মৌলভীবাজারে সবুজের রাজ্যে অবাধে গাছ চুরি


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৩

মো. আব্দুল ওয়াদুদ, মৌলভীবাজার : পাহাড়ি চা বাগান, চিরসবুজ ও বনাঞ্চলবেষ্টিত সিলেট-মৌলভীবাজারের বনাঞ্চল থেকে অবাধে গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বন বিভাগ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের পৃথক ২৬৭টি মামলায় ৫৭৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র ৩৮ জন। এদিকে পরিবশবিদরা জানিয়েছেন, লোকবলের অভাব বলে সংশ্লিষ্টরা গা বাঁচিয়ে তাদের দায় মোটেও এড়াতে পারেন না।
সম্প্রতি কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে মূল্যবান গাছ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উদ্যানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেগুন, আগর, আকাশমনি, চামলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটকের সামনের একটি মাটির রাস্তা ধরে প্রায় ২ কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন প্রজাতির অন্তত ১৫-১৬টি গাছের কাটা গোড়া দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া গভীর জঙ্গলে ঝড়ে উপড়ে পড়া প্রায় শতবর্ষী দুটি বড় সেগুন গাছও নজরে আসে। স্থানীয়দের আশঙ্কা যথাযথ নজরদারি না থাকলে এসব গাছও বৃক্ষখেকো চক্রের হাতে চলে যেতে পারে।
এছাড়া সদর উপজেলার বর্ষীজোড়া ইকোপার্কেও বনাঞ্চল থেকে অনেকগুলো বৃক্ষ কেটে নেওয়া হয়েছে। এসব পৃথক বৃক্ষ চুরির ঘটনায় একাধিক মামলাও দায়ের করেছে বন্য প্রাণী বিভাগ।
মৌলভীবাজারসহ সিলেট বিভাগ মিলে ‘বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট (সদর দপ্তর মৌলভীবাজার) মৌলভীবাজারে ও সিলেট বন বিভাগ নামে সিলেটে আলাদা দুটি কার্যালয় রয়েছে। এ দুই কার্যালের অধীনে মৌলভীবাজারের বর্ষীজোড়া, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, জুড়ি, বড়লেখা, হবিগঞ্জের সাতছড়ি ও সিলেটের রাতারগুল, জাফলং ও সুনামগঞ্জে জলাভূমির বনসহ মোট ১৫টি রেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি বন্য প্রাণী বিভাগ ও ১২টি বন বিভাগ পরিচালনা করে আসছে।
এদিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বনের ভেতর থেকে সম্প্রতি মাত্র ১টি সেগুন গাছ কাটা হয়েছে বলে এ প্রতিবদেককে জানিয়েছেন লাউয়াছড়া ভিট কর্মকর্তা মাহজুক হোসেন। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, গত রমজানে বৃক্ষ কেটে নিয়ে যাচ্ছে এমন খবর পেয়ে আমরা বনের ভেতর ফাঁকা গুলি ছুড়ি। তাৎক্ষণিক বৃক্ষ চোররা পালিয়ে যায়।
এদিকে সিলেট বন বিভাগ জানিয়েছে, বিগত ৬ মাসে মৌলভীবাজারসহ সিলেট বিভাগজুড়ে গাছ চুরি ও নানা ঘটনায় বন মামলা ৯৫টিসহ মোট ১৭৭টি মামলা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় ৮৪৫৯ ঘনফুট কাঠ ও ২২টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। মোট ৩৪৫ জন আসামির মধ্যে আটক হয়েছেন ২১ জন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট (সদর দপ্তর মৌলভীবাজার) জানিয়েছে, তাদের বিভাগে গাছ চুরিসহ অন্যান্য ঘটনায় মোট ৯০টি মামলায় ২৩১জন আসামি রয়েছেন। আটক হয়েছেন ১৭ ব্যক্তি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জাতীয় পরিষদ সদস্য আ.স.ম সালেহ সোহেল বলেন, বনের ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত বৃক্ষ কেটে বন শূন্য করা হচ্ছে। দেশে যে পরিমাণ বন আছে- প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় তা খুবই কম। তিনি বলেন, মৌলভীবাজারে আর আগের সবুজায়ন নেই। তিনি অভিযোগ করেন, গাছ চুরি রোধে বন বিভাগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। লোকবলের অভাব বলে সংশ্লিষ্টরা তাদের গা বাঁচাতে চান। এসব বলে বন বিভাগ তাদের দায় এড়াতে পারে না।
এদিকে শ্রীমঙ্গল-সিলেটের সহকারী বন সংরক্ষক (দফতর শ্রীমঙ্গল) নাজমুল আলমের সাথে এ প্রতিবেদক তথ্য-উপাত্ত নিতে লাগাতার ২ সপ্তাহ মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি প্রতিক্রিয়া জানাননি।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, তাদের দফতরে বরাদ্দ অপ্রতুল। স্টাফ ঘাটতি ৪০ শতাংশ। বিট ও রেঞ্জ পর্যায়ে মোটরবাইক ও টহল পিকআপ গাড়ি নেই। এই কারণে সংঘবদ্ধভাবে গাছ লুট হচ্ছে। তিনি বলেন, শূন্যপদ পূরণ ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো হলে তবেই বন রক্ষা করা যাবে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের (সদর দপ্তর মৌলভীবাজার) বিভাগীয় কর্মকতা মো. আবুল কালাম বলেন, লাউয়াছড়ায় সম্প্রতি বৃক্ষ কাটা হয়েছে এমনটা শুনিনি। তবে তিনি বলেন, আগের গাছ চুরির ঘটনায় ১৭ ব্যক্তিকে তারা আটক করে আদালতে প্রেরণ করেন।