১৬ জুলাই বুক পেতে দেন শহীদ আবু সাঈদ

পতনঘণ্টা বাজে ফ্যাসিস্ট হাসিনার


১৬ জুলাই ২০২৬ ০৯:৪০

স্টাফ রিপোর্টার : সাড়ে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। মানুষের সীমাহীন ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল চরমে। ঠিক এমনই একসময় শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। সেই আন্দোলন থামিয়ে দিতে যখন বলপ্রয়োগ করে হাসিনা, তখনই ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ দৃশ্যমান হয়। তৈরি হয় নতুন এক ইতিহাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের। দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায় তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের যে বীজ, তা মূলত রোপিত হয়েছিল ওই বছরের ১ জুলাই। দিনটি ছিল সোমবার। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষাঙ্গনগুলো ওইদিন একযোগে গর্জে উঠেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে এদিন থেকেই দেশব্যাপী লাগাতার ও সুসংগঠিত আন্দোলনের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে ৩৬ দিনের একটানা গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। ২০১৮ সালে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ সেই পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনরায় বহাল হয়ে যায়।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর পরই ৫ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন। এরপর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সরকারকে দাবি মানার জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত একটি আলটিমেটাম বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ৯ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মাসজুড়ে চলে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার নেপথ্য কাজ। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সংস্কার বা বাতিলের কোনো কার্যকর ঘোষণা না আসায় ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় চূড়ান্ত ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ। শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন, যা দ্রুতই একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
এরপর ৪ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। পরদিন থেকে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি। ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘোষণা আসে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির, যা ৭ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে সড়ক ও রেলপথে অবরোধ তৈরি হয়, অচল হয়ে পড়ে জনজীবন।
১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। শুরু হয় সহিংসতা, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। তিনি গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ তাঁর এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দেয়।
১৫ জুলাই ঢাবিতে ছাত্রলীগের হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর ঢামেকে আহতদের ওপর আবারও হামলা হয়। একই রাতে জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের আরেকটি হামলা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর পরপরই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ওই রাতেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার, কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। বরং শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বের করে দেন, ঘোষণা করেন ‘রাজনীতিমুক্ত’ ক্যাম্পাস।
১৭ ও ১৮ জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ঢাকা শহর তখন রূপ নেয় এক যুদ্ধক্ষেত্রে। সেদিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে অন্তত ২৯ জন নিহত হন। সরকারপ্রধান প্রস্তাব দেয় ২০ শতাংশ কোটা রাখার, কিন্তু আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট সংযোগ।
১৯ জুলাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। হাসপাতালগুলোয় লাশের স্তূপ জমতে থাকে, শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। মেট্রোরেল স্টেশন, এক্সপ্রেসওয়ের টোলপ্লাজা, নরসিংদীর জেলখানা- সবখানেই সহিংসতা ও প্রতিরোধের চিত্র দেখা যায়। শেষমেশ জারি হয় কারফিউ, সেনাবাহিনী নামে রাস্তায়।
কিন্তু এত কিছুর পরও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিয়ে এটিকে নিয়ে যায় অন্য একপর্যায়ে। প্রতিবাদের এই ঢেউ থেমে থাকেনি ৩১ জুলাইতেও। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে তা এগিয়ে গেছে আরও একদিন। শহীদ, প্রতিবাদ, প্রতিশোধ- সব কিছু মিলিয়ে এক মাস পরিণত হয় এক ঐতিহাসিক ৩৬ দিনে। কারণ জনগণ জানিয়ে দেয়- জুলাই তখনো শেষ হয়নি, যতক্ষণ না বিজয় আসে। তাই ১ আগস্ট হয়ে গেল ৩২ জুলাই, ২ আগস্ট হলো ৩৩ জুলাই।
৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সমাবেশে ঘোষণা আসে সরকার পতনের এক দফা। ৪ আগস্ট ঘোষিত হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি, যা ৬ আগস্ট পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একদিন এগিয়ে এনে নির্ধারণ করা হয় ৫ আগস্টে এবং সেই দিন- ৫ আগস্ট, যা ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে ছিল দীর্ঘতম প্রতিবাদের বিজয় দিন। লাখো মানুষ ঢাকায় সমবেত হয়, পথে নামে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে। সেদিন দুপুরের আগেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ‘৩৬ জুলাই’ নাম লিখে নেয় ইতিহাসের পাতায়।