তেহরানের ঐতিহাসিক বিজয়
২৫ জুন ২০২৬ ১০:৩৭
॥ ইকবাল কবীর মোহন ॥
প্রায় তিন মাসব্যাপী ইরানে আগ্রাসী আমেরিকা ও জায়নবাদী ইসরাইলের যৌথ হামলার পর অবশেষে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ডিজিটালি এই স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে এই স্মারক মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন স্বাক্ষর করলেন, তখন ট্রাম্পের চোখে-মুখে যেন ভেসে উঠেছিল একজন পরাজিত রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিচ্ছবি। এতদিন ধরে যিনি অহরহ নিজেকে একজন বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এক্স হ্যান্ডলে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে বিশ্বকে হকচকিত করতেন, তিনিই সেদিন পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে চৌদ্দ দফা সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মান রক্ষার শেষ চেষ্টা করলেন। তখন তার মুখে না ছিল তিল পরিমাণ হাসি, না ছিল বিন্দুমাত্র বিজয়ের আনন্দ। এ সময় তার পাশে বসেছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, পেছনে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার মুখেও হাসির লেশমাত্র ছিল না। চুক্তিতে স্বাক্ষর শেষে ম্যাক্রোঁ হাত বাড়িয়ে ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন নির্লিপ্ত। এ সময় উপস্থিত একঝাঁক সাংবাদিকের তোপের মুখে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু একটি বাক্যই উচ্চারণ করেন, ‘ইট ইজ সাইন্ড’। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্য দিয়ে অপরিণামদর্শী একটি অযাচিত যুদ্ধ থেকে সরে আসার আকুতি থেকে একটি পরাজয়ের দলিলে সই করার পর এর চেয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ ট্রাম্পের কাছে ছিল না। উল্লেখ্য, এই সমঝোতা স্মারকের শর্ত মতে, আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আলেচনার দরজা খুলে গেল।
১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে কী আছে : এবার আসা যাক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা ১৪ দফা স্মারকের আলোচনায়। এককথায় বলতে গেলে, সমঝোতার ফল হলো পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের আটককৃত বিশ বিলিয়ন অর্থ ফিরিয়ে দেয়া, মার্কিন ও ইসরাইলের অন্যায় আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত ইরান পুনর্গঠনের জন্য তিনশ’ বিলিয়ন অর্থ সাহায্য প্রদান এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বিষয়ে আলোচনার দরজা উন্মুক্ত করা। দফাওয়ারি চুক্তির শর্তগুলো ছিল এ রকম- ১. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও সামরিক অভিযান বন্ধ : যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং চলমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার ঘোষণা দেবে। ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ, সামরিক অভিযান, শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি না দেয়ার অঙ্গীকার করবে। একই সঙ্গে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেবে। ২. পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। ৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি : দুই দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা চালাবে। উভয়পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে। ৪. মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার : সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ ও অন্যান্য বাধা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করবে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনীও সরিয়ে নেবে। ৫. বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু : সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে এবং ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত ফি আরোপ করবে না। কারিগরি ও সামরিক বাধা অপসারণ এবং মাইন নিষ্ক্রিয়করণ কাজের মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পূর্ণমাত্রায় পুনরায় শুরু হবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ইরান ও ওমান আলোচনা করবে। ৬. তিনশ’ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা : যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে তিনশ’ বিলিয়ন ডলারের একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, যা ভবিষ্যৎ চুক্তির অংশ হবে। ৭. সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গভর্নর বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ৮. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার : ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা উন্নয়ন করবে না। দুই দেশ সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের মজুদ নিষ্পত্তির বিষয়ে একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে। এর ন্যূনতম পদ্ধতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেশীয় পর্যায়ে উপাদানগুলোর সমৃদ্ধি কমানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। একইসঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ইরানের পারমাণবিক চাহিদা সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। ৯. চূড়ান্ত চুক্তির আগ পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা : চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয়পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার বিদ্যমান পারমাণবিক কর্মসূচি অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করবে না। ১০. তেল রপ্তানিতে তাৎক্ষণিক ছাড় : সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র এমন ছাড়পত্র জারি করবেÑ যাতে ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানি এবং ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা পরিচালনা করা যায়। ১১. জব্দকৃত ইরানি তহবিল অবমুক্তকরণ : সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা হবে। আলোচনার সময় উভয়পক্ষ এই তহবিল অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে একমত হবে। ১২. বাস্তবায়ন তদারকি ব্যবস্থা : সমঝোতা স্মারক এবং পরবর্তী চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন করা হবে। ১৩. চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু : সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে। ১৪. