এবারো চামড়া বাজারে ধস


৪ জুন ২০২৬ ১০:২২

উদ্যোগের অভাবে বিপুল সম্ভাবনার বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
পরিবেশ সচেতনতায় বিশ্বব্যাপী বাড়ছে পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্পের ব্যাপক উত্থান। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি ভূল ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সহায়তা এবং উদাসীনতার কারণে সম্ভাবনাময় হাজার কোটি টাকার চামড়াশিল্পটি ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিশৃঙ্খল নীতিমালায় বিশাল সম্ভাবনার এ সেক্টর এখন গভীর খাদে। সিইটিপিসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজি সনদ পেতে উদ্যেগের অভাবে বিপুল সম্ভাবনার বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের শুরুতেই চামড়া খাতের বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বিত রপ্তানি নীতিপ্রণয়ন করেননি।
এবারো চামড়া বাজারে ধস
কুরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো দাম নির্ধারণ করেছিল সরকার। সরকারি ঘোষণা, নজরদারি ও নানা উদ্যোগের পরও এবারও ঈদুল আজহার কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজারে প্রত্যাশিত দাম মেলেনি। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে বাস্তবে বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর মগবাজার, মুগদা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, শেওড়াপাড়া ও লালবাগের পোস্তা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার ঘোষিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের মাংস ব্যবসায়ী মো. আসিফ উদ্দিন বলেন, ‘একসময়ে এক-দেড় হাজার টাকায় গরুর চামড়ার পিস বিক্রি হলেও চার-পাঁচ বছর থেকে দামই নেই। ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি বিক্রি হয় না। কুরবানির চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়। নতুন সরকার এসেছে ক্ষমতায়। আশা করি এবার যেন কিছু হয়।’
পোস্তার চামড়া ব্যবসায়ী মো. তৈমুর খান বলেন, রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পর এবারও ঈদে চামড়ার দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ সাভারে ট্যানারিপল্লী স্থানান্তর হলেও সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। ফলে চামড়ার দাম নেই। প্রতিবারই কুরবানি এলে কিছু হইচই হয়, আবার পরে সবাই ভুলে যায়। ফলে কোনো অগ্রগতি নেই।
এদিকে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান জানান, সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তা মূলত লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু বাস্তবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার লবণের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেড়েছে। একটি চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেওয়া, বহন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। আবার অনেক চামড়া কাটা-ছেঁড়া বা ত্রুটিপূর্ণ থাকে, যেগুলো ট্যানারি মালিকরা নিতে চান না।
মঞ্জুরুল হাসান বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া অর্থ আটকে থাকায় মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে তারা চামড়া কিনতেও পারছেন না। তার দাবি, বর্তমানে খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধ এবং শিল্পের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
চামড়া খাতের সংকট উত্তরণে নেই সঠিক পরিকল্পনা
চামড়া সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপুল সম্ভাবনার এ সেক্টরটিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হতে ভারতকে সুবিধা দিতে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। সেক্টর উন্নয়নে নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আশার কথা হচ্ছে বর্তমান সরকার চামড়া খাতের সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বহু বছর চেষ্টার পর সিইটিপি নির্মাণ করা হলেও তা নিয়ে সমস্যা কাটছে না। বিগত দুই সরকারের সময়ে চামড়া খাতের সংকট কাটাতে সঠিক পরিকল্পনা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। আর এজন্য চামড়া খাতের সংকট কমার পরিবর্তে দীর্ঘায়িত হয়েছে। আর ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও দেশে-বিদেশে চামড়া ও চামড়া খাতের বাজার বাড়ছে না।
ট্যানারি মালিকরা জানান, সিইটিপির জরুরি সংস্কার ও পূর্ণসক্ষমতায় পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বণ্ড সুবিধা বা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সহজ অর্থায়ন করতে হবে। এতে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে দেশের চামড়ার প্রবেশ সহজ হবে, রপ্তানি মূল্য বাড়বে। ফলে চামড়া ও চামড়া খাতের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হবে।
ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া
শুধুমাত্র উদ্যোগের অভাবে বিপুল সম্ভাবনায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে বাংলাদেশের। আর চীন চামড়া কিনলেও অর্ধেক দামে দিয়ে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা হয়েছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। চামড়া খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহিন আহমেদ বলেন, সিইপি পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে। এর কারণে এলডব্লিওজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে চামড়া খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। বিগত দিনে সময়োপোযোগী পরিকল্পনা করা হয়নি।
ঢাকার পোস্তার চামড়া ব্যবসায়ী হোসাইন মোক্তার জানান, সিইটিপি কার্যকর না থাকায় শুধু চীনের কাছে বাজার চলে গেছে। চামড়ার সঠিক তারা দাম দিচ্ছে না। অর্ধেক দামে কিনছে। এ জন্য আগের মতো রপ্তানি বাড়ছে না।
এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পেতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের সব কারখানা এখনো এ সনদ পায়নি। তিনি বলেন, যদি শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর হতো, তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক হতে পারত। তিনি বলেন, একসময় ইতালি, স্পেন ও জাপানের বড় ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স ঘাটতির কারণে সেই বাজার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) উন্নয়ন এবং বড় ট্যানারিগুলোয় পৃথক ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্তমানে সিইটিপির সক্ষমতা ১৫ থেকে ১৬ হাজার কিউবিক মিটার হলেও কুরবানির সময় বর্জ্যের পরিমাণ ৪০ হাজার কিউবিক মিটার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ কারণে সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
তিনি বলেন, শুধু সিইটিপির ওপর নির্ভর করলে আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিটি ট্যানারিতে প্রাথমিকভাবে বর্জ্য পরিশোধন, ক্রোম আলাদা করা ও স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এরপর অপেক্ষাকৃত ভালো মানের তরল বর্জ্য সিইটিপিতে এলে সেটি সহজে পরিশোধন করা সম্ভব হবে এবং এলডব্লিউজি সনদ পেতে সুবিধা হবে।
