সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার

আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা


২৫ জুন ২০২৬ ০৯:৫১

॥ জামশেদ মেহেদী ॥
আপাতদৃষ্টে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট অত্যন্ত শান্ত ও সমাহিত। দেশের কোথাও কোনো গোলযোগ নাই, হুলুস্থুল কারবার নেই। অনেকটা কাব্যের ভাষায়, ঐ দিঘির পানির মতো শান্ত ও অচঞ্চল। কিন্তু এমন বাহ্যিক শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান জনগণের প্রতি প্রয়োজনে আরেকটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। কেন তিনি এ কথা বলেছেন? এ প্রশ্ন অনেকের মনেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী ফলাফল জামায়াত ও ১১ দলের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল না। তারপরও তারা সেই ফলাফল গ্রহণ করেছে এবং যথারীতি সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত দেখাতে চেয়েছে যে, জামায়াত অশান্তি ও অস্থিরতায় বিশ্বাসী নয়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তারা ধৈর্য ধরতে জানে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও ধৈর্য ধরতে পারে। গত নির্বাচনের ফলাফল যে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের হৃদয়ে ধিকিধিকি আগুনের মতো জ¦লছে, সেটি আমীরে জামায়াতের খুলনায় প্রদত্ত এক জনসভার ভাষণ থেকে জানা যায়।
গত ২১ জুন রোববার ইংরেজি ডেইলি স্টারে ডাবল কলামে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম, ‘Jamaat accepted polls results to avoid civil war’. অর্থ, দেশে গৃহযুদ্ধ এড়ানোর জন্যই জামায়াত নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছে। খবরে যা বলা হয়েছে, তার অংশবিশেষ বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় নিম্নরূপ-
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করে আমীর জামায়াত ড. শফিকুর রহমান ২০ জুন বলেন যে, নির্বাচনী ফলাফলে জামায়াতের গুরুতর অভিযোগ থাকলেও একটি গৃহযুদ্ধ এড়ানোর জন্য দলটি নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে বিশৃঙ্খলা চাই না। আমরা দেশকে ভালোবাসি। আমাদের হৃদয়ে গভীর যন্ত্রণা নিয়েও আমরা এই নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছি। কিন্তু তাই বলে কেউ যেন ভাববেন না যে, কোনো প্রকার ভয়ভীতির কারণে আমরা এই ফলাফল মেনে নিয়েছি। দেশ যাতে কোনো গৃহযুদ্ধে নিক্ষিপ্ত না হয়, সে কারণেই আমরা এই ফলাফল মেনে নিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘কারো হুমকিতে আমরা ভীত হবো না। আমরা বেইনসাফির কাছে মাথানত করবো না। আমাদের নেতারা ফাঁসির মঞ্চেও হাসিমুখে দাঁড়িয়েছেন। তারা আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, প্রয়োজন হলে আমরাও দেশের জন্য সর্বোচ্চ কুরবানি দিতে পারি।’
তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং জনরায়কে অশ্রদ্ধা করেছে। সম্মান এবং শক্তি নিয়ে একটি বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনে আরেকটি অপরিহার্য বিপ্লবের জন্য তার দলের সমর্থক এবং জনগণকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান আমীরে জামায়াত। তিনি অভিযোগ করেন যে, চুরি করে, ডাকাতি করে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং করে জনগণের ভোট ছিনতাই করা হয়েছে। আমরা এর বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে লড়াই করে যাবো। তিনি এই মর্মে হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি জাতীয় সংসদে এর কোনো সমাধান না হয়, তাহলে তারা রাজপথে যেতে বাধ্য থাকবেন। তিনি আরো হুঁশিয়ারি দেন যে, ‘From the fields of Khulna, Barishal, Chattogram, Cumilla, Sylhet, Mymensingh, Rangpur, Rajshahi and Bogura, volcanoes will emerge. In the wildfire of those volcanoes, all rubbish will be reduced to ashes.’ বাংলা অনুবাদ : ‘খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী এবং বগুড়া থেকে ভলকানোর মতো জনবিস্ফোরণের অগ্নুৎপাত ঘটবে। সেই দাবানলে সমস্ত আবর্জনা ভস্মে পরিণত হবে।’
তিনি এই মর্মে সরকারকে সাবধান করে দেন যে, যদি তারা কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথানত করে, তাহলে তাদের ছাড়া হবে না। তিনি বলেন, আমরা কোনো প্রতিবেশীর শান্তি নষ্ট করতে চাই না। তবে সাথে সাথে আমরা এটাও চাই না যে, কোনো প্রতিবেশী তার কালো হাত আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিক। যদি আমাদের দিকে কোনো কালো হাত প্রসারিত হয়, তাহলে আল্লাহর সাহায্যে আমরা সেই হাত ভেঙে দেবো।
আমরা আমীরে জামায়াতের দীর্ঘ বক্তব্যের একটি অংশ উদ্ধৃত করলাম। উদ্ধৃতিটা কিছুটা বড় হয়ে গেল। তারপরও আমরা তার সুদীর্ঘ বক্তৃতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করলাম। এ কারণেই করলাম যে, এর মাধ্যমে সচেতন পাঠক এবং জনগণ বুঝতে পারবেন যে, ওপরে ওপরে পরিস্থিতি যতটা শান্ত মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি ততটা শান্ত নয়। নির্বাচনী ফলাফল থেকেই জামায়াতসহ জনগণের মনে বিপুল ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রবল বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
