তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে আশার আলো


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:২১

॥ আবু হামীম ॥
নদীকেই ঘিরেই গড়ে ওঠে সভ্যতা। দার্শনিকরা তাই নদী ও নারীকে অবিচ্ছিন্ন জীবনধারা প্রবহমান বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। এ জনপদের সৃষ্টি, বিকাশ ও অস্তিত্ব নদীকে ঘিরে। পলল এ ব-দ্বীপ উত্তরের হিমালয় থেকে প্রবাহিত সলিল ধার সন্তান। বাংলাদেশের মোট আন্তঃসীমান্ত নদী ৫৭টি, যার মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে এবং ৩টি মিয়ানমার থেকে এসেছে। সরকারি ও নদীবিষয়ক যৌথ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারতের এই ৫৪টি স্বীকৃত অভিন্ন নদীর মধ্যে ভারত ৩৬টি নদীর ওপর মোট ৫৪টি বা তার বেশি বাঁধ (ব্যারাজ, ড্যাম ও রেগুলেটর) নির্মাণ করেছে। যার কুপ্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রকৃতি (Nature), জীবনবৈচিত্র্য (Biodiversity), বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem)। বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকার প্রভাব এখন আর ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ-ভারত-চীনের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে। ভারতের টানবাহানায় বাংলাদেশকে বিকল্প খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ভারত পানিবণ্টন জাতিসংঘ পর্যন্ত নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে চীন-বাংলাদেশ তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে আশার আলো দেখছেন।
উত্তরবঙ্গের ‘জীবনরেখা’খ্যাত তিস্তা নদী আজ কেবল একটি ভৌগোলিক প্রবাহ বা পলি বয়ে আনা জলাধার নয়; এটি দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির এক অন্যতম বৃহৎ অনুঘটক ও জটিল কূটনৈতিক দাবাখেলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, রাজনৈতিক দোলাচল এবং কৌশলগত মেরুকরণের ফাঁদে পড়ে শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ আর বর্ষায় প্লাবনের নির্মম শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল। বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও ভারত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি সই করছে না। শেখ হাসিনার ভারত যা চেয়েছে সবই দিয়েছে। কিন্তু তারপরও পশ্চিমবঙ্গ এবং মমতা ব্যানার্জির অজুহাতে দেখিয়ে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে। খরার সময় পানি আটকে রাখছে। বর্ষার সময় বিনা নোটিশে বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বন্যায় ভাসিয়ে জানমালের ক্ষতি করছে, হঠাৎ পানিপ্রবাহ বন্ধ করায় পলি বহনের ক্ষমতা হারিয়ে নদনদীর মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীনে আনুষ্ঠানিক সফরের সময় ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নিয়ে দেশটির আগ্রহের কারণে ভারত অস্বস্তি প্রকাশ করছে। তাই এখন এই সংকট কেবল একটি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভারত-চীন-বাংলাদেশ ত্রিভুজীয় ভূরাজনীতিকে এক উত্তপ্ত পর্বে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর এ সমীকরণ আরো জটিল আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর জটিল সমীকরণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের (জুন ২০২৬) পর তিস্তা সমস্যার সমীকরণে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। ভারত দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলিয়ে রাখায় বাংলাদেশ এখন এই সংকট সমাধানে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় ‘তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project) বাস্তবায়নের দিকে চূড়ান্তভাবে ঝুঁকেছে। এই সফরের পর তিস্তা সংকটের বর্তমান সমীকরণ ও প্রকল্পটির রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো-
১. বেইজিংয়ের সরাসরি প্রতিশ্রুতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা : সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি শিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি মূল এজেন্ডা হিসেবে স্থান পায়। চীন এই প্রকল্পের দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) সম্পন্ন করতে এবং তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি জানিয়েছে।
২. প্রকল্পের মূল কৌশল (যা পানি সংকটের বিকল্প সমাধান) : যেহেতু ভারত থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়ার চুক্তিটি আটকে আছে, তাই চীন এই মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই পানির বিকল্প ব্যবস্থা করার প্রস্তাবে নদী খননের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তিস্তা নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা গভীর করে খনন করা হবে, যা নদীর নাব্য বাড়াবে এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
