বাংলা ভাষা হত্যাকারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর


২৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৬

॥ শেখ নজরুল ॥
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার হিন্দু নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের হিন্দু জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। কিন্তু প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি কিছুই করেননি; এমনকি তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে মুসলমানদের পড়াশোনা করার সুযোগ তিনি উইল করে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন জনগণের বাংলা ভাষা হত্যাকারী! তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের সহযোগিতা নিয়ে সুলতানী আমলের বাংলা ভাষাকে হত্যা করেছিলেন। বাংলা ভাষা থেকে আরবি/ফার্সি শব্দকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। তিনি তৈরি করেছেন সংস্কৃতঘেঁষা হিন্দুয়ানী বাংলাভাষা।
বাংলা ভাষায় অকারণ অপ্রচলিত সংস্কৃত বহুল শব্দ ব্যবহার করার রীতিকে তীব্র সমালোচনা করে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, একদিকে পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; অপরদিকে খ্যাতনাম অক্ষয় কুমার দত্ত, এই উভয় যুগপ্রবর্তক মহাপুরুষের প্রভাবে বঙ্গভাষা যখন নবজীবন লাভ করিল, তখন তাহা সংস্কৃত বহুল হইয়া দাঁড়াইল। বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অক্ষয়বাবু উভয়ে সংস্কৃত ভাষাভিজ্ঞ ও সংস্কৃত ভাষানুরাগী লোক ছিলেন; সুতরাং তাহারা বাঙ্গালাকে যে পরিচ্ছদ পরাইলেন তাহা সংস্কৃতের অলঙ্কারে পরিপূর্ণ হইল। (বিদ্যাসাগর : নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুননির্মাণ-দেবোত্তম চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা ৪২৮)।
ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার সংস্কার সম্পর্কে বিচারপতি আবদুল মওদুদ লিখেছেন, তা কেবল সংস্কৃতঘেঁষা নয়, একেবারে সংস্কৃতসম। আর এটিও হয়েছে সুপরিকল্পিত সাধনায়-হিন্দু পণ্ডিতরা উল্লসিত হলেন। মুসলমানের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাকে সাহিত্য ও কালচারের দিক দিয়েও নিঃস্ব করে দিতে। (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর -বিচারপতি আবদুল মওদুদ, পৃষ্ঠা৩৮৫)।
কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে রেনেসাঁ বা আধুনিকতা গড়ে উঠেছিল তাকে ইউরোপীয় অর্থে রেনেসাঁ বলা যায় না। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলেছেন প্রথম দিকে কলকাতার আধুনিকতায় কিছুটা উদারতা থাকলেও পরবর্তীতে তা হিন্দু জাতীয়তাবাদী আধুনিকতায় পরিণত হয়। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-বিবেকানন্দ এই আধুনিকতাকে আত্মসাৎ করেন এবং এই আধুনিকতাই পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে বিজয়ী হয়।
এই আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামোফোবিয়া। সাম্প্রদায়িকতা এই আধুনিকতাকে কতখানি আচ্ছন্ন করেছিল তার একটা উদাহরণ দেই। এটির বর্ণনা দিয়েছেন এদেশের প্রগতিশীল নাট্য আন্দোলনের পথিকৃত মোহাম্মদ জাকারিয়া। এর বাড়ী পশ্চিমবাংলার বীরভূমে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর ইনি এপারে চলে আসেন। ইনি ১৯৮৭ সালে সানন্দ পত্রিকায় একটা সাক্ষাতকার দেন সেটির কিয়দংশÑ