আমীরে জামায়াতের এই কঠোর সতর্কবাণীর একটি পটভূমি রয়েছে। জামায়াত সবসময় হিসাব-নিকাশ করে কথা বলে। পল্টন বা শাহবাগী ডেমাগগের মতো কথা বলে না বা বক্তৃতা করে না। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে ৪ মাস ৭ দিন হলো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পূর্বাহ্নে তারা জনরায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নির্বাচনের পটভূমি ছিল পরিষ্কার এবং দ্ব্যর্থহীন। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে ঐকমত্য কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আলী রীয়াজ ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে প্রাণান্তকর চেষ্টা করা হয়- যাতে করে দেশের সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে সর্বদলীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সেই ঐকমত্যই হবে জুলাই সনদ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। সংবিধান সংস্কারের প্রধান ২৩টি বিষয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট, অর্থাৎ আপত্তি জানায়। ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রকাশ করে, যেখানে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জুলাই সনদে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত সন্নিবেশ করা হয়। কথা ছিল, জুলাই বিপ্লবে হাজার হাজার শহীদ এবং হাজার হাজার আহতের বিপুল ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি সর্বসম্মত জুলাই সনদ প্রণীত হবে এবং সেটি সংবিধানের অংশ হবে।
কিন্তু শেষ চেষ্টার ফলেও মতৈক্য না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ৩৩টি রাজনৈতিক দল এবং ৫ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে ম্যারাথন আলাপ-আলোচনা শেষে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরূপ সিদ্ধান্ত হয় যে, দেশে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার জারি করা হবে। এই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সর্বদলীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় ঐকমত্য কমিশন কতিপয় সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসংবলিত একটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে।
প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে অন্তর্ভুক্ত ঐ অধ্যাদেশে বলা হয় যে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঠিকই হবে। কিন্তু ঐ নির্বাচনের থাকবে ২টি অংশ। একটি হলো সংসদ সদস্যদের নির্বাচন। আরেকটি হলো গণভোট। ঐকমত্য কমিশন যেসব সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে সেগুলোর ওপর গণভোট হবে। জনগণ যদি গণভোটে ঐসব প্রস্তাবের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দেয়, তাহলে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যরা যুগপৎ সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও সদস্য হবেন। নির্বাচিত সদস্যরা ২টি শপথ গ্রহণ করবেন। একটি এমপি হিসেবে, আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার জারি হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। এই অর্ডারের ব্যাপারে বিএনপির যদি কোনো আপত্তি থাকতো, তাহলে তারা এই অর্ডার জারির পূর্বে বা পরে সেটি জানাতে পারতো। অর্ডার জারি হওয়ার ৩ মাস পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই ৩ মাসে বিএনপি কোনো আপত্তি উত্থাপন তো করেইনি, বরং তারাও এই অর্ডারকে গ্রহণ করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
যথারীতি ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের সংসদ সদস্যদের নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটার সংস্কার প্রস্তাবসমূহের স্বপক্ষে হ্যাঁ ভোট দেন। এর ফলে সংস্কার পরিষদ গঠন ম্যানডেটরি হয়ে যায় এবং সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করার গণরায় আসে।
১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন। তারা ২টি শপথ নেবেন, এমন প্রস্তুতি ছিল নির্বাচন কমিশনের। বিএনপির সদস্যরা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে অস্বীকার করেন। পক্ষান্তরে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন সদস্য এমপি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, আবার যুগপৎ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন।
সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করার পক্ষে যুক্তি হিসেবে বিএনপি বলে যে, প্রেসিডেন্টের নাকি ঐ ধরনের কোনো অর্ডার জারির ক্ষমতা আদৌ নেই। তাই তারা শপথ গ্রহণ করবে না। যখন বলা হয় যে, তারা তো গণভোটেও অংশগ্রহণ করেছে, এখন শপথ না নিলে গণরায়কে অস্বীকার করা হবে। তখন বিএনপি বলে যে, সংবিধানে গণভোটের কোনো প্রভিশন নেই।
প্রায় সাড়ে ৪ মাস হলো নির্বাচন হয়ে গেছে। সরকারও গঠন হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। বিএনপি সরকার এর মধ্যে ১২ জন সংসদ সদস্যের একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। এই কমিটিতে বিরোধীদল থেকে ৫ জন সদস্যের নাম প্রেরণের আহ্বান জানায় সরকার। কিন্তু আমীরে জামায়াত বলেন, এই পার্লামেন্ট কর্তৃক বর্তমান সংবিধান সংশোধন কল্পে কোনো কমিটিতে তারা অংশ নেবেন না। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো কমিটি হলে তারা নাম দেবেন। কারণ সেটি হবে গণভোটে প্রদত্ত গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখানো।
এই হলো সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে বিরাজমান বিরোধের নির্যাস (Crux of the problem) এই বিরোধ সংসদের ফ্লোরে নিষ্পত্তি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এটি যে সংসদে নিষ্পত্তি হবে না, সেটি রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তাই এই জ¦লন্ত বিরোধের সমাধান হবে রাজপথে। সংবিধান সংস্কারের ইস্যুটি রাজপথে ফয়সালা হতে গেলে সেটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পথে হয় না। সেটি হয় গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মাধ্যমে, যেমন শেখ হাসিনাকে বিতাড়ন করা হয়েছে সংবিধান মোতাবেক নয়। তাকে বিতাড়ন করা হয়েছে রাজপথের বিপ্লবে। আমীরে জামায়াত গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে তেমন একটি বিপ্লবের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছেন এবং সেজন্যই জনগণকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com