একের পর এক সহিংস ঘটনা-হত্যাকাণ্ড

নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে উদ্বেগ


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:১২

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি কিংবা জনসমাগম কোনো স্থানকেই আর নিরাপদ বলে মনে করছেন না নাগরিকরা। কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে, কখনো শত শত মানুষের চোখের সামনে নিভে যাচ্ছে প্রাণ। কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে মানুষের শরীর, কোথাও প্রতিপক্ষের নির্মম হামলায় ঘটছে হতাহতের ঘটনা। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, হামলা-পাল্টাহামলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। রাষ্ট্রের বহু কাজ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যস্ত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় সময় দিচ্ছেন বলেই অভিযোগ নাগরিকদের।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসেই হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩২৬টি। শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় ওই মাসে ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। মে মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩১০টি, যার মধ্যে ঢাকা মহানগরে ১৬টি মামলা হয়েছে। আর এপ্রিল মাসে ২৮৮টি হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে; এর মধ্যে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় নথিভুক্ত হয়েছে ১৭টি মামলা।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের ই-ব্লকে ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলায় বাবু প্রাণে বেঁচে গেলেও নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী। গুলিবিদ্ধ হন মনিরসহ দুজন। ঘটনার তদন্তে চঞ্চল, জিয়ারুল হক মোল্লা, নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান, সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহম্মেদ এবং আলী হোসেনসহ একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ভাড়াটে শুটার আনা হয়েছিল।
কয়েক দিন আগে শুটারদের ঢাকায় এনে ঘটনাস্থল রেকি করানো হয় এবং কাকে লক্ষ করে গুলি করতে হবে, সেটিও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. রাকিব খান জানান, স্থানীয় ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি এবং গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই এই রক্তক্ষয়ী হামলার সূত্রপাত।
গত ২১ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে সবুজবাগের রাজারবাগ বাজার পানির পাম্পসংলগ্ন এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশ (৩৬) নির্মম হত্যার শিকার হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার দুই হাতের কব্জি। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আবুল বাশারের ছেলে পলাশ সবুজবাগের ৭১ নম্বর মাদারটেক এলাকায় বসবাস করতেন। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া প্রতিবেশী মো. হীরা জানান, পলাশ পেশায় প্রাইভেট কারচালক এবং স্থানীয় বিএনপির কর্মী ছিলেন। সেদিন রাতে চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় পূর্বশত্রুতার জেরে একই এলাকার রয়েল, সবুজ, নাঈমসহ ১০ থেকে ১২ জন তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
এর দুদিন আগে ১৯ জুলাই দুপুর প্রায় ৩টার দিকে বিএফডিসির পুরোনো গেটের পাশে মো. সেলিম নামে এক ব্যবসায়ীকে ধারালো চাকু দিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয়রা জানান, তেজগাঁও রেলগেট এলাকায় আক্রান্ত হওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সেলিম বাঁচার আকুতি জানান। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রেখা বেগম তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। পরে র‌্যাব-২ মুকুল সোহাগ ও মিজানুর রহমান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাব-২-এর কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাঈদ মাহমুদ জানান, ভাঙাড়ি ব্যবসার টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
এরও আগে ১৩ জুলাই আজিমপুর মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারে মাত্র এক হাজার টাকা বাসাভাড়া বকেয়াকে কেন্দ্র করে স্বপন (৬০) নামে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ভোর ৪টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের ৪ নম্বর ভবনের ৮১ নম্বর ফ্ল্যাটের সামনে ও সংলগ্ন মাঠে এই নির্মম ঘটনা ঘটে। নিহত স্বপনের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার তাহের ফকিরকান্দি গ্রামে। তিনি পেশায় কসমেটিকস ব্যবসায়ী ছিলেন।
গত ১২ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে শাহিদা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তার বাসা থেকে দুই জোড়া কানের দুল, একটি গলার চেইনসহ স্বর্ণালঙ্কার এবং নগদ অর্থ লুট করে দুর্বৃত্তরা। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু জানান, নিহত শাহিদা বেগম কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সীতলাই গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত শফিকুল ইসলাম সরকারের স্ত্রী। ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
এরও আগে ১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে আদাবর থানার নবোদয় কাঁচাবাজার এলাকায় সালিশ বৈঠক শেষে আবুল বাসার বাদশা (৩০) নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। হামলায় ইউনিট বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম গুরুতর আহত হন। নিহত বাদশা নবোদয় ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক সহিংসতায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি, ফুটপাত ও ময়লার দরপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং বেআইনি অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত ৩৮ জন রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতী দলের একজন রয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ২৫ লাখ টাকায় ভাড়াটে শুটার এনেছিল অপরাধীরা। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে অন্তত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৩৬ জন নিহত ও চার হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই সহিংসতাগুলোর একটি বড় অংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভিন্ন পক্ষের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৯৪টি ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ৬০০টিরও বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের এমন ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্মম হামলার শিকার হচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।