থিয়েটার নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা, বিটিভির প্রযোজক ও একুশে পদক প্রাপ্ত অভিনেতা মোহাম্মদ জাকারিয়ার জবানিতে মুকুল শিকদার লিখেছেন, “কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ উঠে এলো বীরভূমে। আমি তো কলেজে পড়তে পারার আনন্দে আত্মহারা। তাছাড়া বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তে পারার আনন্দ সত্যি অন্যরকম। স্কুলে বিদ্যাসাগরকে পেয়েছিলাম পাঠ্য হিসেবে। মায়ের কাছে স্কুলের স্যারদের কাছে বিদ্যাসাগরের কথা কতভাবে শুনেছি। তাই সঙ্গত কারণে বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু বিদ্যাসাগর কলেজের ভর্তি ফরম আনতে গিয়ে শুনলাম, কোনো মুসলমান ছাত্র বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তে পারবে না। কারণ তিনি তার উইলে স্পষ্ট উল্লেখ করে গেছেন হিন্দু ছাত্র ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বী ছাত্র তার কলেজে পড়তে পারবে না । রাগে,দুঃখে এবং অপমানে সেদিন কেঁদে ফেলেছিলাম। বিদ্যাসাগরের প্রতি একটা তীব্র ঘৃণা আমাকে আপ্লুত করেছিল। বিদ্যাসাগরের মত মানুষও এতটা সাম্প্রদায়িক ছিলেন, অথচ বাহির থেকে তাকে কত বড় করে দেখানো হয়েছে”। সূত্র : পাবলো পিকাসো ও অন্যান্য প্রবন্ধ-মুকুল শিকদার, পৃষ্ঠা ১৩।
বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল। সেই সংস্কৃত কলেজে কায়স্থ বর্ণের বাইরে তিনি কাউকে ভর্তির অনুমোদন দেননি। এ বিষয়ে তিনি ঈধঢ়ঃধরহ ঋ.ঋ.ঈ ঐধুবং, গ.অ. ড়ভভম. ঝবপৎবঃধৎু, ঈড়ঁহপরষ ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ-কে যে চিঠি দিয়েছেন, তা বিনয় ঘোষ তার লেখা বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ গ্রন্থের ৫৪২, ৪৩, ৪৪ পৃষ্ঠায় তুলে ধরেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যতদিন সংস্কৃত কলেজের প্রধান ছিলেন ততদিন উচ্চবর্ণের হিন্দু ছাড়া নিম্নবর্ণজাত শুদ্ররা সংস্কৃত কলেজের সমস্ত শাখায় পড়ার সুযোগ পায়নি। “তাহার (বিদ্যাসাগর) মত এই যে, শুদ্রসন্তানেরা ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, ও দর্শনশাস্ত্র অধ্যায়ন করিতে পারিবেন, শাস্ত্রে কোনো স্থানে ইহার বাধা নাই। কেবল ধর্মশাস্ত্র স্মৃতি অধ্যয়ন করিতে পারিবেন না”। (বিদ্যাসাগর জীবনচরিত-শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন,পৃষ্ঠা ৯৬)। এই হল আমাদের করুণাসাগর -বিদ্যাসাগর!
স্বশ্রেণির সীমানার বাইরে সাধারণ জনসমাজে শিক্ষা বিস্তার হোক এটাও বিদ্যাসাগর চায়নি। জনসাধারণের মধো শিক্ষাবিস্তারের জন্য অল্প খরচে কীভাবে বিদ্যালয় স্থাপন করা যায়, সে সম্বন্ধে যখন ভারত সরকার বাংলার ছোট লাট গ্র্যান্ট সাহেবের মতামত জানতে চান, তখন ছোটলাট গ্রাম্য বিদ্যালয় সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে পরামর্শ গ্রহণ করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর ১৮৫৯ সালে বিদ্যাসাগর ছোটলাটকে লেখা চিঠিতে গ্রাম্য বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তার যুক্তি তুলে ধরেন। (বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ -বিনয় ঘোষ, পৃষ্ঠা ৪৪২-৪৩)।
কলকাতার আধুনিকতা হিন্দু মেলা, শিবাজী উৎসবের রাজনীতি চালু করেছিল। যে রাজনীতিতে মুসলমানকে আত্মীয় না করে পর করে দেয় এবং এর তোড়ে এক সময় ভারত ভেঙে দুভাগ হয়ে যায়। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বয়স ছিল ৩৭ বছর। এই বিদ্রোহে তাঁর ভূমিকা কি ছিল? সেই সময়ের ইতিহাস যতটুকু জানা যায়, তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের সহযোগী! পড়ষষধনড়ৎধঃড়ৎ!
