সহজে সনাক্ত করা যায় না

কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করাও কষ্টকর


৪ জুন ২০২৬ ১০:১৯

॥ হামিম উল কবির ॥
হার্টের মাংসপেশির কোনো সমস্যা হলে হার্ট বা হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে যায়, বিশেষ করে বাম দিকেরটা। আরো সহজ করে বললে, এভাবে বলা যায় যে এরকম হলে হৃৎপিণ্ড ফুলে যায়। হৃৎপিণ্ডের দেয়াল পাতলা হয়ে যায়। ফলে হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যায় এবং এটা হয় খুবই মারাত্মকভাবে। রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরে নানা ধরনের অসুখ হতে থাকে। এ ধরনের ব্যক্তির পায়ে পানি আসে এবং অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়। শরীরের এ অবস্থাকে কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি বলে থাকেন চিকিৎসকরা। এটি একটি বংশগত রোগ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে দিনে ৫৬২ জন মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। এর মধ্যে এই রোগটিও রয়েছে। কেউ কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথিতে ভুগতে থাকলে রোগটি শনাক্ত হতে দেরি হয়। কারণ রোগী প্রথমে বুঝতেই পারেন না। চিকিৎসা না হলে ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড কর্মক্ষম নাও থাকতে পারে অথবা খুবই দুর্বল অবস্থায় থাকতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এমন হলে রোগটি শুরুর দিকে রোগীর অতিমাত্রায় দুর্বলতা, স্বাভাবিক কাজকর্মে তার শ্বাসকষ্ট হতে পারে, পায়ের পাতায় পানি আসার সাথে গোড়ালিতেও পানি আসতে পারে। বুক ব্যথা ও বুক ধরফড় করতে পারে। দুর্বল হৃৎপিণ্ডের মানুষ হলে হার্ট ফেইলিউর বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে। পরিবারের কারো এই রোগটি হলে বাকিদেরও এমন হতে পারে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে, পরিবারের কারো মধ্যে এই লক্ষণগুলো শনাক্ত হলে বাকিদেরও পরীক্ষা করিয়ে নেয়া উচিত। সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হলে হৃৎপিণ্ড আরো বড় হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের এই অবস্থা হলে উন্নত বিশ্বে; বিশেষ করে ব্রিটেন ও আমেরিকায় হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসায় যতদিন ভালো থাকা যায়, সেই চেষ্টাটা করে যেতে থাকেন চিকিৎসকরা। কারণ বাংলাদেশে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের সুবিধা নেই।
কেন হয়ে থাকে এমন অবস্থা
কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি হলে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশিতে আয়রন বা লৌহ জমা হতে থাকে। উচ্চরক্তচাপযুক্ত রোগী, যাদের স্থূলতা বেশি, হৃৎপিণ্ডের ভাল্ব ঠিকমতো বন্ধ না হওয়াকে দায়ী করে থাকেন চিকিৎসকরা। এর বাইরে চিকিৎসকরা বলে থাকেন, যারা অতিমাত্রায় ও নিয়মিত মদ্যপান করে থাকেন, সিসা, কোবাল্ট ও পারদ জাতীয় টক্সিক পদার্থের সংস্পর্শে যারা থাকেন তাদের কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি হতে পারে। এছাড়া ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও এই রোগটি হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের নিচের দিকের দুটি বড় ও পেশিবহুল প্রকোষ্ঠ হলো ভেন্ট্রিকল বা নিলয়। প্রকোষ্ঠ থেকে রক্ত গ্রহণ করে এবং তা ফুসফুস ও সারা শরীরে পাম্প করে দেয়। সেই ভেন্ট্রিকল বড় হয়ে যাওয়ায় ভাল্ব বন্ধ হয়ে গেলে ভাল্বের অ্যালাইনমেন্ট বদলে যায়। হার্টের প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে গেলে কপাটিকা বা ভাল্বের স্বাভাবিক অবস্থান ও কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এই কপাটিকা রক্তকে একমুখী চলাচলে বা প্রবাহে সাহায্য করে। ভাল্বগুলো একটি শক্ত বৃত্তাকার ভিত্তির ওপর নিখুঁতভাবে যুক্ত থাকে (যাকে অ্যালাইন বলে)। ফলে রক্তপ্রবাহের কিছু অংশ আগের জায়গায় ফিরে যায় (ব্যাক ফ্লো করে) ও হৃৎপিণ্ডকে আরো বড় করে দেয়। হৃৎপিণ্ড বড় হতে হতে একসময় সে রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে। হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে গেলে পাম্প করার গতি হারিয়ে ফেলে এবং এর ফলে হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে যায়।
মায়োপ্যাথি হলে কী কী ঘটতে পারে
কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগটি জেনেটিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি রোগ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। জেনেটিক মিউটেশন (পরিবর্তন বা রূপান্তর) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি কোড পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানদের মধ্যে চলে যায়। যাদের এই অবস্থা হয়ে থাকে তারা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চরক্তচাপ ভুগতে থাকেন, হৃৎপিণ্ডে নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে (হৃদরোগ), হৃদঘাত বা হার্টবিটের পরিমাণ বাড়ে, হৃৎপিণ্ডের কপাটিকা বা ভাল্বে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। আর যাদের কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি হয় তারা স্বভাবতই স্থূল বা মোটা-মেদবহুল হয়ে থাাকেন। কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথির রোগীদের হার্টের রক্ত পাম্পিং খুবই দুর্বল গতির। রক্তনালির মাধ্যমে (মহাধমনী, ধমনী) রক্ত সারা শরীরে পৌঁছে বা এরপর শরীর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ও বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে ফুসফুসে ফিরিয়ে আনে যে রক্তনালি (শিরা) দিয়ে তাতে গতি থাকে না। ফলে রক্তনালিতে প্লেক বা চর্বি জমে রক্তনালির যে কোনো স্থানে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে। এটা থেকে রোগীর স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। আবার অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (অ্যারিথমিয়া) হলে কখনো কখনো কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হার্ট বড় হয়ে গেলে হার্র্টের ভাল্বের নানা সমস্যা হতে পারে।
