পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল না করায় কাটেনি জটিলতা


১৬ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৬

স্টাফ রিপোর্টার : আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সক্রিয় ছিল বিএনপি ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। ওইসময় এরশাদের পতন হলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফর্মুলা তৈরি করে জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে নানা কাণ্ডের পর আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর পর ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ যুক্ত করা, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের বিধান, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা বাড়ানো এবং সব সরকারি কার্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করেন। এর মধ্যে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিধান এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার নাগরিক। তারা পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিলের আবেদন জানান। এছাড়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক আপিল করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে। গত ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দেন। আপিল বিভাগের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে থাকা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চেয়ে করা আবেদনসহ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করেছেন আপিল বিভাগ। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
বদিউল আলম মজুমদারসহ চার নাগরিকের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া, তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার রেদওয়ানুল করিম। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এইচআরএসএসের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক। মো. মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। এছাড়া শুনানিতে ইন্টারভেনার হিসেবে ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক ও ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন অংশ নেন।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরছে না তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিলের রায় বহাল থাকলেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসছে না। আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বেশকিছু সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা, যার সমাধান কেবল জাতীয় সংসদই করতে পারে।
সম্প্রতি আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সংবিধানের ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) অনুচ্ছেদ (নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের বিধান পুনর্বহালের পথ সুগম হয়েছে। বাতিল হয়েছে সংবিধানের মৌলিক নীতি পরিবর্তনকে রাষ্ট্রদ্রোহ ঘোষণা করা ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদও।
অষ্টম সংশোধনী (হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ) বা ষোড়শ সংশোধনীর (সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল বাতিল) ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের পরই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়নি।
পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চাওয়া পক্ষের আইনজীবীদের আর্জি আদালত তা গ্রহণ করেননি। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা অন্তত ৪৮টি পরিবর্তন বহাল রয়েছে, যা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কার্যকরের ক্ষেত্রে অন্যান্য ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধন করে অন্তত পাঁচটি জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শরীফ ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য মোট আটটি ধারা ছিল। এর মধ্যে হাইকোর্ট দুটি ধারা বাতিল করেছেন, যা আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। কিন্তু বাকি ছয়টি ধারা আদালত বাতিল করেননি। এই ছয়টি ধারা বাতিল না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ব্যবস্থা চালু করা যাবে না। এখন সংসদকেই এসব ধারা বাতিল করতে হবে। আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়ার ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিধানের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন আইনিভাবে আটকে আছে।
যেসব জটিলতা এখনো বিদ্যমান
ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে এবং তারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩ক) অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, নির্বাচন হবে সংসদের মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ দিনের মধ্যে। ৯০ দিন আগে নির্বাচন হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে? বিধান হলো সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। এখন যদি সংসদ ভাঙার ৯০ দিন আগেই নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ কোথায়?
প্রধান উপদেষ্টা পদে বিচারকদের নিয়োগে বাধা
ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের বিচারপতি। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৯৯(১) অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, অবসরের পর বিচারকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। এই প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদও সরকারি পদ। আগে একটি ব্যতিক্রমী বিধান ছিল, যাতে এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেই বিধানটি বাতিল করা হয়। আদালতও সেই বাতিলের বিধান বাতিল করেননি। ফলে আইনি বাধাটি বহাল রয়েছে।
শপথের বিধান নিয়েও জটিলতা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা কীভাবে, কার কাছে এবং কোন ভাষায় শপথ গ্রহণ করবেন, তা সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে যুক্ত ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে এটি বাতিল করা হয়। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন কে শপথ পড়াবেন, কীভাবে এবং কোন ভাষায় শপথ নেওয়া হবে, সেই বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছিল। আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট কেউই তা পুনর্বহাল করেননি। ফলে প্রধান উপদেষ্টার পদ থাকলেও শপথের বিধান ফিরে আসেনি।
পদমর্যাদা ও বেতন-ভাতা
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় সংবিধানের ১৪৭ ও ১৫২ অনুচ্ছেদে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের পদ, মর্যাদা এবং বেতন-ভাতার সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে তা বাতিল করা হয়। ফলে এসব বিধানও সংসদের মাধ্যমে পুনরায় সংযোজন করতে হবে।
সংসদে পাস হলে তারপর কী হবে?
আদালত তার পর্যবেক্ষণে আগেই বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারবে। তবে নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করে এসব ত্রুটি দূর করলেও আইনি চ্যালেঞ্জের শঙ্কা থেকেই যায় বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা। সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পরও এ নিয়ে আদালতে মামলা হতে পারে। তখন আদালতে কোন বিধান থাকা উচিত আর কোনটি নয়, তা নিয়ে আবার শুনানি হবে। এরপর এক পর্যায়ে সমাধান আসবে।