শান্তি আলোচনায় অনিশ্চয়তা

ফের ইরানে হামলা জবাব দিচ্ছে তেহরান


১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:২৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : শান্তি আলোচনা চলছিল। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেয়। শুধু উদ্যোগ নিয়ে বসে ছিল না পাকিস্তান। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশে দৌড়ঝাঁপও করেছিল। একাধিক বৈঠকও করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সমঝোতায় আসেনি। ইরান বলছে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতসহ শর্তসমূহ মেনে নিলে সমঝোতায় আসতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নানা কৌশলে হরমুজে অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ চায়, যা অন্যায্য বলছে ইরান। দীর্ঘ আলোচনায় সমঝোতা না হওয়া এবং যুদ্ধবিরতির সময় অতিক্রম করায় নতুন করে ইরানে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। যুদ্ধে এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন এখনো সমঝোতা সম্ভব।
‘সমঝোতা এখনো সম্ভব’ বলছেন ট্রাম্প
টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে ওয়াংশিটন। দুদেশের মধ্যে চলমান সমঝোতা আলোচনা অচল হয়ে পড়ার মধ্যেই এসব হামলা চালাচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধ করতে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা এখনো সম্ভব’। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য ডন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। সমঝোতা আলোচনা অচল হয়ে পড়ার মধ্যেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, এসব হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধ করতে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা এখনো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মনে করি একটি সমঝোতা সম্ভব। দুদিন আগেও আমাদের একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে তারা জানায়, তারা এখনই সেই চুক্তি করতে পারবে না, আরও আলোচনা করতে চায়।’
মার্কিন পঞ্চম নৌবহরে ইরানের হামলা
বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বহরটির। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি লক্ষ করে চালানো হামলায় জ্বালানি সংরক্ষণাগারে আগুন লাগে। এছাড়া একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, নৌবহরের এয়ার কন্ট্রোল রাডার, সি-র‌্যাম আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থা এবং মানববিহীন সারফেস ভেসেল নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এটি একটি ‘প্রতিশোধমূলক অভিযান’ এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে ইরানের এই দাবির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) বা বাহরাইন সরকারও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দেয়নি।
মার্কিন হামলায় কেঁপে উঠল ইরানের মাহশহর ও আবাদান
চলমান তীব্র সংঘাতের মধ্যে ইরানের ইরাক ও কুয়েত সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, খোজস্থান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর ভালিওল্লাহ হায়াতির বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত ১৪ জুলাই খোজস্থান প্রদেশের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহরকে লক্ষ করে এই হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে বন্দরনগরী মাহশহর এবং ঐতিহ্যবাহী আবাদান শহর, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পুরোনো তেল শোধনাগারটি অবস্থিত। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে প্রথম আঘাত হানা হয় আবাদান শহরে। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর, অর্থাৎ দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১০:০০) পার্শ্ববর্তী মাহশহর নগরীতে দ্বিতীয় হামলাটি চালানো হয়। সীমান্ত এলাকায় দুই পক্ষের তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই নতুন ও বড় ধরনের বিমান হামলার খবর এলো।
হরমুজ প্রণালীতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটলেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালীর ওপর ঘোষিত ২০ শতাংশ শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের আগের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ ‘ইউটার্ন’ নিয়ে বিতর্কিত এই শুল্কারোপের ঘোষণাটি বাতিল করেছেন তিনি। তবে শুল্কের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করলেও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের বিষয়টি তিনি আবারও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী ইরান ব্যতীত বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ইরানকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের মিথ্যাচারী, সহিংস ও বিদ্বেষপূর্ণ নেতৃত্বের কারণেই তাদের এই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে, যা মূলত দেশটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ পূর্বে ঘোষিত ২০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের বিকল্প হিসেবে নতুন পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি উল্লেখ করেন, শুল্কারোপের পরিবর্তে এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’ চুক্তির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
মার্কিন আগ্রাসন চললে কখনোই খুলবে না হরমুজ প্রণালী
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন, বিদ্বেষমূলক আচরণ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী কখনোই উন্মুক্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। গত ১৪ জুলাই দেশটির সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়। ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার প্রশ্নে দেশের সশস্ত্র বাহিনী কোনো অবস্থাতেই পিছপা হবে না। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার একমাত্র পথ হলো ইরানি জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে জেনারেল আকরামিনিয়া আরও বলেন, শহীদদের রক্তের; বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ইরান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো মূল্যে এই প্রতিশোধ নেওয়া হবে। সূত্র: দ্য ডন।
‘চাইলে হোয়াইট হাউসের ভেতরেই ট্রাম্পকে হত্যা করতে পারে ইরান’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক নজিরবিহীন ও সরাসরি হুমকি দিয়েছেন ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক সাবেক শীর্ষ কমান্ডার। হোয়াইট হাউসের ভেতরে প্রবেশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষতি করার সক্ষমতা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। সম্প্রতি ইরানি সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ফারারু’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন কানানি মোকাদ্দাম বলেন, ট্রাম্পকে যদি হত্যা করাই লক্ষ্য হয়, তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান খুব সহজেই তা হোয়াইট হাউসের ভেতরে গিয়ে করতে পারে। যখনই প্রয়োজন হবে, আমরা তা করতে সক্ষম। সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর।