আস্থা সংকটে বিনিয়োগ-১

ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান : অর্থনীতিতে সতর্ক সংকেত


১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:০৮

॥ কাওসার রহমান ॥

অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ভোগব্যয় অর্থনীতিকে কিছু সময় সচল রাখতে পারে, সরকারি ব্যয়ও সাময়িক গতি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধির একমাত্র টেকসই উৎস হচ্ছে বিনিয়োগ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান স্থবির বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেবল একটি খাতভিত্তিক সংকট নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশক ধরে যে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, তার অন্যতম ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ। তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের বিকাশ, আবাসন খাতের বিস্তার এবং সেবা খাতের দ্রুত প্রসার, সবকিছুর চালিকাশক্তি ছিল উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে সেই চিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার গতি কমেছে, পুরোনো অনেক শিল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে, আবার কিছু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহারের নীতির প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে; অন্যদিকে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোয় দ্রুত আমানত বাড়লেও সেই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো ঘুরে দেখলে কিংবা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বললে একটি অভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে আগ্রহী নন। যারা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের অনেকেই তা স্থগিত রেখেছেন। নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে এখন অধিকাংশ উদ্যোক্তার লক্ষ্য বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা। কারণ তারা মনে করছেন, বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি নেওয়ার সময় এটি নয়।
বিনিয়োগের এই মন্থরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থানে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন শিল্প ও সেবা খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। অনেক কারখানায় নিয়োগ কার্যত বন্ধ। কোথাও কোথাও উৎপাদন কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাইও হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতাকে অনেকেই সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। এটি কেবল বৈশ্বিক অস্থিরতার ফল নয়, আবার শুধু একটি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতারও পরিণতি নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, নীতিগত অসঙ্গতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আস্থাহীনতার সম্মিলিত ফল আজকের বিনিয়োগ স্থবিরতা।’
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অর্থনীতি বিশেষ করে বিনিয়োগ চাঙা করতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে নানা ধরনের শুল্ক-করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ বরাদ্দসহ শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।
স্থবিরতার প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ আসেনি। দেশে বেসরকারীকরণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ শুরু হয় মূলত আশির দশকে থেকে। ১৯৮২ সালের ‘নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’র মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) চালু হয়, যা পরবর্তীতে বিনিয়োগ আকর্ষণে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়।
আশির দশকে শুরু হওয়া তৈরি পোশাকশিল্প নব্বইয়ের দশকে বিশাল বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। বিনিয়োগ বাড়াতে ১৯৯৮ সালে ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ (বিওআই) গঠিত হয়। পরবর্তীতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে বিওআই ও বেসরকারীকরণ কমিশন একীভূত হয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এছাড়া ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়।
অন্যান্য উদীয়মান দেশের মতো বাংলাদেশেও এফডিআইবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে গ্রহণ করতে হয় নানা ধরনের নীতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কোনো কার্যকর বিনিয়োগ নীতিমালা নেই। বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনিয়োগের চেয়ে সরকারগুলোকে ঋণের পেছনেই বেশি ছুটতে দেখা গেছে।
এফডিআই বাড়াতে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ৩৯টি হাইটেক পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা। তবু বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, এই অর্থবছরের জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত ১৪ বছরে জিডিপির অনুপাতে এত কম বিনিয়োগ হয়নি। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পরে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত এত কমেনি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অংশ কমে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক। ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বেশি কার্যকর কর্মসংস্থান (শোভন কর্মসংস্থান) দরকার। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকায় সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ঘটা করে বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়। সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা দেখানো হলেও ওই দেড় বছরে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ই দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া ঋণের সুদের হারও বেশি। এসব কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বিনিয়োগের নীরব শত্রু ৫ সংকট
বাংলাদেশের বিনিয়োগ বর্তমানে ৫ সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পাঁচ সংকট হলো ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ¦ালানি প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলার সংকট। এই পাঁচ সংকটের কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এখন অধরা হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নির্ভর করছে এই পাঁচ সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের ওপর। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আস্থা সংকট কেটে গেলেও এই পাঁচ সমস্যার সমাধান না করা গেলে শেষ পর্যন্ত দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংকটের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা। বহু বছর ধরে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি এবং অনিয়মিত ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এর ফলে অনেক ব্যাংক নতুন শিল্পঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, চার বছর (২০২১) আগেও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণ বিতরণ। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই চিরচেনা চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন আর ঋণ নয়, বরং সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগেই মুনাফা বেশি হচ্ছে।
আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক টানা চার বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এতে ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদহার বিরাজ করছে। উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। যে উদ্যোক্তা কয়েক বছর আগে তুলনামূলক কম খরচে ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণের কথা ভাবতে পারতেন, তিনি এখন সুদ, জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপ বিবেচনা করে বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন।