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন : চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা দেয়া হবে।
সমঝোতা ও ইরানের সাফল্য : এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইরান-মার্কিন শান্তি সমঝোতা স্মারক সম্পাদন ইরানের পক্ষে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। মার্কিন আগ্রাসনের বিপক্ষে ইরানের দৃঢ়চেতা মনোভাব পরাশক্তি আমেরিকার সকল অহংকার ও দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক ইরান আক্রমণের ফলে আমেরিকা দেশ ও বিদেশে তীব্র সমালোচনা ও চাপের মুখেই পড়েনি, যুদ্ধে আমেরিকা বিপুল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ধসের মধ্যে পড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন ফরেন পলিসির এক বিশ্লেষণ মতে, এই যুদ্ধে আমেরিকার কৌশলগত লক্ষ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি সৃষ্টি হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি মিসাইল হামলায় তছনছ হয়ে পড়ে, তেহরানে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন-ইসরাইল পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং হরমুজে মার্কিন অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং মুখ রক্ষার জন্য আমেরিকা অবশেষে ইরানের শর্ত মেনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে বাধ্য হয়। তাই এই সমঝোতা চুক্তিকে অধিকাংশ বিশ্লেষক ইরানের একক সাফল্য হিসেবেই দেখছেন। কাতার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মুসগ্রেভ এক নিবন্ধে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়কে ভিয়েতনামের চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন।
সমঝোতা স্মারকের শর্ত মতে, ইরান যেসব সুবিধা পেতে যাচ্ছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ এক. ইরান বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্যাস ও তেল উত্তোলনকারী দেশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ইরানের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে দেশটি নির্বিঘ্নে তেল ও গ্যাস রফতানি করতে পারেনি। চুক্তির কারণে ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। ফলে ইরান প্রতি বছর ছয় থেকে সাত হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, যা দেশটির অর্থনীতিকে মধ্যপ্রাচ্যের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই. আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানকে তিনশ’ বিলিয়ন অর্থায়ন করবে, যা দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সহজ করবে। তিন. বিভিন্ন দেশে আটককৃত বিশ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ইরান ফেরত পাবে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যেই অবমুক্ত করা হয়েছে। এই অর্থ ইরান তার দেশের সমৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করতে সক্ষম হবে। চার. ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘসময় আলোচনার যে পথ রুদ্ধ ছিল, তার আপাতত অবসান হয়েছে। পাঁচ. চুক্তির শর্তানুযায়ী লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধ হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। ছয়. হরমুজ প্রণালীতে ইরান ও ওমানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি লাভ করেছে।
আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরান ইচ্ছা করলেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। মোটকথা যুদ্ধ ও চুক্তি উভয় ক্ষেত্রেই ইরানের অকল্পনীয় সাফল্য দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ সমঝোতায় ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আমেরিকাকে নিজেদের শর্তে রাজি করার যে চমক ও সাফল্য দেখিয়েছে, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল ঘটনা বৈ কি। ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ সমঝোতার সফলতা নিয়ে যথার্থই বলেছেন। তিনি বলেন, ‘সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।’