কার্ডিওমায়োপ্যাথি থেকে সুস্থ হওয়ার উপায়
চিকিৎসকরা কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথির চিকিৎসায় রোগ বুঝে রোগের অগ্রগতির প্রক্রিয়াগুলো ধীর করে দিতে পারে উপযুক্ত ওষুধ প্রয়োগ করে। একই সাথে জটিলতা কমিয়ে দিতে পারেন। তবে এটা নির্ভর করে রোগের তীব্রতার ওপর। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওরজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক ওসমানী বলেন, একজন চিকিৎসক রোগের লক্ষণগুলো বুঝে এবং ধীরে-সুস্থে চিন্তা করে কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথির অগ্রগতিটাকে ধীর করে দিতে পারেন। এতে রোগী অনেকটা বেটার ফিল করবেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যেতে পারবেন। তিনি হার্টের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম করতে, অ্যালকোহল অথবা তামাক সেবন না করার জন্য রোগীদের উদ্বুদ্ধ করে রোগীকে সহায়তা করতে পারেন। ‘এগুলো অনুসরণ করলে রোগীর জীবনযাপন সহজ হবে এবং হার্টের জটিলতা বেশি বাড়বে না এগুলো অনুসরণ করলে,’ রোগীকে বোঝাতে পারেন এবং কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি চিকিৎসায় এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, চিকিৎসক রোগীর জীবনধারা পরিবর্তন করতে পারলেন। এছাড়া ওষুধ দিয়ে রক্তের প্রবাহ উন্নত করতে চিকিৎসক উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ লিখে দিতে পারেন। যেমন তিনি অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ ওষুধ, রক্ত পাতলা করার ওষুধ এবং অ্যান্টিএরিথমিকসের ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন। কার্ডিওলজিস্ট রোগীকে পেসমেকার বা ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটরের মতো ডিভাইস ব্যবহার করতে রোগীকে পরামর্শ দিতে পারেন। এই ডিভাইসগুলো রোগীর হৃৎপিণ্ডের রিদম বা ছন্দ স্বাভাবিক করতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সেপ্টাল মায়োকটমি বা অ্যালকোহল সেপ্টাল অ্যাবলেশনের মতো পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করতে পারেন। শেষ পর্যায়ে হার্ট ফেইলিউরের ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য চিকিৎসা ব্যর্থ হলে সামর্থ্য থাকলে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দিয়ে থাকে। তবে এটা খুবই রেয়ার একটি চিকিৎসা। হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন কেবল ব্রিটেন ও আমেরিকায় হয়ে থাকে। তাও এটা ডোনারের ওপর নির্ভর করে। মৃত মানুষের হার্ট পেলে সেটা করা যায়। ব্রিটেনের হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডাক্তার স্টিফেন প্যাটিট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার হাসপাতালে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের জন্য বিশাল লাইন (কিউ) রয়েছে। হার্ট পাওয়া যাচ্ছে না বলে ট্রান্সপ্লান্ট করা যাচ্ছে না।
হৃৎপিণ্ডজনিত সমস্যায় কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
ওপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলো আপনি যদি বুঝতে পারেন, আপনার হার্টে কোনো সমস্যা হচ্ছে সেটা যদি আপনি অনুভব করেন, তাহলে কোনো বিলম্ব না করে কার্ডিওলজিস্টের কাছে যেতে পারেন। বাংলাদেশে যেহেতু রেফারাল পদ্ধতি নেই, সেই কারণে যেকোনো রোগী যেকোনো সময় বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্টের কাছে পৌঁছাতে পারেন। জিপি বা জেনালের প্র্যাকটিশনারের কাছে গিয়ে এ অবস্থায় সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ডা. মো. ফারুক ওসমানী। এছাড়া আপনার যদি শ্বাসকষ্ট হয়, অজ্ঞান হয়ে যান, বুকে ব্যথা অনুভব করেন অথবা হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিকতা, অনুভব করেন তাহলে চিকিৎসকের কাছে দ্রুত যান সময় নষ্ট না করে। হার্টের রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তাহলে কোনো উপসর্গ ছাড়াই কার্ডিওলজিস্টের কাছে বিষয়টি বলুন। তাহলে তিনি কিছু পরীক্ষা করে দেখবেন আপনার হার্টে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না অথবা আপনি কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথিতে ভুগছেন কি না। যারা কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথিতে ভুগছেন, তাদের হার্টের স্বাস্থ্য দেখার জন্য নিয়মিত চেকআপে যেতে পারেন এবং যত দিন বাঁচবেন, ততদিন এটা করে যেতে থাকুন।
প্রতিরোধের উপায়
কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথির ঝুঁকি কমানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। যাদের সুনির্দিষ্টভাবে এই রোগটি রয়েছে বা যাদের হার্টের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের উচিত নিয়মিত করে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ সেবন করা। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার জন্য নিয়ম মেনে শারীরিক পরিশ্রম করা বা ব্যায়াম করা। তামাকজাত সব ধরনের দ্রব্য এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল পান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। ডায়াবেটিস বা স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে তা চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়ন্ত্রণ করা।