ফলে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্যাসের সীমিত সরবরাহ, বিদ্যুতের ব্যাঘাত এবং জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি আধুনিক কারখানা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্থাপন করার পর যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যুক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক উদ্যোক্তা তাই নতুন প্রকল্পে না গিয়ে অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করেছেন।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ শুধু করছাড় দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, করনীতি, শুল্কহার, আমদানি বিধি বা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে।
চতুর্থত, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা। শিল্প স্থাপনের অনুমোদন, জমি, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, কর সংক্রান্ত প্রক্রিয়া, সব মিলিয়ে সময় ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয়ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।
পঞ্চমত, শিল্পায়নের জন্য শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। কিন্তু গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এই পুরো প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে।
অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের মুখে পড়েছেন। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান উৎপাদন ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। যারা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।
আশিক চৌধুরী সমাচার
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই আশিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত এই চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে নিয়েই বিস্তর ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল। সেই সময় বিনিয়োগ সম্মেলন করে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে যাচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, আন্তর্জাতিক রোডশো, চীন-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-কাতার সফর, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন আর খরচেরও কোনো কমতি ছিল না। সবকিছু মিলিয়ে তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন মুখ হয়ে ওঠেন।
বেসরকারি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং করপোরেট বিশ্বের পরিচিত মুখ হওয়ায় তাকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে, এই প্রচেষ্টা কি বাস্তব ফল দিয়েছে?
বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন ১৮ জুন এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার নিয়োগের সময় ছড়ানো আশার ফুলঝুরিতে গুড়েবালি ঢেলে দেওয়ার মতো হয়েছে। তিনি বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠান এখন আর বিদেশি নয়, দেশীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ করছে। তার যুক্তি হলো, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এ কারণে তারা গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের ওপর বেশি ফোকাস না করে, দেশিয় বিনিয়োগকারীদের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং দেশের বাইরের চেয়ে ভেতরের সম্ভাবনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
ড. ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আশিক চৌধুরী ওই পদে বহাল রয়েছেন। হয়তো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার বিবেচনায় তাকে ওই পদে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন যখন তিনি নিজেই বিদেশি বিনিয়োগের আশা ছেড়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে দেশিয় বিনিয়োগের দিকে মুখ ফেরানোর কথা বলছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের সবুরের মেওয়া মাকাল ফলে পরিণত হতে যাচ্ছে।
অবশ্য আশিক চৌধুরী পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি বলছেন, বিনিয়োগ কমার পেছনে বিডার ব্যর্থতার চেয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নির্বাচনকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার মনোভাব বড় ভূমিকা রেখেছে।
তার মতে, বিনিয়োগের একটি বড় পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সময় লাগছে। তাই বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিনিয়োগ সংকট বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি সব দায় একটি নির্দিষ্ট সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান সংকটের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।
দীর্ঘসময় ধরে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, আর্থিক খাতে জবাবদিহির অভাব, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শৈথিল্য অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। এসব দুর্বলতা তখন খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা আসার পর সেগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সংকট আস্থা
অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল মুনাফার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে সমানভাবে জড়িত আস্থা। একজন উদ্যোক্তা তখনই নতুন কারখানা গড়বেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে আগামী পাঁচ বা দশ বছরে তাঁর ব্যবসার পরিবেশ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে। তিনি প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন করতে পারবেন, নীতিমালা হঠাৎ বদলে যাবে না এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকবে। তিনি কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন, করনীতি বারবার পরিবর্তিত হবে না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে এই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে নগদ অর্থ সংরক্ষণকে নিরাপদ মনে করছেন। এটি অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ উদ্যোক্তারা যখন ঝুঁকি নিতে চান না, তখন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না, প্রযুক্তি আসে না, উৎপাদন বাড়ে না এবং কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না।
সব বিশ্লেষণের শেষে একটি বিষয়ই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশে অর্থ, উদ্যোক্তা বা বাজারের সম্পূর্ণ অভাব নেই। যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা হলো আস্থা। ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন যে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, আর্থিক খাত স্থিতিশীল হবে, জ্বালানি নিশ্চিত থাকবে, প্রশাসনিক সেবা দ্রুত পাওয়া যাবে এবং প্রতিযোগিতার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, তবে বিনিয়োগ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২০ হাজার কোটি টাকা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন, যা বর্তমান বাজার সুদের প্রায় অর্ধেক।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, উৎপাদনহীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বন্ধ বা অচল হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অব্যবহৃত শিল্পভূমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে ৪৪টি বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা) আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘নতুন সরকার এসেছে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার আভাস দেখা যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি খাত সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে এখন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলছেন, দেশে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগ সেবা আরও সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা; চীনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগপ্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিডার অফিস চালু ইত্যাদি।
তিনি জানান, এ উদ্যোগে ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পভূমি এবং প্রায় ৫৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, যা দেশের শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার। কারণ বিনিয়োগের চাকা সচল না হলে উৎপাদন বাড়বে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, রাজস্ব বাড়বে না এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও অধরাই থেকে যাবে।