয়েছে।
৩. সত্যের মোকাবিলায় গর্ব অহংকার প্রদর্শনের এবং বাতিলের ওপর বহাল থাকার হঠকারী কার্যক্রমের কুফল ও অশুভ পরিণাম পরিণতি সম্পর্কে ভয় ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
৪. মুহাম্মদ সা. আনীত দীন মানুষের বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনে যে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে চায় তার অতি সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাণস্পর্শী ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে। সেই সাথে মুশরিকদের এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহকে রব মানার যে দাবি তারা করে থাকে তা শুধু মাত্র অর্থহীনভাবে মেনে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং এ ঘোষণার কিছু অন্তর্নিহীত দাবিও আছে। মানুষের বিশ্বাসে, নৈতিকতায় ব্যবহরিক জীবনে যার প্রতিফলন ঘটতে হবে। এ সূরার ৯০ নম্বর আয়াতটি এক্ষেত্রে নতুন আঙ্গিকে উপলব্ধি করা আমাদের সকলের হৃদয়কে ও বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হতে পারে যাতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, “আল্লাহ আদল, ইহসান এবং সেলায়ে রেহমীর (আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা) নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও জুলুম এবং সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে বলছেন, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেনÑ যাতে করে তোমরা তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।”
৫. একদিকে যেমন নবী মুহাম্মদ সা. এবং তার প্রিয় সাথী সঙ্গীদের মনোবল ও প্রত্যয় দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাদেরকে দীনের মৌলিক দাওয়াত হিকমত এবং মাওয়াজে হাসানার সাথে অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তেমনি এর সাথে সাথে কাফের-মুশরিকদের বিরোধিতা, তাদের পক্ষ থেকে সৃষ্টি করা বাধা-প্রতিবন্ধকতা এবং নির্যাতন ও নিপীড়নের মোকাবিলায় কী ভূমিকা পালন করা আল্লাহ পছন্দ করেন, তাও বুঝিয়ে বলা হয়েছে অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় যুক্তিপূর্ণ এবং আবেগময়ী নির্দেশনার মাধ্যমে। এই সূরার শেষ তিনটি আয়াত এই আলোচনার আলোকে আমরা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলে তা সকলের অন্তরকেই স্পর্শ করবে এক স্বর্গীয় অনুভূতিসহকারে। আল্লাহ তায়ালার এই পর্যায়ের হেদায়াত, “হে নবী! তোমার রবের প্রতি দাওয়াত দাও বুদ্ধিমত্তা ও উত্তম নসিহতের মাধ্যমে। আর লোকদের সাথে বিতর্কের অবস্থা হলে তাতে অংশ নেবে উত্তম ও মার্জিত উপায়ে। কে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিচ্যুত আর কে সঠিক পথে আছে এ বিষয়ে তোমার রবই বেশি ওয়াকিবহাল। যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও, তাহলে ঠিক ততটুকুই নিতে পার, যতটুকু অন্যায় তারা করেছে। কিন্তু যদি তোমরা সবর কর, তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখ সেটা সবরকারীদের জন্যেই হবে কল্যাণকর। হে মুহাম্মদ, ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথেই কাজ চালিয়ে যাও। তোমাদের এ সবর বা ধৈর্য সহনশীলতা আল্লাহ প্রদত্ত তওফিকের ফল। তাদের (কাফের মুশরিকদের) ব্যবহারে দুশ্চিন্তা করো না, তাদের কূটকৌশলের কারণে নিজেদের জন্যে আল্লাহর এ জমিনকে সংকীর্ণ ভেবনা। আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই তাদের সহায়, যারা তাকওয়ার ভিত্তিতে কার্যসম্পাদন করে এবং ইহসান বা যত্ন ও মহব্বতের সাথে দায়িত্ব পালন করে।” (সূরা আন নহল : ১২৫-১২৭)।
সূরা বনি ইসরাইলও এই প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা যেহেতু মিরাজের প্রসঙ্গে এ সূরার বিষয়বস্তু মোটামুটি আলোচনা করে এসেছি, অতএব এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি না পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য। অনুরূপভাবে কুরআন অধ্যয়নকালে মক্কী অধ্যায়ের সর্বশেষ স্তরে বাকি তিন বছরে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যেসব সূরা ও আয়াত নাজিল করেছেন, তার আলোকে বর্তমান বিশ্বের ঐসব দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীগণ বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা ও কর্মকৌশল উদ্ঘাটনে সক্ষম হবেন, যাদের দেশে ইসলামী আন্দোলন একটি সিদ্ধান্তকারী পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বাধাপ্রতিবন্ধকতা যেমন একদিকে আল্লাহর এ প্রশস্ত জমিনকে সংকীর্ণ করে তুলেছে, বিপর্যয়ের আশঙ্কা অনেকের মনে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি আবার হাতছানী দিচ্ছে সাফল্যের সোনালি সম্ভাবনারও। অধিকাংশ মুসলিম দেশে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে বিপর্যয়, মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সেসব অবস্থার পর্যালোচনাও হতে পারে কুরআনি হেদায়েতের আলোকে। “অতঃপর দুঃসময়ের পরেই আসবে সুসময়, সন্দেহ নাই দুঃসময়ের পরেই আসবে সুসময়।”
আল্লাহর এই আশ্বাসবাণীকে সম্বল করে ঠাণ্ডামাথায় পরিস্থিতির মোকাবিলাই হিকমতের দাবি। প্রতিকূল অবস্থায় দৃঢ়তার পরিচয় দেওয়াই ঈমানের দাবি যার অপর নাম সবর। এজন্যই ঈমানের পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, আল ঈমানু আস্সাবর ওয়াস্সামাহাত। ঈমান হলো মূলত ধৈর্য, সহনশীলতা ও হৃদয়ের প্রশস্ততার নাম। সূরা নহলের শেষ তিনটি আয়াতে আমরা দেখলাম। দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত ও উত্তম উপদেশের পর সবরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে প্রতিবাদ প্রতিশোধের অনুমতি দিলেও সবরকেই আল্লাহর পছন্দনীয় এবং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে যদি সবর কর তো সেটা সবরকারীর জন্যে উত্তম। তারপর জোর দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সবর কর। তোমার সবরের সাথে রয়েছে আল্লাহ ও তার সাহায্য।
লেখক : সাবেক আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সাবেক মন্ত্রী।