৩. বিশাল জলাধার নির্মাণ : বর্ষাকালের উপচেপড়া পানি জমা রাখার জন্য বড় বড় কৃত্রিম জলাধার ও বাঁধ তৈরি করা হবে। এই জমা রাখা পানি শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-মে) উত্তরবঙ্গের কৃষিকাজে ও সেচ প্রকল্পে সরবরাহ করা হবে।
৪. ভূমি উদ্ধার ও অর্থনৈতিক অঞ্চল : নদীশাসনের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া জমিতে নতুন শহর (Township) এবং অর্থনৈতিক হাব বা ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব আরো বাড়বে, পানি সঙ্কট দূর হবে।
তিস্তা নদীর ভৌগোলিক গুরুত্ব ও পানি সংকট
তিস্তা নদীর উৎপত্তি সিকিমের হিমালয় অববাহিকায়। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে এটি বাংলাদেশের লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার এবং এর অববাহিকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস। উত্তরবঙ্গের রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। ১৯৮৭ সালে ভারতের গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে তিস্তার ভাটি অঞ্চলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হতে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর থেকে মে) গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাবে প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার বার্ষিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকার বেশি। পানি স্বল্পতার কারণে নদীতে পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষায় অল্প পানিতেই দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন, আর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা পরিণত হয় ধুধু বালুচরে।
১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি অস্থায়ী সমঝোতা হলেও (যেখানে ভারত ৩৯% এবং বাংলাদেশ ৩৬% পাওয়ার কথা ছিল) তা স্থায়ী রূপ নেয়নি। ভারতের টালবাহানার কারণে সঙ্কটের সমাধান হচ্ছে না।
ভারতের মাথা ব্যথার কারণ
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিস্তা প্রকল্প ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck)-এর অত্যন্ত নিকটে অবস্থিত, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে যুক্ত করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই স্পর্শকাতর সীমান্তের কাছে শতাধিক চীনা প্রকৌশলী ও কারিগরি দল অবস্থান করলে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ফলে চীন যখন এই প্রকল্পে সরাসরি বিনিয়োগ ও কাজ করার প্রস্তাব দেয়, তখন ভারত তীব্র আপত্তি প্রকাশ করে। ভারতের এই উদ্বেগের জবাবে নয়াদিল্লি নিজেই তিস্তা নদীর ড্রেজিং ও ব্যবস্থাপনার প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়। ফলে একই প্রকল্পে চীন ও ভারত দুই প্রতিবেশীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশকে এক জটিল কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে ফেলেছে। কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত ১৯৪৭ এর পর থেকেই এ ছোট্ট ব-দ্বীপ যা আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, তার সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। ভারতের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন না করার কারণে ঢাকা এখন আর দিল্লির সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বেইজিংয়ের সাথে এই চুক্তি ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি করেছে যাতে তারা তিস্তার পানিবণ্টনে বাধ্য হয়।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক সফরের পর চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাবাদী। সংক্ষেপে নতুন সমীকরণ অনুযায়ী- ভারত পানি না দিলেও বাংলাদেশ বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমের খরা দূর করার জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব অববাহিকায় চীনা প্রযুক্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করতে যাচ্ছে।
আর কোনো উত্তম বিকল্প নেই
ভারত আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করায় বাংলাদেশের কাছে এছাড়া আর কোনো উত্তম বিকল্প নেই। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের ‘আন্তর্জাতিক ওয়াটারকোর্স কনভেনশন’ অনুযায়ী উজান ও ভাটির দেশের নদীর ওপর সমান অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উজান দেশের এমন কোনো কাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয় যা ভাটির দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট করে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও পরিবেশবিষয়ক বৈশ্বিক ফোরামগুলোয় তিস্তার সঙ্কট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। তিস্তা নদীর সঙ্কট কেবল একটি নদীর পানির হিস্যা পাওয়ার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কোটি মানুষের অস্তিত্বের লড়াই। ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক বৈরিতা এবং ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতির কাছে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।