হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’

বিশ্বাসী মনন ও বৈপ্লবিক চেতনার নান্দনিক ইশতেহার


২৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৫

॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥
কবিতা কেবল শব্দের কারুকার্য, অলংকার কিংবা ছন্দের দোলা নয়; বরং তা মানুষের অবদমিত আকাক্সক্ষা, আত্মিক আরোহণ এবং চারপাশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শৈল্পিক ইশতেহার। কবি হলেন সেই দূরদর্শী দ্রষ্টা, যিনি সময়ের ক্ষতকে আপন বুকে ধারণ করেন এবং তাঁর কলমকে রূপান্তর করেন শানিত অস্ত্রে। যুগে যুগে কবিতা যেমন মানুষের হৃদয়ের সুকোমল বৃত্তিকে জাগিয়ে তুলেছে, তেমনি জালিমের প্রাসাদ কাঁপিয়ে দিতে বারুদ হিসেবেও কাজ করেছে। বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ধারাটি অত্যন্ত প্রবল ও সমান্তরাল। মহাকবি কায়কোবাদ, সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে ঐতিহ্যচেতনার কবি ফররুখ আহমদ কিংবা পরবর্তীকালের মরমী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক কবি মতিউর রহমান মল্লিক প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিশ্বাস ও নান্দনিকতায় সমাজ পরিবর্তনের গান গেয়েছেন। এই ধারারই এক দীপ্ত, আধুনিক এবং আপসহীন উত্তরসূরি কবি হাসান আলীম। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শ্বাপদ অরণ্যে অরণ্যে অগ্নিশিশু’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী সংযোজন। সমকালীন পতনোন্মুখ সমাজ, নৈতিক স্খলন এবং বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের ‘শ্বাপদ অরণ্য’ বা হিংস্র পশুর বনের বিপরীতে তিনি এক ‘অগ্নিশিশু’ বা বৈপ্লবিক প্রজন্মের আবাহন করেছেন। তাঁর কবিতা একাধারে কুরআনিক ঐতিহ্যের আলোয় পুষ্ট এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ। কবি হাসান আলীমের এই প্রথম কাব্যগ্রন্থের অন্তর্নিহিত ভাব, রূপক, প্রতীক ও শব্দচয়ন বিশ্লেষণ করলে তাঁর গভীর জীবনবোধ ও মৌলিক কাব্যভাবনার এক বহুমাত্রিক চিত্র উন্মোচিত হয়।
১. ইসলামী ঐতিহ্য চেতনা ও বিশ্বাসী মনন
হাসান আলীমের কাব্যভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক অবিচল বিশ্বাসী মনন। আধুনিক কবিতার প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ বা বস্তুবাদী ধারার বিপরীতে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ইসলামী বিশ্বাসের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অলৌকিক ঘটনাপুঞ্জকে কবিতার প্রধান উপজীব্য করেছেন। তাঁর উপমা ও রূপকগুলো সরাসরি কুরআন, হাদীস এবং ইসলামের সোনালি ইতিহাস থেকে উৎসারিত।
‘আমাকে একটি আলিঙ্গন দাও’ কবিতায় কবি আধ্যাত্মিক আরোহণের সর্বোচ্চ শিখর ‘মিরাজ’ এবং ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর ডানার আশ্রয় কামনা করেন, ‘আমাকে একটি মিরাজ দাও, হে কাক্সিক্ষত পুরুষ-আমার কম্পিত শরীরটাকে তোমার বাহুলগ্ন কর, তোমার ছয়শত পাখার উষ্ণ আরামে আমাকে পৌঁছে দাও সিদ্রাতুল মোন্তাহায়…।’
