আর কোনো ছাড় নয়


২৫ জুন ২০২৬ ১০:৩৬

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ভূখণ্ড সৃষ্টি করেছেন, যার সবকিছুই ভালো এবং বসবাস উপযুক্ত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এই ৫৫ বছরে ভালো শাসক পেলাম না। বিশেষ করে গত ১৬ বছরে হাসিনা সরকার দেশটাকে সবদিক থেকেই বসবাস উপযোগী রাখেনি। ফলে ছাত্র-জনতার প্রবল চাপে ভয়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে দলবল, মসজিদের ইমাম, হাইকোর্টের বিচারপতিসহ।
বর্তমানে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে ঘর সামলাতে পারছে না বলেই মনে হচ্ছে। প্রায় চার মাসের এই সরকার তার দলের লোকদের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কোনো খাতেই তাদের প্রভাব কাজে লাগাতে পারছে না। এই গত কয়েকদিন পূর্বে এক এমপির ছেলেকে চাঁদাবাজির কারণে পুলিশ আটক করতে বাধ্য হয়েছে। আবার মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছে। সড়ক, হাটবাজার, ঘাট থেকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি কমানো যায়নি। হাতবদল হয়েছে মাত্র হাসিনার স্বৈরাচার থেকে বর্তমান সরকারের লোকজনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথাও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না। কয়েকদিন পূর্বে গাইবান্ধায় ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাকে সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দিনে-দুপুরে হত্যা করল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ভূমিকা প্রকাশ্যে আসেনি। পাবনার ভাঙ্গুড়ায় আরেকজন ছাত্রকে একই কায়দায় সরকারি দলের লোকেরা হত্যা করল। এছাড়া গ্রাম-গঞ্জে, শহর-বন্দরে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে, যা মিডিয়ায় আসছে না। এর প্রতিকার অবশ্যই করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সব লোককেই গত ১৬ বছরের স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সময়ে চাকরি দেয়া। তারা তো সব জায়গায় স্বৈরাচারী কায়দায় দখল বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি করে টাকা কামাইয়ের পথ করেছিল। থানায় নিয়ে অকথ্য ভাষা ব্যবহার, মারধর, অত্যাচার করা ছিল তাদের নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমারও যেহেতু থানা ও জেলের ভাত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে, তাই বাস্তবতার সাথে আমারও অভিজ্ঞতা কম নয়। যদিও দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করার কারণে সব সরকারের সময় নিচের ও ওপরতলার লোকদের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তাদেরও পরামর্শ দেয়ার সুযোগ হয়েছে। সব দলের সরকারি দলের লোকদের একাংশের সাথে ভালো পরামর্শ দেয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর অভিজ্ঞতা আছে।
এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর ধানমন্ডি থানার উদ্যোগে লোকাল ও ওপরের প্রশাসনিক লোক ও স্থানীয় সব দলের লোকেরা মিলে একটি মতবিনিময় সভা ধানমন্ডি লেকপারের রেস্টুরেন্টে করা হয়েছিল। আমার পরামর্শ ছিল- আমরা যারা রাজনীতি ও সামাজিক লোকেরা এখানে উপস্থিত আছি, তারা যদি একমত হয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করি, তবে ধানমন্ডি এলাকয় শান্তি-শৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি।
এই কয়েকদিন পূর্বে সংসদে বিরোধীদলের নেতা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা যদি এখানের উপস্থিত সংসদ সদস্যরা যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করি আর চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় না দিই, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে এবং চাঁদাবাজি, দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা সম্ভব হবে। সংসদে জনগণের টাকা খরচ করে দেশের জনগণের উপকারের বাস্তব পরামর্শের পরিবর্তে কার পরনের কাপড় কেমন? ঋণখেলাপি আর ঋণগ্রস্ত নিয়ে সময় নষ্ট করা হয়, তবে দেশের উপকার কীভাবে হবে?
মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতা কিন্তু আগের মতো নেই। তারা খুবই সচেতন। মিডিয়ায় প্রচারের ফলে ছাত্র-জনতা কিন্তু সব খবরই রাখে এবং উপলব্ধি করে। কারো গোপন কথাই গোপন থাকে না। ঘরের চার দেয়ালের ভেতরের খবরও দ্রুতই বাইরে চলে আসে। তাই আসুন, আর জনগণের ক্ষতি করার চিন্তা না করে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই বসবাস উপযোগী দেশ গড়ে তুলি।
সংসদে যেমন পূর্বের সবসময়ের পরিবেশ দূরে ফেলে সহাবস্থানের সংসদ চলছে সরকারি ও বিরোধীদলের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। ভালো কাজের সহযোগিতা, মন্দ কাজের বিরোধিতা করার মধ্যেই এই ৪ মাস সংসদ চলছে দেশের উপকারের স্বার্থে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এখনো অনেকে যেহেতু আগের স্বৈরাচার সরকারি দলের লোক, তাই তাদের দ্বারা দেশের আইনশৃঙ্খলা সঠিকভাবে মেইনটেইন করা সম্ভব হবে না। তাদের জনবান্ধব বাহিনী করার জন্য নৈতিক ও বাস্তবসম্মত কর্মপদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নতুন লোক নিয়োগ দিতে হবে। সৎ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে পতিত স্বৈরাচার বিভিন্নভাবে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তা শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। এখানে কোনো ছাড় নেই। যারা জনগণের ভয়ে পালাতে বাধ্য হয় তারা আর জনগণের ভালোবাসা পায় না। তাই স্বৈরাচার হাসিনা ও তাদের দোসররা আর দেশে ফিরতে পারবে না। বরং তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে বিচার করে সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তার দোসরদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আশা করা যায়, শেখ হাসিনার তৈরি করা ট্রাইব্যুনালেই তাদের বিচার হচ্ছে। তাদের বিচারের মাধ্যমেই সাজা নিশ্চিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা সফল হয়নি। ইতোমধ্যেই সরকার ও বিরোধীদল একই জাতীয় প্রোগ্রাম করে জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের সব ধরনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যেই ১০ দিনের জন্য সামরিক বাহিনীকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। আপাতত ৬ জেলায় কাজ শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের এরেস্ট করতে সক্ষম হয়েছে এবং হবে।
জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা ২৩ জুন দেশের সব জায়গায় মিছিল-মিটিং করে স্বৈরাচারদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে। অন্যদিকে স্বৈরাচারের দোসররা হিন্দুদের মন্দির ভাঙার ভুয়া অভিযোগ তুলে উসকানি দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, তেমনি বিএনপি-জামায়াত-শিবির দলকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোনোভাবেই তাদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। গাজীপুরের ঘটনা দুঃখজনক। পুলিশের সামনে আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে পুলিশকে দমক দেয়া খুবই আপত্তিকর। পুলিশকে কোনোভাবেই ভয় পাওয়া যাবে না বা ফ্যাসিস্টের দোসরদের কোনো ছাড় দেয়া যাবে না।
গোটা দেশে বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ সব সরকারি ও বিরোধীদলগুলো শক্ত হাতে দাঁড়াতে হবে আওয়ামী দেশবিরোধী লোকদের বিরুদ্ধে। কোনো ছাড় দেয়া যাবে না আর তারা কোনোভাবেই জনগণের পাত্তা পাবে না। আমি আবারও বলছি, মাত্র-জনতা অনেক সচেতন। স্বৈরাচারদের খবর পেলেই উত্তম-মধ্যম দিয়ে পুলিশে দিয়ে দিতে হবে।
