স্বাধীনতার দাবিতে জ্বলছে কাশ্মীর


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৮

জাতিসংঘের গণভোট প্রস্তাবই সমাধান

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
ভৌগোলিকভাবে ‘কাশ্মীর’ হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালার সংযোগস্থলে পীর পাঞ্জাল পর্বতমালাবেষ্টিত ডিম্বাকৃতির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ মিটার উচ্চতার উপত্যকা, যেটি বিশ্বের অন্যতম জটিল ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী দ্বারা শাসিত এবং নির্যাতিত হয়ে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন এবং পরবর্তী সংঘাতের জেরে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত স্বাধীনতার সংগ্রামরত মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর।
প্রত্নতত্ত্বমতে কাশ্মীর উপত্যকায় মানববসতির ইতিহাসের দুটি পর্যায় : প্রথমটি প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে, যেখানে কাদা মাটির দেয়ালের খুপড়িঘর, মোটা মাটির পাত্র এবং পাথরের সরঞ্জাম দেখা যায়। দ্বিতীয়টি প্রায় ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত, যেখানে গম, যব ও মসুরের প্রাথমিক চাষ দেখা যায়।
হিন্দু রাজবংশের পতন থেকে মুসলিম সালতানাত : কালের পরিক্রমায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কাশ্মীর উপত্যকাটি হিন্দু রাজবংশের শাসনাধীন হয়। পরবর্তীতে হিন্দু রাজবংশ কর্তৃক স্থানীয় জনগণের ওপর নানারকম নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতনের ফলে কাশ্মীরী জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে হিন্দু রাজবংশের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৩২০ সালে হিন্দুরাজবংশটির পতন হয়। পতনের বছরই শাহ মীরের ওপর উপত্যকাটি শাসনের দায়িত্বভার চলে আসে। হিন্দু রাজবংশের পতনের পর শাহ মীর কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন এবং গোড়াপত্তন হয় শাহ মীর রাজবংশ তথা মুসলিম সালতানাতের। কাশ্মীরে মুসলিম এই সালতানাতের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১৩২০-১৫৮৬ সাল পর্যন্ত।
মুঘল সাম্রাজ্য : সম্রাট আকবর ১৫৮৬ সালে মীর রাজবংশের শেষ শাসক ইউসুফ শাহ চাকের পরে কাশ্মীরের শাসনভার গ্রহণ করেন। উপত্যকাটি বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে ১৭৫২ সাল পর্যন্ত, যার শাসক ছিলেন সম্রাট আকবর, পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও সম্রাট আওরঙ্গজেব। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ পরিব্রাজক ওয়াল্টার আর ও লরেঞ্জের বর্ণনায় কাশ্মীর হলো, ‘কালো পর্বতমালার মধ্যে সাদা পায়ের ছাপের মতো এক খণ্ড জমিন’। আর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরকে ‘ভূস্বর্গ’ (Paradise of Earth) আখ্যা দিয়েছিলেন। মুঘল শাসকরা বিশেষত জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক সুন্দর বাগান (যেমন শালিমার বাগ, নিশাত বাগ) তৈরি করেন। এই সময়ে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্ম আরো প্রসার লাভ করে।
আফগান দুররানি শাসন : ১৮ শতকে মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে এবং এ সময়ে কেন্দ্র থেকে কাশ্মীরে মুঘল নজরদারি কমে যায়, ফলে নতুন শক্তির জন্য পথ তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আফগান দুররানি শাসকরা কাশ্মীর অঞ্চলে প্রবেশ করে। মুঘল সাম্রাজ্যের পর, আফগান দুররানি সাম্রাজ্যের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠাতা আহমদ শাহ দুররানি ১৭৫২ সালে কাশ্মীর শাসন শুরু করেন। আফগান দুররানি সম্রাটরা ১৮১৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর উপত্যকা ও আশপাশের অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে নেন। আহমদ শাহ দুররানি, তিমুর শাহ, জামান শাহ ছিলেন আফগান দুররানি শাসক। দুররানি শাসনের শুরুটা স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতির মতো মনে হচ্ছিল তবে তা অল্প সময়ের মধ্যেই পতনের যুগে পরিণত হয়।