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মুজিজা ‘চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া’র প্রতি বিশ্বাসকে কবি বৈপ্লবিক শক্তির উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এই অলৌকিকতায় বিশ্বাসীরাই কেবল শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য উচ্চারণ করতে পারে, ‘চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাকে যারা বিশ্বাস করেছে-কেবল তারাই দগদগে রাজপথ থেকে বিপরীত উচ্চারণ করতে পারে…।’
এছাড়া ‘গৃহের অধিবাসীরা যখন’ কবিতায় মূসা (আ.)-এর লাঠি ও নূহের কবুতরের রূপক ব্যবহার করে কবি অশুভ শক্তির বিনাশ ও শান্তির বারতা ফুটিয়ে তুলেছেন, “আমার সাহসী হাত দুটো তখন মূসার কুদরতী লাঠির মত গিলে ফেললো সবকিছু। শান্তির আয়াত ঠোঁটে করে নূহের কবুতরের মতো সমস্ত পৃথিবী ঘুরে আমার সন্তানদের সাথে গোল হয়ে বসে পড়লাম।’
২. বৈপ্লবিক ও আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনা
হাসান আলীম কেবল একজন মরমী কবি নন, বরং তিনি একাধারে একজন দ্রোহী ও বিপ্লবী। তাঁর কাব্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। শোষকদের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ ও পুঁজিপতিদের তিনি ইতিহাসখ্যাত খলনায়কদের সাথে তুলনা করেছেন এবং তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘একটি শিশুর আগ্নেয় প্রসব’ কবিতায় কবির এই পুঁজিবাদবিরোধী এবং বৈপ্লবিক সত্তা অত্যন্ত নগ্ন ও সোচ্চার, ‘এইসব বস্তুবাদী সভ্যতা ভেঙে ফ্যালো বণ্টন করে দাও কারুনের ধন চুরমার করে ফ্যালো সাদ্দাতের বেহেস্ত।’
একইভাবে, কাব্যগ্রন্থের নামাঙ্কিত কবিতা ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে কবি আধুনিক যুগের চাটুকার সাংবাদিকতা, কলুষিত নগরজীবন এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসের আকুতি প্রকাশ করেন, ‘ইচ্ছে হয় এই সব অর্বাচীন সাংবাদিকসহ বেশ্যালয় সমৃদ্ধ প্রাসাদ নগরী নিমিষে ধ্বংস করে দেই অথবা একটি প্রচণ্ড ধমকে নিভে যাক যত কৃত্রিম বাতি লুত নগরীর মতো উল্টে যাক অভিশপ্ত জনপদ…।’
কবি মার্ক্সবাদী বা অন্যান্য বস্তুবাদী মতাদর্শের অসারতা তুলে ধরে ইসলামী বিপ্লবের ঘোষণাকেই মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি তাঁর পিতার কণ্ঠ দিয়ে বলিয়ে নেন এক অবিনাশী স্লোগান, ‘কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য।’
৩. ‘অগ্নিশিশু’র রূপক ও আগামীর আবাহন
কাব্যগ্রন্থের শিরোনামের ‘অগ্নিশিশু’ বা ‘আগ্নেয় শিশু’ মূলত আগামীর বিপ্লবী ও আপসহীন প্রজন্মের প্রতীক। কবি যে সমাজ ও সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাকে তিনি ‘শ্বাপদ অরণ্য’ বা হিংস্র পশুর বন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই অন্ধকার ও হিংস্র অরণ্যকে পুড়িয়ে ছারখার করে আলোর জনপদ তৈরি করবে যে সাহসী সন্তান, সে-ই হলো ‘অগ্নিশিশু’। ‘আমাকে একটি আলিঙ্গন দাও’ কবিতায় কবি এমন এক নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখেন যারা জালিমের প্রাসাদ কাঁপিয়ে দেবে, ‘…আমাকে এমন একটি রাত উপহার দাও যেন আমার গর্ভের সন্তানেরা এক একটা বিপ্লবী আক্কানীর মতো উপল উপত্যকা পেরিয়ে আসে। মুক্ত স্বদেশে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে আনে সফেদ শিশুর… যে শিশুর চোখে মুখে ইব্রাহীমের জ্যোতির্ময় সাহস ঝলসে দ্যায় জালিমের প্রাসাদ…।’