ইসরাইলের জন্য দুঃস্বপ্ন : অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চুক্তি ইসরাইলের জন্য রাজনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যে আমেরিকা তার চির বন্ধু ও বরকন্দাজ রাষ্ট্র ইসরাইলের প্ররোচনায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটিকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাকে বাদ দিয়েই আমেরিকা ইরানের সাথে সমঝোতায় উপনীত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হতবাক করে দিয়েছে। ফলে ইসরাইল শুধু রাজনৈতিকভাবেই চরম লজ্জার শিকার হয়নি, এটি ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং মার্কিন আনুকূল্য লাভের পথকে থমকে দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে এতদিন তেলাবিবের যে প্রভাব ছিল, তা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের ফলে গ্রেটার ইসরাইল কায়েমের জায়নবাদী স্বপ্ন ও পরিকল্পনা আপাতত ভেস্তে গেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা যে পরিস্থিতিতে ইরানের সাথে সমঝোতায় উপনীত হতে বাধ্য হয়েছে, তার ফলে ভবিষ্যতে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে কোনো সংঘাত সৃষ্টি হলে আমেরিকার পক্ষে ইসরাইলে অবারিত সমর্থন ও সাহায্য অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থা নিঃসন্দেহে ইসরাইলকে তার বেপরোয়া আগ্রাসী মনোভাব পরিহার করতে বাধ্য করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ ও ইরানের প্রভাব : সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল-মার্কিন ত্রিমুখী সংঘাত ও সর্বশেষ রাজনৈতিক সমঝোতার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিমমণ্ডলে ব্যাপক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ সর্বগ্রাসী সামরিক অভিযানকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা, হরমুজ প্রণালীতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও এর জলসীমায় সকল জাহাজ চলাচল বন্ধ করা, অত্যাধুনিক মিসাইল প্রযুক্তির সাহায্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া এবং প্রায় তিন মাসব্যাপী যুদ্ধে একাধারে প্রায় সাতটি দেশের ওপর আঘাত হেনে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মাধ্যমে ইরান বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তির সামর্থ্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তার গ্যারান্টর হিসেবে যে সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতের পরিণতি থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, তা প্রমাণ করতে পেরেছে। এর ফলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তির দেশ হিসেবে নিজেকে বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছে। পরিণামে মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। ইরানের সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আরব বিশ্বে নতুন গতিপথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইতোমধ্যে রিয়াদ, আঙ্কারা, কায়রো ও ইসলামাদের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সূচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও আমেরিকার বিশ্বস্ত বন্ধু আরব আমিরাত ইরানের প্রচণ্ড চাপের মুখে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গ ছাড়ার চিন্তাভাবনা করছে এবং এতদিনের শত্রু দেশ ইরানের সাথে সমঝোতা করে চলার ইঙ্গিত দিয়েছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইরানের সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তেহরানের অবস্থানকে আরও স্থায়ী ও শক্তিশালী করেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকা ও পশ্চিমাদের সঙ্গ ছেড়ে ইরানের সাথে সমঝোতার পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে বলে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন।
সর্বশেষ : গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত মোতাবেক ২১ জুন ইরান-আমেরিকা প্রথম দফার শান্তি আলোচনা সুইজারল্যান্ডের বুরগেনস্টকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও আমেরিকার প্রতিনিধিদলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়। আমেরিকার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সদস্যরা ছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। মুহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে ইরানের প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাগচি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুন নাসের হেমমাতি ও তেল উপমন্ত্রী হামিদ বুরুদ। আলোচনায় মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সাইয়েদ আসীম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আলসানি উপস্থিত ছিলেন। সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এরই মধ্যে লেবাননে ইসরাইলের ভয়াবহ হামলার জন্য ইরান আলোচনার শুরুতে প্রতিবাদস্বরূপ হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলে বুরগেনস্টকে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং আলোচনা ভেঙে যাবার উপক্রম হয়। কিন্তু পাকিস্তান ও কাতারের কার্যকর হস্তক্ষেপে আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পুনরায় এগিয়ে চলে।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা আলোচনায় যেসব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা হলো, ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য রোডম্যাপের বিষয়ে সকল পক্ষের সম্মতি প্রদান। মধ্যস্থতার ওপর রাজনৈতিক তদারকি করার জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে একমত পোষণ। লেবাননে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধের জন্য ইরান ও আমেরিকা মিলে লেবাননে একটি ‘দ্বন্দ্ব নিরসনকারী সেল’ গঠনে ঐকমত্য পোষণ। তেহরানের তেল রপ্তানি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান।
আশা করা যায়, সবকিছু ঠিক থাকলে ইরান-মার্কিন শাস্তি আলোচনা সামনের দিনগুলোয় সফলভাবে এগিয়ে যাবে। তবে এই আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করছে আমেরিকার বিশ্বস্ত ও ইসরাইলের পরবর্তী কৌশলগত আচরণের ওপর। সেই পর্যন্ত সকল পক্ষকে শান্তির জন্য নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সিনিয়র ইসলামী ব্যাংকার।