দুর্ঘটনা : হরিষে বিষাদ
৪ জুন ২০২৬ ১১:১৬
সোনার বাংলা ডেস্ক : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোটি মানুষ কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরেন। আবার ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসেন। তাদের আনন্দের এই যাত্রাটি কারো কারো জীবনে হয়ে ওঠে বিষাদের। গত ২৮ মে সারা দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে অনেকের বিষাদের স্মৃতি করেছে সড়ক ও ট্রেন দুর্ঘটনা।
স্ত্রী-সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে বাড়িফেরা
নরসিংদী সংবাদদাতা : স্ত্রীর লাশ কাঁধে আর সন্তানের লাশ বুকে আর হাত জড়িয়ে ধরে যুবকের হাঁটার দৃশ্য কাঁদিয়েছে দেশবাসীকে। ঘটনাটি ঘটেছে ঈদের দিনের ঠিক আগের রাতে নরসিংদীতে। ট্রেনের ধাক্কা এমন পরিণতি ডেকে এনেছে কৃষক যুবকের জীবনে। মর্মান্তিক এই দৃশ্যটি সড়ক ও রেলপথে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নরসিংদীতে ঈদের কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় দুই বছর বয়সী ছেলেসহ এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয় গত ২৭ মে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে। নরসিংদী রেলস্টেশনের ২নং রেললাইনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় নিহত নারীর স্বামী ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়েও সঙ্গে ছিলেন।
নিহতরা হলেনÑ নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের কারারচর গ্রামের সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং তাদের ছেলে হাছেন মিয়া (২)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত ২৭ মে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঈদ উপলক্ষে নরসিংদী শহর থেকে কেনাকাটা শেষে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন দিনমজুর সুজন মিয়া। এ সময় নরসিংদী রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে রেললাইন পারাপারের সময় আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মা-ছেলে ছিটকে পড়েন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে স্বামী সুজন মিয়া দ্রুত তাদের উদ্ধার করে নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মা-ছেলের মৃত্যু হয়।
স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুজন মিয়া বলেন, ‘ট্রেন আসার সময় আমরা বুঝতে পারিনি। ট্রেনটি কাছে আসতেই আমি চিৎকার করে উঠি। আমার স্ত্রী বাচ্চাদের নিয়ে দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। পরিবার বলতে ছিল স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে। এখন আমার এক মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। যখন আমার স্ত্রী ও সন্তানের লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু বহন করছি। হায় আল্লাহ, আমার কী সর্বনাশ হলো! যেখানে শপিং ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা, সেখানে ফিরতে হলো প্রিয়জনদের লাশ নিয়ে।’
বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের প্রাণহানি
বগুড়া সংবাদদাতা : বগুড়ায় চার দিনের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। স্বজনহারা পরিবারগুলোয় ঈদের আনন্দের পরিবর্তে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। ঈদের দিন গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে শেরপুর-ধুনট আঞ্চলিক সড়কের শুভগাছা (শাফলজানি) এলাকায় বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুই বন্ধু নিহত ও আহত হয় অন্তত চারজন। নিহতরা পৌর শহরের উলিপুর এলাকার হারুন অর রশিদের ছেলে আবু রায়হান (২০) ও শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকার তামিম (২০)।
এছাড়া ঈদের দ্বিতীয় দিন গত ২৯ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় কাহালু উপজেলার বীরকেদার ইউনিয়নের বারোমাইল এলাকায় দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়। নিহতরা নওগাঁ জেলার খাস নওগাঁর আবুল কালাম আজাদের ছেলে মো. রাহিম (২১), চকদেব নুনিয়াপট্টি এলাকার ইউসুফের ছেলে অপূর্ব (১৮), একই এলাকার সুরুজের ছেলে ছেলে প্রেম (২০)। ঈদের তৃতীয় দিন গত ৩০ মে শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লালদহ এলাকায় আলুবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় পিষ্ট হয় মোটরসাইকেল আরোহী। নিহত আশরাফ আলী (৫৬) বগুড়া শহরের মালতিনগর এলাকার আজিজার রহমানের ছেলে। তিনি কুড়াহার দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন।
এর আগে ঈদের আগের দিন ২৭ মে বুধবার সকালে বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে পার্কিং রাখা বালুভর্তি ট্রাকের পেছনে বেপরোয়া গতির আরেকটি ট্রাকের ধাক্কায় হেলপার নিহত হয়। নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার ফোকপাল রাস্তার মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ইনজামাম আলী (২২) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খড়াশনী গ্রামের ইজ্জত আলীর ছেলে। গত ২৭ মে বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের কাহালু উপজেলার নারহট্ট ইউনিয়নের ভ্যাপড়া এলাকায় নিউ হোপ ফিড মিলের সামনে দুর্ঘটনায় ফিড মিল শ্রমিক মো. রবিউল আউয়াল জিয়া (৪২) নিহত হন। তিনি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার তরতবাড়ী গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।
এছাড়া আরও অনেক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। অসংখ্য পরিবার ঈদের আনন্দের পরিবর্তে শোকে পার করেছে ঈদের সময়। কেউবা হয়েছেন নিঃস্ব আর কেউবা হয়েছেন পঙ্গু। আর্থিক চাপসহ কষ্টের বোঝা জীবনভর বয়ে বেড়াতে হবে তাদের।
টাঙ্গাইলে ট্রাক দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু
গত ২৫ মে ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং আরও ১০ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। নিহতরা সবাই একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন ঈদ করার জন্য। তারা পেশায় ফেরি ব্যবসা করতেন। স্বজনদের সাথে ঈদ করা হয়নি, বরং বিষাদে কাটছে স্বজনদের সময়। এ দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
গত ২৫ মে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্ব সংযোগ সড়কের সরাতৈল এলাকায় রডবোঝাই ট্রাক উল্টে মর্মান্তিকভাবে ১৫ জন নিহত এবং আরও ১০ জন গুরুতরভাবে আহত হওয়ায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার-পরিজন ও আহতদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছি এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সকল পরিবহন মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইলের দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে নওগাঁর ১০ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুজন এবং রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও নাটোরের একজন করে রয়েছেন।