এই অগ্নিশিশুর জন্ম সহজ কোনো প্রক্রিয়ায় হয় না, এর জন্য প্রয়োজন হয় তীব্র প্রসববেদনা ও আত্মত্যাগ। ‘একটি শিশুর আগ্নেয় প্রসব’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘ঘনিষ্ঠ শরীরের খণ্ডিত সুখ-আমার বুকের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে কেবল রক্তাক্ত শিশুর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।’
৪. দেশজ প্রকৃতি, নদী ও মৃত্তিকাসংলগ্নতা
হাসান আলীমের কবিতার আরেকটি বড় শক্তি হলো বাংলার চিরন্তন প্রকৃতি, নদী ও মাটির প্রতি গভীর টান। তবে এই প্রকৃতি কেবল সুন্দরের আধার নয়, তা কবির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ভাবনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর উত্তাল স্রোত তাঁর কবিতায় বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ‘পানকৌড়ি’ কবিতায় কবি একটি জলচর পাখিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের আত্মার অন্তহীন যাত্রা ও সত্যের অনুসন্ধানের গল্প বুনেছেন। বাংলার চিরচেনা নদীগুলো কীভাবে পরশপাথরের খোঁজে ব্যাকুল, তা কবি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, ‘তোমার ভূ-ভাগে উতরোল কল্লোল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কুমার পরিতৃপ্ত হতে চায় পরশ পাথরে! তোমার ব্যথিত নীরব শরীর সমস্ত বাঁধা উপড়ে চলেছে নিরন্তর জলচর হিংস্র হায়েনার থাবা থেকে এক অদৃশ্য মোহনায়।’
মাটি ও বিশ্বাসের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায় ‘মাটির কেলাস থেকে’ কবিতায়। কবি শ্রম, ঘাম এবং মাটিকে ইবাদতের অনুষঙ্গ করে তুলেছেন, ‘যতক্ষণ পারো এই লবণাক্ত অঙ্গের ভেতর তোমার সমস্ত শ্রম রুয়ে দাও, মাটির কেলাস থেকে বেড়ে যাক সবুজ জায়নামাজ।’ এখানে ‘সবুজ জায়নামাজ’ হলো প্রকৃতির শাশ্বত রূপ এবং বিশ্বাসের এক নান্দনিক মেলবন্ধন।
৫. শহীদী তামান্না ও ইসলামী আন্দোলনের ত্যাগ
কবির কাব্যভাবনায় ইসলামী আন্দোলনের ত্যাগ, শাহাদাতের তামান্না এবং সমকালীন শহীদী স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। ‘সুজনের কাছে লিখছি’ কবিতাটি কবি উৎসর্গ করেছেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কবি মতিউর রহমান মল্লিককে। এই কবিতায় কবি নিজের অক্ষমতা ও অপরাধবোধ প্রকাশের পাশাপাশি আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি পরম ভক্তি প্রকাশ করেছেন, ‘আসলে আপনারা তো আল্লার খাস বান্দা তাই আপনাদের সোনালি শরীর থেকে রক্ত ঝরে উর্বর হয়ে যায় ঊষর জমিন আর যারা আরশ মহল্লায় ঢুকে গেল আল্লার খাস কামরায় চলে গেল রক্তাক্ত শরীরে, আমি নির্বাক মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি।’
ইতিহাসের কারবালার ট্র্যাজেডি এবং ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতি কবিকে আন্দোলিত করে। সামান্য আঙুলের ব্যথায় কবি শানিত হন এক শাশ্বত ত্যাগের স্মরণে, ‘কি আর করব হৃদয়ে ব্যথায় ভরে যায়, দরোজা বন্ধ করার সময় কখনো আঙুলে চাপ লাগলে আঁতকে উঠি-আহা! সাবলীল ছুরি, তুই কীভাবে শাব্বিরের কলিজা পর্যন্ত ঢুকে গেলি!’
‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ কবিতার চতুর্থ খণ্ডে কবি ইসলামের ইতিহাসের মহান ত্যাগী সাহাবী হানযালা (রা.)-এর বাসর ঘর ছেড়ে জিহাদের ময়দানে ছুটে যাওয়ার ঘটনাকে আধুনিক বিপ্লবীদের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন, ‘যারা সিংহ পুরুষ, মৃত্যুর ভয় করে না তাদের হৃদয়ে বেহেস্তেরই কলকল শব্দ হানযালা-প্রেম শেখায়, বাসর ঘর থেকে যিনি ছুটে ছিলেন যুদ্ধের মাঠে, আমরণ যুদ্ধ করে পেলেন শরবৎ শাহাদাৎ-মৃত্যুহীন আবেহায়াত।’
৬. প্রেম, কাম ও দ্রোহের নান্দনিক রূপান্তর
হাসান আলীমের কবিতায় প্রেম ও কামের অনুষঙ্গ এসেছে অত্যন্ত সাহসী ও রূপকীয় অর্থে। তিনি দৈহিক মিলন বা প্রেমকে কেবল জৈবিক আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং একে বৈপ্লবিক শক্তির জন্মদাত্রী এবং আধ্যাত্মিক আরোহণের মাধ্যম হিসেবে দেখিয়েছেন। ‘একটি শিশুর আগ্নেয় প্রসব’ কবিতায় কবি শরীরকে উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান এক বৃহত্তর সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘তোমার সোনার শরীর তামাম খুলে ফ্যালো পাথরের বুক থেকে যেভাবে পাহাড়ী ঝর্ণারা নির্দ্বিধায় উলঙ্গ হয়ে যায়…’।
দৈহিক উষ্ণতা ও মিলনের তীব্রতা কবিকে শেষ পর্যন্ত এক বৈপ্লবিক ঝড়ের দিকে ধাবিত করে, ‘হে বন্ধু, আমাকে তুমি আলিঙ্গন কর, আমার শরীরে এনে দাও আগ্নেয় প্রপাত আমার ঔরস থেকে বের হোক জালিমের সর্বনাশ পৃথিবীজুড়ে শুরু হোক প্রচণ্ড ঝড়।’
এখানে কাম বা শরীরী প্রেম শেষ পর্যন্ত ‘জালিমের সর্বনাশ’ করার হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়। কবির এই ভাবধারা বাংলা কবিতায় বেশ অভিনব এবং শক্তিশালী।
৭. রূপক ও প্রতীকের সার্থক প্রয়োগ
কবির কাব্যভাবনা প্রকাশে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কিছু প্রধান প্রতীক নিচে আলোচনা করা হলো-
পিতা : ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ কবিতায় ‘পিতা’ কেবল একজন জন্মদাতা নন, বরং তিনি আদর্শিক গুরু, সত্যের প্রকৌশলী এবং স্বয়ং রাসূল (সা.)-এর ছাত্রের প্রতীক। যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যের ইমারত নির্মাণ করে গেছেন।
হীরামন পাখি/আলোর পাখি : এটি মানুষের ভেতরকার খাঁটি আত্মা, বিবেক এবং সত্যের দিশারীর প্রতীক।
আঁধার গাঁ/লুত নগরী : এটি সমকালীন নৈতিক স্খলন, পতন এবং শোষণে জর্জরিত সমাজের প্রতীক।
রাইফেল ও বাউলের কণ্ঠ : আধুনিক অস্ত্রের শক্তির সাথে দেশজ ও মরমী সুরের মেলবন্ধন, যা কবির বিপ্লবী ও কবিসত্তার যুগলবন্দী প্রকাশ করে। যেমনটি কবি লিখেছেন, ‘আমার হাতের রাইফেল যার পবিত্র মুখ থেকে জন্মভূমির জন্য আশীর্বাদ ঝরেছে শত্রুর মুখে, সেই রাইফেল থেকে বাউলের কণ্ঠ বের হ’ল ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়…।’
পরিশেষে বলা যায়, হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অরণ্যে অগ্নি শিশু’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো এক গভীর জীবনবোধ, আধ্যাত্মিক আকুলতা এবং আপসহীন রাজনৈতিক চেতনার দলিল। তিনি সমকালীন ঘুণেধরা সমাজ ও বৈশ্বিক জালিমের শাসনব্যবস্থাকে ভাঙতে চান ইসলামের বিপ্লবী আদর্শের হাত ধরে। তার কাব্যভাবনা কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; তা একই সাথে মরমী, প্রেমিক, দেশপ্রেমিক এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী। বিশ্বাসকে কবিতার প্রধান শক্তি বানিয়ে, দেশজ প্রকৃতির উপাদানে তা রূপায়িত করে হাসান আলীম বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ও দীপ্তিময় কাব্যভুবন সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ‘অগ্নিশিশু’রাই মূলত কবির কাক্সিক্ষত আগামীর মুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক পৃথিবীর দিশারী।