শিখ শাসন : ১৮১৯ সালে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে শিখরা আফগান দুররানি শাসনকে পরাস্ত করে কাশ্মীর দখলে নেয়। ১৮৩৯ সালে রঞ্জিত সিং মারা গেলে দুর্বল হয়ে পড়ে শিখ শাসন। ১৮৪৬ সালে কাশ্মীরের গভর্নর ছিলেন গোলাম মহিউদ্দীন। তারপর দায়িত্ব পান তাঁর পুত্র ইমাম-উদ-দীন। ইমাম উদদীনের নেতৃত্বে কাশ্মীরীরা শিখ মহারাজার বাহিনীকে প্রতিরোধ করেছিল। কিন্তু, ব্রিটিশদের সহায়তায় মহারাজার বাহিনী হয়েছিল সফল। এরপর নিষ্ঠুর শোষণের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল রাজ্যের নাগরিকরা। পরে ১৮৪৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যুদ্ধে গুলাব সিং শিখদের কোনো প্রকার সাহায্য করেনি, যদিও সে শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। এই যুদ্ধে ব্রিটিশরা বিজয়ী হয় এবং একইসাথে শিখ সাম্রাজ্য তথা কাশ্মীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্তর্গত হয়। ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পুরস্কার হিসেবে ১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চ, অমৃতসরের চুক্তি অনুযায়ী ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে গুলাব সিংকে কাশ্মীরসহ কয়েকটি পাহাড়ি জেলার মালিকানা দেয় ব্রিটিশ সরকার। তারপর থেকে চলে শিখদের আরেক দুঃশাসন। ইমাম উদদীনের পর দ্বিতীয় দফায় সেনাবাহিনী থেকে মুসলিমদের নিরস্ত্রীকরণের এবং জম্মুতে মুসলিম গহত্যার ঘটনায় পুঞ্চ এলাকায় বিদ্রোহ শুরু হয়। মুসলিম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ১৯ শতাব্দীর ইউরোপীয় ভ্রমণকারীরা শিখ এবং ডোগরা শাসনের অধীনে ‘মুসলিম কৃষকের দুর্দশার’ বিশাল নথি প্রকাশ করেন। নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের ফলে তৃতীয় প্রতিরোধ করে শাল (চাদর) শ্রমিকরা। এখানে উল্লেখ্য, কাশ্মীরী শাল এ সময় বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে। অতিরিক্ত কর আরোপের প্রতিবাদে ১৮৬৫ সালে শাল তাঁতিদের সেই বিদ্রোহে ২৮ জনকে হত্যা করে শিখ রাজা। অমৃতসর চুক্তি অনুসারে মূলত কাশ্মীরী মানুষগুলো হয়েছিল কেনা বেচা পণ্য। কাশ্মীরের এই কেনা বেচাকে মহাত্মা গান্ধী ‘ডিড অব সেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। সাংবাদিক আর এস গুল লিখেছেন, ‘ডাচদের কাছে নিউইয়র্ক সিটি বিক্রি হয়েছিল ১৬১৪ সালে মাত্র ২৪ ডলারে, রাশিয়ার কাছ থেকে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা কিনেছিল আমেরিকা। ১৭০ বছর পরও ৭৫ লাখ রুপির সেই ক্রয় চুক্তি কাশ্মীরী জাতি সত্তার সমস্যার এখনো মূল।’
১৩ জুলাই কাশ্মীরী শহীদ দিবস : পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাই শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেলের বাইরে চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষ। জোহরের নামাজের সময় হলে এক যুবক আজান দেয়া শুরু করেন। কিন্তু অত্যাচারী রাজার নির্দেশে তাকে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করা হয়। আজান বন্ধ হয়ে গেলে সেই স্থান থেকে আজানের বাকি অংশ শেষ করতে আরেকজন বিক্ষোভকারী এগিয়ে আসেন এবং তিনিও গুলির শিকার হন। এই আজান সম্পূর্ণ করার অদম্য আকাক্সক্ষায় একজন নিহত হলে আরেকজন এগিয়ে আসেন এবং একে একে ২২ কাশ্মীরী মুসলিম নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তৎকালীন মহারাজা হরি সিংয়ের আমলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও মুসলিম গণহত্যার শিকারের এটি একটি উদাহরণ মাত্র।
প্রিন্সলি স্টেট : শের ই কাশ্মীরখ্যাত কাশ্মীর স্বাধীনতাকামী শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯৪৬ সালে কাশ্মীরজুড়ে শুরু হয় ‘কুইট কাশ্মীর’ আন্দোলন যা মূলত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতে গড়ে ওঠা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের বর্ধিত রূপ। তারপর ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশরা ৫৬২টি প্রিন্সলি স্টেটকে হয় ভারত নয়, পাকিস্তানে যোগ দিতে বলে। স্টেটগুলো ভারতে কিংবা পাকিস্তানে যোগ দিলেও ৩টি স্টেট হায়দরাবাদ, জুনগড় এবং জম্মু ও কাশ্মীর স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে হায়দরাবাদ এবং জুনগড় ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তাদের রাজা ছিল মুসলিম। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী রাজ্যদুটি শক্তি প্রয়োগ করে দখলে নেয়। অপরদিকে জম্মু এবং কাশ্মীরের জনসংখ্যা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু রাজা ছিল হিন্দু হরি সিং। হরি সিং শুরুতে কাশ্মীরকে স্বাধীন রাখতে এবং এশিয়ার সুইজারল্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। একইসাথে নেহরু ও জিন্নার সাথে দেনদরবারও করছিলেন। কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ করতে জিন্নাহ ছিলেন বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি কাশ্মীরকে তার পকেটে রাখা ‘ব্লাঙ্ক চেক’ বলে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে রাজা হরি সিংয়ের ওপর নেহরুর আস্থা ছিল কম। নেহরু জেলে বন্দি শেখ আবদুল্লার মুক্তি চাচ্ছিলেন। যদিও স্বাধীন হবার ১৩ দিন পূর্বে রাজা হরি সিং পাকিস্তানের সাথে ‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তি সাইন করেন। ভারত এই চুক্তিতে একমত হয়নি। পরে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম-শিখ-হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। কাশ্মীরেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মুসলিম উপজাতিরা পাকিস্তানে পলায়ন করতে থাকলে পাকিস্তান ২২ অক্টোবর চুক্তির কারণে সেনাবাহিনী সরাসরি প্রেরণ করতে না পেরে পাহাড়ি নন-স্টেট বাহিনীকে কাশ্মীর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেরণ করে। নন-স্টেট বাহিনীর আক্রমণে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল রাজার নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যায়। তারই প্রতিক্রিয়ায় মহারাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। শেখ আবদুল্লাহ (কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতা) পরাশর্মক্রমে ভারতের সাথে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাক্ষরিত হয় ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’। চুক্তিমতে হরি সিং কাশ্মীরে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চেয়ে শেখ আবদুল্লাহকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ঘোষণা করেন। পাকিস্তান এই চুক্তি মেনে নেয়নি, তবে চুক্তির পর দিন ভারত কাশ্মীরে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে নন-স্টেট বাহিনীকে হটিয়ে কাশ্মীর দখল করে। একই সময় পাকিস্তানও তাদের সেনাবাহিনী প্রেরণ করে এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়, যা ১৯৪৮ সালের শেষ পর্যন্ত চলে। পরবর্তীতে দেশ দুটির মধ্যে শুধু কাশ্মীর নিয়ে অসংখ্যবার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দাবিতে জ্বলছে কাশ্মীর, যেখানে প্রতিটি অলিগলিতে স্লোগান ওঠে, ‘হক হামারা আজাদি, সিনকে লেঙ্গে আজাদি’।
৩৭০ ধারা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া : ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সংবিধানের কাশ্মীর বিষয়ক আর্টিকেল ৩৭০ ধারা বাতিল করে। ফলে কাশ্মীরীদের আজাদী আকাক্সক্ষা তীব্রতর হলে সেখানে হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকার ব্যাপক নির্যাতন চালায়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়া এর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তান ও চীনের অনুরোধে কয়েক দশক পরে প্রথম কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকও বসে। ভেটো ক্ষমতাধর চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়, কিন্তু আরেক ভেটো ক্ষমতাধর রাশিয়া ভারতের পক্ষ নেওয়ায় কোনো ফল আসেনি। তবে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন, এ বৈঠকই পাকিস্তানের শেষ পদক্ষেপ নয়। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠক কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে’। অনুচ্ছেদটি বাতিলের পর কাশ্মীরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান নেতা সৈয়দ আলী শাহ গীলানী (৯০) এক টুইটার বার্তায় বিশ্ববাসীর নিকটে তাদের রক্ষার আর্তি জানিয়ে লিখেছেন যে, আপনারা এই বার্তাকে ‘এস ও এস’ হিসেবে গণ্য করুন! রাজ্যসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা গোলাম নবী আযাদ বলেন, ‘সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীরের যে অনন্য চরিত্র, বিজেপি সেটাই বরবাদ করে দিতে চাইছে’। বিলের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আযাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারুক হায়দার খান বলেন, ‘ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কাশ্মীরকে হারালো’। ভারতীয় কংগ্রেসের এমপি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘সিমলা চুক্তি ও লাহোর চুক্তি সত্ত্বেও কীভাবে এটা অভ্যন্তরীণ বিষয় হলো?’ আর মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথান হাওলা ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রেক্ষিতে বলেন, ৩৭১-এ ধারায় হাত পড়লে রুখে দাঁড়াবে মিজোরাম। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য রাজ্যগুলোর নেতারা। বিলটির প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম বলেন, ‘সরকার যা করেছে, তা দেশ ও গণতন্ত্রের পক্ষে চরম বিপজ্জনক। এই সিদ্ধান্ত দেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলার প্রথম পদক্ষেপ’। আর কাশ্মীরের শেষ অধিপতি মহারাজা সিংয়ের পুত্র ও লোকসভার কংগ্রেস সদস্য ড. করণ সিং এই বিলের বিরোধিতা করে বলেন, যেদিন আমার বাবা ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ করেন সেদিন ২৭ অক্টোবর আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মহারাজা সেদিন কেবল প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্কটুকুতেই ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন, রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে মিশিয়ে দেননি। যে শর্তে বাবা সেদিন রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, দিল্লি তার মর্যাদা রাখেনি’। কংগ্রেস নেতা মনিস তেওয়ারী বলেন, ‘ভারতীয় সংবিধানে কেবল ৩৭০ ধারা নয় ৩৭১-এ থেকে আই পর্যন্তও রয়েছে। যেগুলো নাগাল্যান্ড, আসাম, মণিপুর, অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যে ‘বিশেষ অধিকার’ প্রদান করে।’ ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে উক্ত ৫টি রাজ্যে পৃথক পতাকা উড়িয়ে মিছিল করা হয়েছে, যা তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইঙ্গিত। মূলত অনুচ্ছেদটি বাতিলের ফলে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরের রাজ্যের লোকেরা সেখানে স্বাধীনভাবে জমি কিনে বসবাস করার অধিকারী হয় এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর লোক এনে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের লেবাসধারীদের কাশ্মীরে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করার পথ সুগম হয়।
পেহেলগাঁও : ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পেহেলগাঁয়ে হামলার পর ভারতজুড়ে মুসলিম হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর বৃদ্ধি পায়। ২২ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৫ ভারতজুড়ে ৬৪টি ঘৃণামূলক বক্তব্য নথিভুক্ত করেছে ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (আইএইচএল)। এ সকল বক্তব্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ডব্লিউএইচপি), আন্তঃরাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি), রাষ্ট্রীয় বজরং দল (আরভিডি), হিন্দু জনজাগৃত সমিতি, সকল হিন্দু সমাজ, হিন্দু রাষ্ট্র সেনা এবং হিন্দু রাষ্ট্র দলসহ হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে মুসলিমদের লক্ষ করে ঘৃণা ও ভয় দেখানোর জন্য ভারতব্যাপী সমন্বিত প্রচারণা চালানো হয়। কট্টর হিন্দুরা প্রকাশ্যে আরো ঘোষণা করছে পেহেলগাঁয়ের ২৬ জন হত্যার প্রতিশোধ নিতে ২,৬০০ মুসলমানকে হত্যা করা হবে। ‘বিয়িং মুসলিম ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক জিয়া উস সালাম বলেন, ‘ভারতের মুসলমান জনগোষ্ঠী যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, তারা নিজের দেশেই অদৃশ্য সংখ্যালঘু।’ শুধুমাত্র পেহেলগাঁয়ে হামলার পর থেকে ১০৬টি সহিংসতা, আক্রমণ, হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) মানবাধিকার সংগঠনের এক রিপোর্টে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী। ‘পেহেলগাঁয়ে পর ঘৃণা : সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের মানচিত্র’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এপিসিআর। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ, হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে যুদ্ধবাজ বিজেপি সরকারের পেহেলগাঁ কার্ডের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিপুল পরাজয়ে একটি চরম শিক্ষা হয়েছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি : ভারত পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘ-প্রণীত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা একটি ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’ (Ceasefire Line) তৈরি করে। এই রেখাটি পরবর্তীতে ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ (Line of Control – LoC) নামে পরিচিতি লাভ করে। রেখাটি কাশ্মীরকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে বিভক্ত করে দেয়। এটি ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তৈরি হলেও ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি দ্বারা একে একটি ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। LoC একটি অঘোষিত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে এবং উভয় পক্ষই এখানে কড়া সামরিক প্রহারা বজায় রাখে। এই যুদ্ধের ফলে কাশ্মীর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক অংশ চলে যায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে। যার নাম হয় জম্মু এবং কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের অংশের নাম হয় আজাদ কাশ্মীর। এরই মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কাশ্মীরের করুণ ইতিহাস। অন্যদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মীর সমস্যাকে একটি আন্তর্জাতিক বিরোধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৪৮ সালে গৃহীত নিরাপত্তা পরিষদের ৪৭নং প্রস্তাবে কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকার করে বলা হয়েছিল যে, ‘গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরীরা তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে’। তবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর বিরোধ নিরসনে পাঁচবার গণভোটের রেজ্যুলেশন হয়। ভারতের আপত্তির কারণে তা কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি, বরং ১৯৫৭ সালেই কাশ্মীরী জনগণ ও জাতিসংঘের আপত্তি সত্ত্বেও অঞ্চলটিকে ভারত একীভূত করে। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর চীন আকসাই-চীন অঞ্চল দখল করে নেয়। আবার পাকিস্তানের বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে (The Trans Karakorum Tract) কাশ্মীরের বিশাল একটি অংশ, সাশগ্রাম ভ্যালি চীনকে উপহার দেয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত কাশ্মীরের মূল ভূখণ্ড তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কাশ্মীরের আয়তন ২২২,২৩৬ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৪৮% বা ১০৬,৫৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ভারত এবং প্রায় ৩৩% বা ৭২,৯৩৫ বর্গকিলোমিটার পাকিস্তান। ১৯৬২ সালে চীন-অধিকৃত কাশ্মীরের আয়তন ৪২,৭৩৫ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে অক্সাই চিনের আয়তন ৩৭,৫৫৫ বর্গকিলোমিটার আর ছোট্ট সাশগ্রাম ভ্যালি (৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার)।
কাশ্মীর কেবল একটি স্থান নয়, এটি একটি জটিল সত্তা, যা বহু স্তরবিশিষ্ট ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বারা গঠিত। ‘ভূস্বর্গ’ উপাধি যেমন কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরে, তেমনই এর বিতর্কিত অবস্থান একটি চলমান মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটকে নির্দেশ করে। কাশ্মীরের জনগণের জীবনযাত্রায় এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অনস্বীকার্য। বারবার সংঘাত, সামরিক উপস্থিতি এবং যোগাযোগ বিধিনিষেধ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। কাশ্মীর অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা কেবল স্থানীয় জনগণের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায় সিদ্ধান্ত ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। উপত্যকাটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত ৪৭ ধারা মোতাবেক কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার আশা-আকাক্সক্ষাকে বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে কার্যকর ভারত ভূমিকা রাখতে হবে ভারত, পাকিস্তান এবং চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। তবে দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের মানুষ কাশ্মীরের সঙ্গে যে অসাধারণ ঐক্য প্রদর্শন করেছে সেটি প্রসংসনীয়।
তথ্যসূত্র : kashmirwelfare.org.uk, কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস, মুসলিম মিরর, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com