সীমান্তজুড়ে ভারতের পুশইন অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা
১১ জুন ২০২৬ ১০:০১
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
সীমান্তজুড়ে ভারতের একের পর এক পুশইনের ঘটনায় অস্থির হয়ে উঠেছে দুই দেশের সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারতের একতরফা কর্মকাণ্ডে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বছরজুড়ে সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার মহোৎসবের পাশাপাশি পুশইনের এ অবৈধ কর্মকাণ্ড ভারতের আগ্রাসী মনোভাব আবারো নতুন করে উন্মোচিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে যেকোনো ধরনের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ বা প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিলেও ভারত বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে সারা বছর চালায় বিশ্বের নৃশংসতম হত্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বছর শুধু ২০২৫ সালেই ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ৩৯ বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্ত রয়েছে। প্রতিবেশী এই দুই দেশের মাঝে কাঁটাতারের বেড়াসহ মরণঘাতী নেথ্যাল ইউপেন ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। যা বিগত নতজানু আওয়ামী লীগ সরকারেরর সময় মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সরাসরি গুলি করা পৃথিবীর কোনো দেশের সীমান্তে নেই যা ভারত বাংলাদেশের সাথে করে। শেখ হাসিনার সময় বিভিন্ন সীমান্ত বৈঠকে ভারত বারবার বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে মর্মে আশ্বাস দিলেও কোনো কথাই তারা রাখেনি। এমনকি শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্বর্তী ড. ইউনূস সরকারের সময়ও ভারত তার নৃশংস সীমান্ত হত্যা বন্ধ করেনি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের এসব হত্যাকাণ্ডের জোর প্রতিবাদ করে।
পুশইন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনা
দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চলছেই। সেই পুশইন প্রচেষ্টা ঠেকাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। পুশইন ইস্যুতে ভারত স্পষ্ট কথা না বললেও ঢাকা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই পুশইন গ্রহণ করা হবে না। এই ইস্যুটি বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি নতুন স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিক কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও সহযোগিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
পুশইন ইস্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, ঢাকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। অপরদিকে ভারত পুশইন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বার্তা দেয়নি, বরং তারা বলছে অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশের দেয়া একাধিক চিঠি নিয়েও দিল্লি কোনো পদক্ষেপের কথা জানায়নি।
বেশ কয়েকটি সীমান্তে দিয়ে গত মে মাস থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে পুশইনের (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির বাধার মুখে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। কয়েকটি সীমান্তে অনেকে এখনো শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। ভারতের নয়াদিল্লিতে তিন দিনব্যাপী বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে। সেখানে পুশইন নিয়ে আলোচনা হবে। বিজিবি দাবি করেছে, জুন মাসের শুরু থেকে একাধিক ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নারী ও শিশুসহ শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গত কয়েকদিনে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে এমন একাধিক প্রচেষ্টা ঠেকানোর দাবি করেছে।
সীমান্তে পুশইনের ঘটনায় এক ধরনের মানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো- সীমান্তে আটকেপড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে শূন্যরেখায় অবস্থান করতে বাধ্য হন, যা একটি গুরুতর মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এছাড়া পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের তথ্যানুযায়ী, বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। মে ও জুন মাসজুড়ে কতজনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে, তার কোনো সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করছে বিজিবি। পুশইন ঠেকাতে কোনো কোনো এলাকায় বিজিবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছি দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবেই এটি আমরা গ্রহণ করছি না। সম্প্রতি আমরা চেন্নাই থেকে ৩৪ জনকে ফেরত এনেছি। অবৈধ নাগরিকদের আদান-প্রদানে দুই দেশেরই একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে। সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কথা বলতে হবে। আমরা যতরকম ডিপ্লোমেটিক ওয়ে আছে, সেটি ফলো করছি। যখনই পুশইনের ঘটনা আমাদের কানে আসছে বা আমরা দেখছি রিপোর্টিং হচ্ছে, আমরা কিন্তু তাদের চিঠি দিচ্ছি। আমরা আশা করব, ভারত সরকার এটা সিরিয়াসলি নেবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের কাজটি তারা সমাধান করবে। কোনোভাবে পুশইনের মাধ্যমে যদি তারা করে, তাহলে অবশ্যই সেটি আমাদের জন্য ভালো হবে না। তিনি বলেন, এভরি কেস, এভরি ইভেন্ট ডিফারেন্ট। একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত না। ভারতের সরকার যদি এটা সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে আমাদের জন্য সম্পর্কটা এগিয়ে নেয়া অনেক সহজ হবে।
অপরদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেন, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন মেনে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। এছাড়া বাংলাদেশের কাছে অবৈধ বাংলাদেশিদের তালিকা দেয়ার কথাও জানিয়েছেন জয়সওয়াল। আর তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুশইন ইস্যুকে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা উচিত। অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক যে কাঠামো আছে, তার মধ্যে দিয়েই যাওয়া উচিত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, পুশইনকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, বৈধ প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক। বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা।
সাবেক এক সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, ভারত যদি কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর আশ্রয় নেয়া। এই ইস্যুতে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক সংস্থার শরণাপন্ন হতে পারে বাংলাদেশ। তবে সমাধান কূটনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত।
‘পুশইন’ ইস্যুতে আলোচনায় অনাগ্রহী ভারত
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকে ‘পুশইন’ ইস্যুতে আলোচনা করতে চায় না ভারত। ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনা শুরুর প্রেক্ষাপটে এমন তথ্য দিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া।
পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ দিনব্যাপী এই বৈঠকে নয়াদিল্লির এজেন্ডায় ‘পুশইন’র বিষয়টি উল্লেখ নেই। যদিও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ৭ জুন রোববার জানিয়েছিলেন, মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে পুশইন ও সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া আরও জানাচ্ছে, এক বিবৃতিতে বিএসএফ দাবি করেছে, দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। চার দিনব্যাপী ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। সম্মেলন চলবে ১১ জুন পর্যন্ত।
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪৬৩ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মাঝে কয়েকশ’ রোহিঙ্গাও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
কী আছে আইনে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক দাবি করলেই তাকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। এর জন্য নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, তথ্যবিনিময় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্মতিপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া পুশইন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি। এমন পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।
যাচাই ছাড়া গ্রহণ নয়
বিজিবি সদর দপ্তরের উপমহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, কেউ বাংলাদেশি হলে তাকে গ্রহণে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রথমে প্রমাণ দিতে হবে। শুধু সীমান্তে এনে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ তা গ্রহণ করবে না।
তিনি বলেন, অনবরত পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা পুশইনের ঘটনায় আমরা বাধা দিয়েছি, ঘটতে দিইনি। অবশ্যই এটা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার আইনের ব্যত্যয়, দেশীয় আইনেরও ব্যত্যয়। কোনো ফরম্যাটেই এটা বৈধতার সুযোগ নেই।
এক দেশের গরুও যদি আরেক দেশে পাঠায়, সেক্ষেত্রেও ব্যবসায়িক চুক্তি প্রসিডিউর থাকে। এক্ষেত্রে মানুষকে কীভাবে রাতের অন্ধকারে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ? জেনে-শুনে বুঝেই করা হচ্ছে, যেটা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীর বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সীমান্ত, সেটা নিশ্চিদ্র না। এখানে অনেক জায়গায় খোলা। সেখানে পুশইনের চেষ্টা হচ্ছে। ভারত আরও স্ট্রং তারকাঁটা দেবে, চেষ্টাও করছে। পুশইন পুরনো। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কারণে উভয় দেশের মানুষ বর্ডারটা ক্রস করে। এখানে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর একে অপরের সহযোগিতা করা, দুই দিক থেকেই কীভাবে সীমান্ত নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণ করবে এটার একটা নিজস্ব প্রক্রিয়া ও সমন্বয় থাকা উচিত। বিপরীতে আমরা দেখছি একতরফাভাবে ভারতের দিক থেকে হচ্ছে। আবার তারাই ক্লেইম করছে।
