সম্পাদকীয়

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর : গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আপস নয়


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৩

দুই বছর অতিক্রম করল রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যার লক্ষ্য ছিলো চূড়ান্ত বিপ্লব। রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগ এবং তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লব দেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। দুঃশাসন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের শেকল ভেঙে একটি বৈষম্যহীন, সুবিচারভিত্তিক ও ন্যায়পরায়ণ সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন দেশবাসী দেখেছিল- আজ দুই বছর পর এসে অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে লক্ষ করতে হচ্ছে, সেই স্বপ্নে কাক্সিক্ষত মাত্রায় আলো ফোটেনি।
জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত ‘জুলাই সনদ’ আজ সরকারের চাতুরী এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বন্দি। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি ধূলিসাৎ হতে চলেছে; গণভোটে অভিব্যক্ত গণআকাক্সক্ষার রায় আজও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেনি।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আক্ষেপ করে সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন, ‘এখনো অফিস-আদালতে আগের মতোই দুর্নীতি বিদ্যমান।’ এটি শুধু কোনো একজন রাজনৈতিক নেতার কথা নয়, বরং দেশের কোটি কোটি আমজনতার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন সৎ, দক্ষ ও আমূল সংস্কারমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তখন পুরোনো ঘুণেধরা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি জাতিকে গভীরভাবে হতাশ করছে। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার ছিল, রাজনৈতিক অনিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে তা রূপ নেয়নি।
আমরা বিশ্বাস করি, কেবল শাসক পরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার পালাবদলই বিপ্লবের শেষ কথা হতে পারে না। বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হতে হবে ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে দিকনির্দেশনা প্রদান করে ষড়যন্ত্রকারীদের কঠিন বার্তা দিয়েছেন এবং সতর্ক করে বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।’
আমরা মনে করি, এটি তার কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আমানতের প্রতি অবিচল আনুগত্যের প্রকাশ। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়া দেশের ৭০ ভাগ নাগরিকের কণ্ঠেরই প্রতিধ্বনি। ইসলামী আদর্শের মূলে রয়েছে অঙ্গীকার রক্ষা এবং জনগণের অর্পিত আমানতকে রক্ষা করা। তিনি সেই আমানত রক্ষার প্রতিজ্ঞার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কারণ জনগণ তাদের রক্ত দিয়ে কেনা জুলাই বিপ্লবের রায়কে কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর টেবিলে হারিয়ে যেতে দেবে না।
ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে দুর্নীতি ও জুলুমের বিরুদ্ধে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থান সর্বদা আপসহীন। কারণ তারা জানেন, যে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার বজায় থাকে না এবং ক্ষমতার অন্যায্য কেন্দ্রীকরণ ঘটে, সেখানে কখনোই স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ আসতে পারে না। জুলাই সনদের প্রতিটি অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়কে সংবিধানে বা শাসনব্যবস্থায় পূর্ণ প্রতিফলিত করা এবং অফিস-আদালতকে দুর্নীতিমুক্ত করে মেধা ও সততার ভিত্তিতে পরিচালনা করা আজ সময়ের দাবি।
বিপ্লবের চেতনাকে সজীব রাখতে হলে অবিলম্বে বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং শাসনব্যবস্থায় দৃশ্যমান সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে জুলাইযোদ্ধারা যেমন অতীতে সোচ্চার ছিল, তেমনি গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, শহীদদের রক্ত ও ত্যাগের সাথে প্রতারণা না করে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জনগণের রায় বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হই।