বাংলা সাহিত্যে পলাশী
২০ জুন ২০২৬ ১১:১৪
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
বাংলা সাহিত্যে ‘পলাশী’ একটি অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং প্রেরণার প্রতীক। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। পলাশী যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও গভীর। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর বেদনা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের উত্থান, বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায়; বিশেষ করে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় কালজয়ী মহাকাব্য, নাটক ও উপন্যাস রচিত হয়েছে, যা দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫); কবি নবীনচন্দ্র সেন রচিত ‘পলাশীর যুদ্ধ’ বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এতে পলাশী যুদ্ধের করুণ পরিণতি ও ব্রিটিশদের আগমনকে কেন্দ্র করে গভীর স্বদেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তার চরিত্র হননের অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। কায়কোবাদের মহাশ্মশান (১৯০৪); যদিও এটি পানিপথের যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত, তবু এর মূল সুর ও প্রেরণা ছিল পলাশীর ট্র্যাজেডির মতোই বেদনাবিধুর। সিরাজউদ্দৌলা (১৯৩৮); নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মঞ্চসফল ও জনপ্রিয় ঐতিহাসিক নাটক। নবাবের দেশপ্রেম, ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া এবং তার করুণ পরিণতি এতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। কবি ও নাট্যকার সিকান্দার আবু জাফর তার লেখা সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৫) নাটকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং নবাবের আপসহীন মনোভাব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এতে নবাবের ট্র্যাজিক পরিণতি ও মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরা হয়। পলাশীর প্রায়শ্চিত্ত (১৯২৯); মন্মথ রায় রচিত নাটক, যা পলাশী-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরে।
পলাশীর পর বক্সার (১৯৫৮); ইতিহাসবিদ ও লেখক তপন মোহন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বই পলাশীর পটভূমি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বোঝার জন্য বাংলা সাহিত্যে প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য হয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও উপন্যাসেও কাসিদের মতো বই দিয়ে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র ও তদানীন্তন সামাজিক চিত্র নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে সতীনাথ ভাদুড়ী, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ প্রমুখ কথাসাহিত্যিকের লেখায় পলাশী ও তার পরবর্তী বাংলার আর্থসামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র পাওয়া যায়। ঔপনিবেশিক আমলের পর থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চায় পলাশীকে শুধু একটি যুদ্ধ হিসেবে না দেখে, ‘বাঙালির রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের ইতিহাস-সাহিত্য বা বিভিন্ন প্রবন্ধে পলাশীর যুদ্ধের পেছনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে পলাশী মূলত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘স্বাধীনতা হারাবার বেদনা’ এবং ‘নবজাগরণের প্রেক্ষাপট’Ñ এ তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মের এক বছর আগে ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত বাংলা গদ্য এবং ইতিহাসচর্চার ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ গ্রন্থ ‘সিরাজউদ্দৌলা’য় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় লেখেন, ‘সিরাজউদ্দৌলা কলঙ্ক-কাহিনীতে স্বদেশ-বিদেশ সমাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। কলঙ্কের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। কলঙ্ক সৃষ্টির ইতিহাস সেরূপ নহে।’ এ কথাগুলো যখন লেখা হয়, তখন পলাশী বিপর্যয়ের পর পেরিয়ে গেছে ১৪১ বছর। অর্থাৎ এই ১৪১ বছর ধরেই বাংলা বিহার ঊড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রহননের কাজটি ‘অত্যন্ত নিষ্ঠার’ সঙ্গে অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার। পথে প্রান্তরে সিরাজউদ্দৌলাকে হেয় করার জন্য, তার ভাবমূর্তি বিনাশ করার জন্য ছড়িয়ে দিয়েছিল ভাড়াটে লোকজন। গুজব ও গল্প ইতিহাসের নামে তাই চলে আসছিল তখন পর্যন্ত; এমনকি এখনো। এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑ যে জটিল কুটিল ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, জালিয়াতি, বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে বিদেশি ও দেশি বণিক, সমরনায়ক, রাজনীতিবিদ ও আমলারা পলাশীতে জয় পেয়েছিল এবং সিরাজউদ্দৌলাকে করেছিল নির্মমভাবে হত্যা, তাকে ভিন্ন খাতে বইয়ে দিয়ে সিরাজকে ‘ভিলেন’ বানানো।
কারণ সিরাজকে ‘ভিলেন’ বানাতে না পারলেও, ইংরেজ শাসকরা বুঝেছিল নিজেদের পাপকেও যেমন বৈধ করা যাবে না, তেমনি ‘হিরো’ সাজাও হবে না। সঙ্গত কারণেই বিজয়ীপক্ষ পরাজিতের স্কন্ধকে নিজেদের পাপ স্থাপনের সুউচ্চ মঞ্চ বানিয়েছে। ফলে সত্য হয়েছে মিথ্যা, মিথ্যা পেয়েছে সত্যের সম্মান। আর এ মিথ্যাচার, লোককথা, গল্পকে হিতাহিত বাছ-বিচার না করে ইতিহাসের নামে, গল্পে, কবিতায়, মহাকাব্যে পরিবেশন শুরু করে বাংলাভাষী কবি, নাট্যকার ও গদ্যকাররা। এ মিথ্যাচারকে কাব্য করার ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে বেশি নাম কামিয়েছেন, তিনি হলেন নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯)। তার বহুল আলোচিত মহাকাব্য ‘পলাশীর যুদ্ধ’ (১৮৭৫)-এ প্রধান ষড়যন্ত্রকারী জগৎশেঠের মুখ দিয়ে সিরাজ সম্পর্কে বলেছেন-
কি বলিব আর/বেগমের বেশে পাপী পশি অন্তপুরে,
নিরমল কুল মম-প্রতিভা যাহার/মধ্যাহ্ন ভাস্করসম, ভূ-ভারতজুড়ে
প্রজ্বলিত-সেই কুলে দুষ্ট দুরাচার/করিয়াছে কলংকের কালিমা সঞ্চার।
অতএব রাজবল্লভ সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেনÑ ‘চিন্ত সদুপায়! মম এই অভিপ্রায়/সহৃদয় ইংরেজের লইয়া আশ্রয়/রাজ্যভ্রষ্ট করি এই দুরন্ত যুবায়,/(কতদিনে বিধি বঙ্গে হইবে সদয়!)/সৈন্যাধ্যক্ষ সাধু মীরজাফরের করে/সমর্পি এ রাজ্যভার। মুহূর্তে ক্লাইভ যুদ্ধে হলে সম্মুখীন,/উড়াইবে তৃণবৎ যুবা অর্বাচীন।’
অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় মহাশয়ের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ প্রকাশের পর পলাশী ট্র্যাজেডি নিয়ে আমাদের সাহিত্যের অন্ধকার যুগ স্তিমিত হয়ে আসে। অন্ধকারের কুশীলবরা অন্তত এটা উপলব্ধি করলেন, যা-তা লিখে, কাণ্ডজ্ঞানহীন বিদ্বেষ প্রচার করে, সাম্রাজ্যবাদের আনুকূল্য হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু জনগণের মনের মণিকোঠায় জায়গা পাওয়া যাবে না। আর যারা ব্যথিত ক্ষুব্ধ হৃদয় নিয়ে নির্বিরাম ‘নান্দনিক’ অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছিলেন, তারা এবার জেগে উঠলেন। শুরু হলো পলাশী থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় জাগরণের পথে এগিয়ে চলা। শুরু হলো ‘স্বাধীনতার যুগ’ প্রবর্তনের কষ্টসাধ্য দুঃসাহসী কর্ম।
ব্রিটিশ বেনিয়াদের সঙ্গে দেশি স্বার্থান্ধ উচ্চাভিলাষীদের জটিল কুটিল ষড়যন্ত্রের ফলে পলাশীর প্রান্তরে অস্তমিত হয় স্বাধীনতার সূর্য, যে স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধে প্রতীক ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পলাশীর পরাজয় এবং সিরাজের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতির জীবনে নেমে আসে পরাধীনতার অসহনীয়, অবমাননাকর গ্লানি। সেদিক থেকে পলাশী আমাদের লজ্জা ও কলঙ্কের অধ্যায়। আবার একইসঙ্গে পলাশী আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণেরও ক্ষেত্র। পলাশী উন্মোচিত করে দেশি-বিদেশি বিশ্বাসঘাতকতার স্বরূপ। আবার পলাশী আমাদের অপমানের শরশয্যা থেকে উঠে দাঁড়ানোরও ডাক দেয়। এজন্য ইতিহাসের অন্য দশটি ঘটনার সঙ্গে পলাশীর রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। এ পার্থক্যের কারণেই আজ ২৬৯ বছর পরও পলাশীর ট্র্যাজেডিকে অনুধাবন করার তাৎপর্য ও গুরুত্ব যে অনস্বীকার্য দ্যুতি নিয়ে অনুভূত হচ্ছেÑ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও সেভাবেই অন্তরে ধারণ করেছিল বাংলা সাহিত্য।
পলাশী তথা সিরাজউদ্দৌলাকে মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় আনার প্রথম কৃতিত্ব নাট্যকার গিরিশ চন্দ্র ঘোষের (১৮৪৪-১৯১২)। তিনি ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় ‘গৃহপালিত’ ইতিহাসকারদের কাহিনীর ওপর ভরসা করেননি। গিরিশ ঘোষ বলেন, সুপ্রসিদ্ধ-ঐতিহাসিক বিহারীলাল সরকার, শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, শ্রীযুক্ত নিখিলনাথ রায়, শ্রীযুক্ত কালিপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি শিক্ষিত সুধী অসাধারণ অধ্যবসায় সহকারে বিদেশি ইতিহাস খণ্ডন করিয়া রাজনীতিক ও প্রজাবৎসল সিরাজের স্বরূপচিত্র প্রদর্শনে যত্নশীল হন। আমি ওইসব লেখকের নিকট ঋণী। ফলে ‘সিরাজউদ্দৌলা’য় কিছু মানবিক দুর্বলতা থাকলেও সিরাজউদ্দৌলার জীবনধারাকে অনুসরণ করে নাট্যকার স্বাধীনতার আবেগকে প্রকাশ করেছেন। তৎকালীন সমাজে পরাধীনতার বেদনায় বাঙালির যে চিত্তবিক্ষোভ ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক তার পরিচয় বহন করছে। (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত : মুহাম্মদ আবদুল হাই, সৈয়দ আলী আহসান: পৃষ্ঠা ২৭০)।
বাংলা ১৩১২ সনের ২৪ ভাদ্র এ নাটক প্রথমবার মঞ্চে উপস্থাপিত হয়। ১৯১১ সালে এ নাটকের প্রচার ও অভিনয় নিষিদ্ধ করে ব্রিটিশ সরকার। ক্ষিরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদের (১৮৬৪-১৯৩৭) ‘পলাশীর প্রায়শ্চিত্ত’Ñ এ ধারার আরেকটি নাটক। পলাশীর ঘটনা নিয়ে বাংলা ভাষায় রচিত সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটকটির নাম ‘সিরাজউদ্দৌলা’; নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৯২-১৯৬১)। এ নাটকটি প্রথমবার মঞ্চে আসে ১৯৩৮ সালের ২৯ জুন। মঞ্চস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্জন করে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। পরবর্তীকালে মূলত এ নাটকের ওপর ভিত্তি করে খান আতাউর রহমান নির্মাণ করেন তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। এ নাটক জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল তখন তার বাঁধভাঙা প্রাণপ্রাবল্য নিয়ে খ্যাতির মধ্যগগনে। তিনি এ নাটকটি সম্পাদনা করে দেন। নাটকে ব্যবহৃত ৬টি গান, ‘আমি আলোর শিখা’, ‘ম্যয় প্রেম নগরকো জাউঙ্গী’, ‘কেন প্রেম যমুনা আজি হল অধীর’, ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফিরে একা’, ‘এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা’ ও ‘পলাশী হায় পলাশী’ নজরুলের লেখা। এ নাটকের সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন নজরুল।