তিনি বলেন, বিজিবি-বিএসএফকে আইন মেনেই গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসতে হবে। সম্ভব না হলে আরেকটু উচ্চপর্যায়ে যেতে হবে, সেটা কূটনৈতিক পর্যায়ে। স্বরাষ্ট্র টু স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র টু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দূতাবাসকে এখানে শক্ত পদক্ষেপ আশা করেন তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তার দলের যে বাংলাদেশবিরোধিতা, সেখান থেকে তারা বের হতে পারেননি। সেটাকে উপজীব্য করেই তারা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করতে চাইছেন। কিন্তু এই যে তারা তথাকথিত অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি খুঁজে বের করেছেন, তাতে বাংলাদেশি থাকতেও পারেন, সেটা তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অনেক পদ্ধতি আছে। ভারত সেটা করতে পারত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, সত্যিকার অর্থে কোনো বাংলাদেশি আমাদের সীমান্ত অতিক্রম করে থাকলে তাদের ফেরত নেব। কিন্তু সেটা প্রমাণসাপেক্ষে হতে হবে। কিন্তু সীমান্তে পুশইন তো কারো জন্যই সুখকর হবে না।
সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধে সমঝোতা মানেনি ভারত
আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৪ সালে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধে ২ দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। কিন্তু এ সমঝোতা নিয়মিত উপেক্ষা করেছে ভারত। মূলত সীমান্ত হত্যা বন্ধে শেখ হাসিনার নতজানু নীতির কারণে ভারত এটি করতে সাহস পায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় এসেছে ভারতকে এ সমঝোতা বাস্তবায়ন করার।
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত পৃথিবীর একমাত্র সীমান্ত, যেখানে মানুষকে গুলি করে মারা হয়। এটাকে ভারত বারবার জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছে দিল্লি। অপরাধ হয়েছে বলে ইত্যাদি ইত্যাদি অপরাধ হলে কোর্টে সোপর্দ হবে। কোর্ট তাকে শাস্তি দেবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৫ বছরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। হাসিনা সরকার বাংলাদেশ কখনোই এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেনি। বরাবরই শেখ হাসিনার সরকার নতজানু নীতি অনুসরণ করে চলেছে। ফেলানীকে গুলি করে হত্যার পর তার লাশ কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ঝুলিয়ে রাখে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসারে কোনো দেশ অন্য দেশের নাগরিককে সীমান্তে হত্যা করতে পারে না। কেউ যদি অন্যায় করে, তাহলে তাকে গ্রেফতার করে সে দেশের আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটিই বিএসএফ মানছে না। বরং বিএসএফ প্রতি মাসেই গুলি করে বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। কখনো বাংলাদেশের সীমান্তে প্রবেশ করে তাদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থার উল্লেখ থাকলেও কোনো পদক্ষেপই নেয় না ভারত। শুধু তাই না, ভারত স্থাপনা নির্মাণের আইনটিও মানছে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু ভারতের চাপে নতজানু হয়ে ৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধাবস্থা ছাড়া বন্ধুভাবাপন্ন দুই দেশের সীমান্তে এরকম প্রাণহানি অস্বাভাবিক, অমানবিক। বিভিন্ন সময় ভারতীয় শীর্ষপর্যায় থেকে বলা হয়েছে, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার নীতিতে কাজ করা হবে। সীমান্ত হত্যা রোধে বিএসএফের হাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেয়া হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত এসবের কোনোটিরও কেয়ার করে না। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান সৌদি-ইয়েমেন বা এ জাতীয় কোনো দেশের সীমান্তেই এত মানুষকে মেরে ফেলার ঘটনা নেই। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এসকল নিরীহ সীমান্তবাসী বাংলাদেশিদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারতের ন্যূনতম দুঃখবোধও নেই। আর সবচেয়ে হতাশাজনক হচ্ছে ভারত কবে আবার নতুন করে পুশইন খেলা শুরু করেছে। তাই সময় এসেছে এত বছরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কড়া জবাব দেয়ার।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি যে খুবই উদ্বেগজনক, তা ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠনের বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’-এর প্রধান কীরিটি রায়ের বক্তব্য হলো, ‘আগে বিএসএফ বলত, আমাদের ওপর আক্রমণ করতে এলে আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছি। লাশ ফেরত দিত। এখন আর তাও বলে না। গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।