২৩ জুনকে কেন্দ্র করে দালাল মিডিয়ার প্রচারে জনগণকে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিল যে, স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসররা মনে হয় এইমাত্র এয়ারপোর্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব খবর দেখে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে আমাদের জমিতে চাষবাস দেখার জন্য মাঠে যেতাম। গরুর মাধ্যমে লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করা হতো। মাঝেমধ্যে গরু লাঙ্গলের জোঁয়াল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ত। ঐ গরুকে ঐদিন আর লাঙ্গলে জড়িত করা যেত না। আবার ঐতিহাসিক বাদশাহ আবরাহার কাবা ধ্বংসের যাত্রায় এসে কাবার কিছুদূরে মুজদালাফা এলাকায় তার হাতির দল আর এগোতে নারাজ হয়ে গেল। ঐ হাতির দল কিন্তু আর সামনে নিতে পারেনি। ঐ শক্তিধর কাফের আবরাহাকে আবাবিল পাখি দিয়ে যা করার আল্লাহ তা ঘটিয়ে দিলেন। আবরাহার লাশের খবরও পাওয়া গেল না।
তাই শেখের বেটি পালাবে না বলে দুপুরের খাওয়া টেবিলে রেখেই জীবন নিয়ে দাদার বাড়িতে পালাতে বাধ্য হলেন ছাত্র-জনতার রোষের কারণে এবং তার ১৬ বছরের গুম, খুন আর আয়নাঘরের নির্যাতনের সাজা হিসেবে। তাই ঐ স্বৈরাচার হাসিনা ও স্বাধীন দেশে জীবন নিয়ে ফিরে আসবেন, তা কল্পনায় হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে হবে না। তার কবর বাংলাদেশে হবে কিনা, দেখার অপেক্ষায় দেশের জনগণ। আর এই ২৩ জুন আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনায় জড়িত।
বাংলাদেশের স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা তার কিছু মীরজাফরের কারণে পরাধীনতার কবলে পড়তে বাধ্য হয়। তাও মনে করে পরাধীনতার গ্লানি।
তাই এদেশের ২০ কোটি ছাত্র-জনতা আর কোনো দালালের কবলে পড়তে চায় না। দালাল সে যেই হোক, দল-মত নির্বিশেষে তাদের রুখে দিয়েছে। আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই। তাই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে- যাতে করে কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে কারো ওপর ভর করে এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে না পারে।
এবারে দেখা গেল সরকারি দল ও বিরোধীদলসমূহ সজাগ দৃষ্টি রেখে আওয়ামীদের হম্বিতম্বি রুখতে একযোগে শহর-বন্দর, মফস্বলে মিছিল-মিটিং করেছে। জোর গলায় আওয়াজ দিয়েছে দেশের দালালদের জায়গা বাংলার মাটিতে হবে না। তাই তো যতই মিডিয়ায় প্রচার হোক, আওয়ামী দালালদের কিন্তু দেশের কোথাও বাস্তবে দেখা যায়নি। দেশের ২/১ জায়গায় ঘাপটি মেরে চোরের মতো হঠাৎ করে কয়েকজন মিছিল করার অপচেষ্টা করেছে। তারা বেশিরভাগ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। দেশের ৬ জেলায় সেনাবাহিনী পাহারা দিচ্ছে। পুলিশ-বিজিবি সতর্ক আছে। আর ছাত্র-জনতা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। কোনো ছাড় নেই। তাদের এ দেশে স্থান নেই।
সরকারকে পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন নিয়োগ দিতে হবে দেশদরদি সৎ, যোগ্য লোক। আমাদের দেশের ছাত্র-জনতা সবসময়ই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। আমরা কম খেয়েও স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। আমাদের নতুন প্রজন্মকে সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই।
ইতোমধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির ডাকসু, চাকসু, জকসু, জাকসু, রাকসুতে পূর্ণ প্যানেলে ছাত্র সংসদের জিতে সব জায়গায়ই লেখাপড়ার পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ থাকলে কোনো দালাল গোষ্ঠী দেশে অরাজকতা করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।
বিরোধীদলের নেতা জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, আমরা দেশের জন্য প্রাণ দেব, কিন্তু কারো অধীনতা মেনে নেব না। সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার জন্য লড়াই করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব, সাথে সাথে জনগণের ভাত-কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তার গ্যারান্টি আদায় করব।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com