মঞ্চের সঙ্গে ১৯৩৯ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬.৪৫ মিনিটে একটানা ২ ঘণ্টা ধরে এ নাটক রেডিওতে প্রচারিত হয়। সিরাজের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা নির্মলেন্দু লাহিড়ী। আলেয়ার সংলাপ দিয়েছিলেন ঊষাবতী, গান গেয়েছিলেন হরিমতী। অবশ্য মঞ্চে কণ্ঠ দেন নীহারবালা। রেডিওতে এ নাটক পরিচালনা করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (১৯০৫-১৯৯১)। এর পরপরই ঐগঠ কোম্পানি থেকে এই নাটকের রেকর্ড বের হয়। রেকর্ডে আলেয়ার গানে কণ্ঠ দেন পারুলবালা ঘোষ। মাঝির গানে কণ্ঠ দেন মৃণালকান্তি ঘোষ। নাটকের পাড়া অতিক্রম করে এ ‘সিরাজউদ্দৌলা’ অচিরেই জায়গা করে নেয় ‘যাত্রা’ দলে। সেদিন থেকে অদ্যাবধি যাত্রার পালায় সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে পরিবেশিত হচ্ছে ‘সিরাজউদ্দৌলা’।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার মঞ্চে নতুনভাবে উঠে আসে সিরাজউদ্দৌলা। এ পর্বের নেতৃত্ব দেন কবি নাট্যকার সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৮-১৯৭৫)। ১৯৫১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় তার নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা’। সিকান্দার আবু জাফর বাংলাদেশের একমাত্র কবি ও নাট্যকার, যিনি কুখ্যাত ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ অপসারণে রাজনৈতিক নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় কলঙ্কস্তম্ভটি চূর্ণ করার চাক্ষুষ সাক্ষী। সঙ্গত কারণেই তিনি তার নাটকের ভূমিকায় বলেন, ‘কাজেই নতুন মূল্যবোধের তাগিদে ইতিহাসের বিভ্রান্তি এড়িয়ে ঐতিহ্য ও প্রেরণার উৎস হিসেবে সিরাজউদ্দৌলাকে আমি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। একান্তভাবে ইতিহাসের কাছাকাছি থেকে এবং প্রতি পদক্ষেপে ইতিহাসকে অনুসরণ করে আমি সিরাজউদ্দৌলার জীবননাট্য পুনর্নির্মাণ করেছি। ধর্ম এবং নৈতিক আদর্শে সিরাজউদ্দৌলার যে অকৃত্রিম বিশ্বাস, তার চরিত্রের যে দৃঢ়তা এবং মানবীয় সদগুণগুলোকে চাপা দেয়ার জন্য ঔপনিবেশিক চক্রান্তকারী ও তাদের স্বার্থান্ধ স্তাবকরা অসত্যের পাহাড় জমিয়ে তুলেছিল, এ নাটকে প্রধানত সেই আদর্শ এবং মানবীয় গুণগুলোকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।’
কবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫২) মূলত মহাকাব্যকার হলেও ‘অশ্রুমালা’ (১৮৯৪) তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে আধুনিক বাংলা গীতি-কবিতার প্রথম কবি কায়কোবাদ। ‘অশ্রুমালা’ কাব্যে প্রকাশিত তার ‘সিরাজসমাধি’ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন- এই সে সমাধি গৃহ-এই স্থানে হায়/বঙ্গের গৌরব-সূর্য চিরঅস্তমিত। এই স্থানে-কি বলিব বুক ফেটে যায়,/স্মরিলে সে কথা প্রাণ হয় আকুলিত। কত যুগ যুগান্তর গিয়াছে চলিয়া,/সিরাজের অস্থি লয়ে ব্যথিত অন্তরে/আজিও সে মøান বেশে আছে দাঁড়াইয়া/হেরিলে তা কার চক্ষে অশ্রু নাহি ঝরে?/নিখিলের এ সমাধি মুহূর্তের তরে,/অতীতের কত কথা পড়ে এই মনে!/কত ঝড় বয়ে যায় প্রাণের ভিতরে,/কত চিত্র ভেসে উঠে নয়নের কোণে!/মনে পড়ে পলাশীর ভীষণ প্রাঙ্গণ,/কুটচক্রী জাফরের ঘোর কৃতঘ্নতা!/বীরশ্রেষ্ঠ ক্লাইভের প্রাণান্তুক রণ,/বাঙালি জাতির চিরকলঙ্কের কথা! হতভাগ্য সিরাজের অন্তিম প্রার্থনা/জাগায় মানব প্রাণে কি তীব্র বেদনা?