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘বাঙালার ইতিহাস’ গ্রন্থে অভিশপ্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণগান গেয়েছেন। উক্ত গ্রন্থে বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে, বাঙ্গালা দেশের যে বিশেষ উপকার দর্শিয়াছে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এরূপ না হইয়া যদি, পূর্ব্বের ন্যায় রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনূতন পরিবর্ত্তের প্রথা চলিত থাকিত, তাহা হইলে এদেশের কখনই মঙ্গল হইত না।”
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়Ñ এরা সতীদাহ প্রথা এবং বিধবা বিবাহ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু বর্ণপ্রথা নিরসনের চেষ্টাও করেননি। তারা কি পারতো না এ ঘৃণ্য প্রথা দূর করতে? অবশ্যই পারতো। কেন করেননি? না করার কারণ একটাই, তারা চেয়েছিলো মানবতাবিরোধী এই জাতপাতকে টিকিয়ে রাখতে।
বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, হিন্দু বিধবাদের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে তাঁর হৃদয় বিগলিত হলেও দরিদ্র কৃষকদের ওপর নীলকরদের নির্যাতন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হাজারো অত্যাচার তার মনকে বিন্দুমাত্র আলোড়িত করেনি। তাই বিধবাবিবাহের সংস্কার আন্দোলনে তিনি প্রচুর অর্থ ও শক্তি ব্যয় করলেও নিজের কথা, লেখা ও কর্মের মাধ্যমে বৃহত্তর কৃষক সমাজের সুখ-দুঃখের প্রতি তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। (পৃষ্ঠা-৯১)।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বেশিরভাগ জমিদারীই বানিয়ারা হস্তগত করে । বানিয়াদের বেশিরভাগই ছিল শহরবাসী হিন্দু ধনী ব্রাহ্মণ এবং ইংরেজরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করে হিন্দুদের মধ্যে থেকেই এই নতুন অভিজাত শ্রেণি সৃষ্টি করেছে। অনভিজ্ঞ ইংরেজ কালেকটরদের সাহায্যে করতো হিন্দু দেওয়ান সেরেস্তাদার মুন্সী ও মুৎসুদ্দীদরা। এদের সাহায্যে ইংরেজরা এক নতুন অভিজাত শ্রেণি সৃষ্টি করেছে।
হান্টার লিখেছেন, “এ পর্যন্ত যে সব হিন্দু গোমস্তা অত্যন্ত ছোটখাটো স্তরের কাজে নিযুক্ত ছিল, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তারা সবাই জমিদার বনে গেল, জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করলো এবং তাদের ঘরে সেই সব ধনদওলত জমা হতে লাগলো যেগুলি পূর্বে মুসলমানদের আমলাদারিতে তাহাদের ঘরেই জমা হতো ।” এবং পরে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, গত পঁচাত্তর বছরের বাংলার মুসলমান পরিবারগুলি হয় উৎখাত হয়েগেছে না হয় আমাদের শাসনামলের নয়া সমাজের নিম্নস্তরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
কুখ্যাত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্বন্ধে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেছেন, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে বাঙ্গালা দেশের যে সবিশেষ উপকার দর্শিয়াছে ইহাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ (ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর : উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ-বদরুদ্দীন উমর)।
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একটা রোমহর্ষক বর্ণনা রয়েছে। তিনি মায়ের আদেশ পালন করতে গিয়ে দমোদর নদী সাঁতরে পাড় হয়েছিল। এটা মাতৃভক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন। সন্দেহ নেই। কিন্তু এটি নিছকই একটা কল্পকাহিনী। আর এ ব্যাপারে কঠিন প্রতিবাদ করেছেন ভাই শম্ভুচন্দ্র নিজে। অর্থাৎ যার বিয়ে উপলক্ষ্যে এই কাহিনীর সূত্রপাত।
শম্ভুচন্দ্র বলছেন, “দাদা ১৮৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১৮৪৬ সালের ৩ এপ্রিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেরেস্তাদার ছিলেন। সেইসময়েই আমার বিয়ে হয়। কিন্তু চণ্ডীচরণ সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা লিখেছেন। কারণ আমাদের বাড়ি যেতে গেলে তারকেশ্বর দিয়ে যেতেই হয় না। দাদা একবার মাত্র শৈশবে বাবার সঙ্গে তারকেশ্বর গিয়েছিলেন। এরপর কখনো যাননি।
আমরা তখন কলকাতা থেকে বাড়ি যেতাম হেঁটে। কোনো স্টিমার ছিল না। কোনো নৌকাও ছিল না। হাটখোলার ঘাট পাড় হয়ে শালিখার (বর্তমান সালকিয়া) বাঁধা রাস্তায় যেতাম মশাট গ্রাম। তারপর সেখান থেকে মাটির রাস্তা ধরে বরাবর পশ্চিমমুখে হেঁটে যেতাম রাজবলহাট। সেখান থেকে পাতুল হয়ে বাড়ি যেতাম।
চণ্ডীচরণ পুরো ভুল কথা বলছেন। আসলে দাদা সেদিন কলকাতা থেকে হেঁটে গিয়েছিলেন জনাই। সেই জনাই গ্রামের চণ্ডীতলায় রাত কাটিয়ে পরেরদিন বাড়ি গিয়েছিলেন। চণ্ডীবাবু সম্ভবত বর্ষাকালে দামোদরের করালরূপ দেখেননি। দেখলে তিনি এই অসঙ্গত কথা লিখতেন না।
চণ্ডীচরণ প্রতিবাদ করেছিলেন। বলেছিলেন, “বললেই হল? আমি তো এ’কথা জেনেছি খোদ বিদ্যাসাগর মশাইয়ের পুত্র নারায়ণচন্দ্রের থেকে।” “তো কি? আমার বিয়ের সময় সে তো জন্মায়ইনি। জন্মেছে অনেক পরে। সে কী করে জানবে?”