বর্তমানে শিল্পনগরীতে দুটি ট্যানারিতে পৃথক ইটিপি চালু রয়েছে বলে জানান তিনি। এগুলো হলো সদর ট্যানারি ও বেসমিনা। আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি আবেদন যাচাই চলছে।
মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রক
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর ভূঁইয়া বলেন, প্রতি বছর একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর সমাধান আসছে না। তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় নির্ধারিত দামে বেচাকেনা হয় না। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন গরিব ও এতিমখানাগুলো। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার, অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চামড়ার দাম না বাড়লেও আকাশচুম্বী জুতা-স্যান্ডেলের দাম
বিগত কয়েক বছর থেকেই দেশে গরুর কাঁচা চামড়ার পিস আশঙ্কাজনক কম। মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গরু দামড়া। এক পিস চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পর ২০ বর্গফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়। তা দিয়ে অন্তত পাঁচ জোড়া জুতা তৈরি হয়। কিন্তু নামিদামি জুতা প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এক জোড়া জুতা বিক্রি করছে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায়। তাদের স্যান্ডেলও বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত জুনে কুরবানিদাতাদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় গরুর চামড়া কেনা হয়েছে। একটি গরুর চামড়ায় সাধারণত লবণ লাগে ১০ থেকে ১১ কেজির মতো। এভাবে এক পিস চামড়া সংগ্রহ করার পর লবণ দেওয়া থেকে শুরু করে ট্যানারিতে ফিনিশড প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আসতে খরচ হয় ২ হাজার ৬৫০ টাকা। সব ধাপ শেষ করতে প্রতি বর্গফুট চামড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে খরচ পড়ে ১৩২ টাকা।
চামড়ার আকার বড় বা দাম বেশি হলে প্রতি বর্গফুটে খরচ সর্বোচ্চ ১৪৭ টাকা হতে পারে। মো. কামাল পাশাসহ অন্য চামড়া রপ্তানিকারকরা জানান, বে, বাটা, এপেক্সসহ অনেক ব্রান্ডগুলো ভালো কোয়ালিটি নিশ্চিত করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বর্গফুট চামড়া কেনে। সেই চামড়ার জুতা রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকার শোরুমে দেখা যায় ২ হাজার ২৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেল্ট বিক্রি হচ্ছে ৯৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৪৯৯ টাকায়। তবে রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়ে অরিজিনাল চামড়া দিয়ে জুতা-স্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে। তাদের কোয়ালিটিও খারাপ না। অথচ নামি দামি ব্র্যান্ডগুলোর তুলনায় সেগুলোর দাম অনেক কম।
ট্যানারি মোড়ের সামারি লেদারের স্বত্বাধিকারী মো. ইফতেখার বলেন, ‘নামিদামি কোম্পানির মতো আমরাও জুতা তৈরি করি। তা ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্যান্ডেলও দেড় থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করি। সাধারণ জুতা, স্যান্ডেল ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। অন্য উদ্যোক্তারাও বলেন, কম দামে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট বিক্রি করি আমরা। সরকার কিছু ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে আরও কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে ভ্যালু অ্যাডিশনে পিছিয়ে থাকা। এখনো রপ্তানির বড় অংশ নির্ভর করছে ওয়েট ব্লু বা স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ওপর। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল মুনাফা আসে ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ ও ফ্যাশন পণ্য থেকে। অথচ দেশে জুতার বিপুল দাম নেয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা নিতে হবে। চামড়াশিল্পকে শুধু কাঁচামালভিত্তিক শিল্প হিসেবে দেখলে হবে না। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও মানসম্পন্ন ফিনিশড পণ্যে যেতে হবে। নইলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাদের মতে, কাঁচামাল ও শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও সমন্বিত নীতি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না হওয়ায় সম্ভাবনার বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
চামড়াশিল্পকে শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী করার ঘোষণা
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, কুরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়াশিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। জুলাই মাসের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, কুরবানির সব চামড়া একসাথে ঢাকায় আসে না, স্বাভাবিকভাবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। তবে এবার সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিসিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। এবারের কুরবানির অধিকাংশ চামড়া ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, চামড়ার গুণগতমান উন্নয়নে জবাই ও স্কিনিং প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা হবে। পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে হয়। সঠিকভাবে স্কিনিং করা না হলে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়। আমরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক ও মেকানাইজড করার পরিকল্পনা করছি।বর্তমানে দেশে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ও রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও চামড়াজাত পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে।
চামড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের চামড়া নিচ্ছে চীন, ইতালি, ভারত আবার এরপর বাংলাদেশের কাছেই উচ্চমূল্যে জুতা রফতানি করছে। বাংলাদেশের চামড়া দিয়ে জুতা তৈরি করে চোরাই পথে আসা সেই ভারতীয় জুতা আবার বাংলাদেশের জুতার বাজার নষ্ট করে দিচ্ছে। ভারতীয় জুতায় বাজার ছেয়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক কারখানা। জুতা উদ্যোক্তারা জানান, পাদুকা কারখানাগুলো বছরে স্থানীয় বাজারে ২৫ কোটি জোড়া জুতা সরবরাহ করে, কিন্তু অবৈধ পথে আসা ভারতীয় জুতা দেশের পাইকারি মার্কেটগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব জুতা আমদানি হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। বাজারে ভারতীয় ও চায়না জুতার দখলের কারণে বাংলাদেশের জুতাশিল্পও আজ হুমকির সম্মুখীন। রফতানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজারও হতে পারে কর্মসংস্থান, অর্থনীতি আর বাণিজ্যের বিরাট ক্ষেত্র।