এই ‘জাতীয় বীর’ ও স্বাধীনতার যোদ্ধাকে সম্মান জানাতে নজরুলের পরবর্তী কবিরাও পিছিয়ে থাকেননি। গোলাম মোস্তফার (১৮৯৭-১৯৬৫) ‘১৭৫৭ সালের বিপ্লব’, তালিম হোসেনের (১৯১৮-১৯৯৫) ‘সিরাজ স্মরণ’, ‘হায় সিরাজ, সিরাজ’, ফররুখ আহমদের (১৯১৮-১৯৭৪) ‘মীর জাফরের কৈফিয়ত, কবি আল মাহমুদের ‘পলাশীর স্মৃতি ১৯৯৭’, ফরহাদ মজহারের ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’, আবদুল হাই শিকদারের ‘সিরাজদৌলা’, মতিউর রহমান মল্লিকের ‘মীর জাফর’, আসাদ বিন হাফিজের ‘হারজিত’ কিংবা হাসান আলীমের কবিতা একই চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত!
বাংলা সাহিত্যে পলাশী ট্র্যাজেডি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে উপন্যাসে। যদিও দুয়েকটি লিখিত হয়েছে, সেগুলো ইংরেজদের ‘খাস-দালালি’ করার মতলবে। বাকিগুলো অখাদ্য। ফলে একদিকে যেমন ঘটেছে ইতিহাস বিকৃতি; অন্যদিকে দৃষ্ট হয়েছে মুসলিমবিদ্বেষ। সব মিলিয়ে বলা যায়, পলাশী নিয়ে কবিতা, উপন্যাস কিংবা নাটকে আরো বড়, আরো মহৎ কিছু করার সময় শেষ হয়ে যায়নি। তবে সেক্ষেত্রে রচয়িতাকে হতে হবে টেনিসনের মতো সত্যনিষ্ঠ। গায়ের জোরে বদ মতলবতাড়িত হয়ে বাজে কিছু করার চাইতে না করাই তো ভালো। টেনিসন তার বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক ‘বেকেট’র ভূমিকায়, তার নাটকে স্থান পাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের বিদেহী আত্মার উদ্দেশে একটি চমৎকার চতুর্দশপদী কবিতা লেখেন। তার শেষ কয়েকটি চরণ বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ-
আমি যদি তোমাদিগকে এমন কথা বলাই,
যাহা তোমরা বল নাই-
যদি তোমাদিগের সদগুণ বিলুপ্ত করিয়া ফেলি,
এবং তোমাদিগকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে গঠিত করি,
তাহা হইলে, হে প্রাচীন প্রেতাত্মাগণ
আমার উপর ক্রুব্ধ হইও না।
কারণ, যিনি আমাদিগকে ঠিক জানেন,
তিনি জানেন, যে কেহই নিজের একদিনের
জীবনেরও যথার্থ বৃত্তান্ত লিখিতে পারে না।
এবং পৃথিবীতে আর কেহই তাহার জন্য
লিখিয়া দিতে পারে না।
[রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় অনূদিত]
পরিশেষে বলতে চাই- সামগ্রিকভাবে পলাশীর বিপর্যয় বাংলা সাহিত্যকে শেকড়সন্ধানী, ঐতিহ্যসচেতন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পলাশী শুধু একটি হারের গল্প নয়, বরং এটি বাংলা সাহিত্যের পাতায় চিরকালের জন্য প্রতিরোধের প্রতীক। এখানে একদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার দেশপ্রেম; অন্যদিকে ব্রিটিশদের চক্রান্ত ও বাঙালির অন্তর্ঘাত ফুটে উঠেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।