অত্যন্ত অকাট্য যুক্তি। নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ত্রিশ বছর বয়সকালে জন্মান। তিনি অনেক কিছুই জানতেন না। আরো অনেক ভৌগোলিক অসঙ্গতির কথা তুলে চণ্ডীচরণের এই অপলাপ সেদিন প্রমাণ করেছিলেন শম্ভুচন্দ্র। কিন্তু আজও তা মানুষের মনে বাস্তব হয়ে রয়ে গিয়েছে। এই মিথ্যাকাহিনী তুলে ধরেছেন দেবারতি মুখোপাধ্যায় তার রচিত ‘ঈশ্বরের অন্তিম শ্বাস’ গ্রন্থে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বাংলায় যে হিন্দু রেনেসাঁ বা নবজাগরণের উদ্ভব ঘটান তারই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছিল সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের কর্মীরা পরে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে। সুতরাং এরাই হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কলকাতা কেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুদের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারী। তাই তো এখন কমিউনিস্টরা সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সূর্যসেন ও প্রিতীলতাদের জয়গান গাচ্ছে।
বিধবাবিবাহ চালু ছাড়া বিদ্যাসাগরের জীবনে গঠনমূলক কোনো কাজ নেই। তারপরও তাকে নিয়ে মানুষ এত আপ্লুত কেন? এই প্রশ্নের মোক্ষম জবাব দিয়ে গেছেন কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন, বিদ্যাসাগরের প্রতি এই যে ভক্তি, ইহার একমাত্র কারণ যে তাহার চরিত্রের উৎকর্ষ, তাহা নহে। অন্যান্য কারণের একটি বিশিষ্ট কারণ আছে, যাহার উল্লেখ করিলে আমাদের বাঙ্গালীর চরিত্রগত একটা দোষ প্রকটিত হইয়া পড়িবে। যে সময়ের কথা আমি বলিতেছি, সে সময়ে এটা বেশ বোঝা যাইত সাহেবদের কাছে বিদ্যাসাগরের খুব প্রতিপত্তি ছিল বলিয়া তাহার স্বদেশবাসীর তিনি অত খাতির পাইয়াছিলেন। সাহেবদের নিকট প্রতিষ্টাপন্ন না হইলে বাঙালী মানুষের মুল্য বুঝিতে পারে না। মুখে না বলি, কিন্তু মনে মনে যাহাদের বড় বলিয়া জানি, তাহাদের সিল মোহরের ছাপ না পড়িলে জিনিসের মূল্য হয় না। (বিপিনবিহারী গুপ্ত, পুরাতন প্রসঙ্গ, পৃষ্ঠা ৯৫)।
বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে আমরা আজও ঔপনিবেশিক মানসিকতা ত্যাগ করতে পারিনি। দেবোত্তম চক্রবর্তী লিখেছেন, আমাদের মনের গহীণে আজও সেই একই ঔপনিবেশিক মানসিকতা বর্তমান। (বিদ্যাসাগর : নির্মাণ, বিনির্মাণ, পুননির্মাণ-দেবোত্তম চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা ১৩৮)।
আজকের ভারতে বিজেপি যে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে,তার পথ দেখিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্ররা। তিনি হিন্দু সমাজের সংস্কার করতে চেয়েছেন; হিন্দুত্ববাদী নবজাগরনের জন্য কাজ করেছেন। প্রতিবেশী মুসলমান সমাজের জন্য তিনি কিছুই করেননি। কাজেই বাঙালি মুসলমানদের তাকে নিয়ে আপ্লুত হওয়ার কিছু নেই।