প্রকৃতিতে নীরবে পরিবর্তন : বাড়ছে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু
৪ জুন ২০২৬ ১০:১৭
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে চলতি তাপদাহে এখন পর্যন্ত ‘হিটস্ট্রোকে’ (মারাত্মক গরমজনিত অসুস্থতা) আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সরকারিভাবে এখনো চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ফোরাম। তারা বলছে, গত ২ মে থেকে সারা দেশের ওপর দিয়ে শক্তিশালী তাপপ্রবাহ প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, এই তাপপ্রবাহ জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে ৫ জুন থেকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঝড়-বৃষ্টির কারণে তাপদাহ কিছুটা কমলেও ভ্যাপসা গরম পড়তে পারে বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদরা।
সূত্রে প্রকাশ, প্রকৃতিতে নীরবে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস বলে পরিচিত এপ্রিল-মে মাসে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি এবং তাপমাত্রাও বেশ কম ছিল। অন্যদিকে ১ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর নাগাদ বর্ষাকাল গণ্য হলেও এবার জুন-জুলাইয়ে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি তাপমাত্রা থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটির পক্ষ থেকে মে মাসের প্রথম দিকেই জানানো হয়েছিল এবার বর্ষা মৌসুম জুন-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। সেই পূর্বাভাসই যেন সত্যি হতে চলেছে। জুনের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাসেও গত ১ জুন সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি মাসে দুই থেকে তিনটি ‘মৃদু’ থেকে ‘মাঝারি’ তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপপ্রবাহ চলাকালে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুন মাসে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বর্ষার আগমন ঘটলেও স্বাভাবিকের চেয়ে এবার বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাসের প্রথমার্ধেই সারা দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা বিস্তার লাভ করবে। এ মাসে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় হতে পারে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে ১ থেকে ২টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় অস্বস্তিকর গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।
এদিকে গত সোমবার দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের নিমিত্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির নিয়মিত সভায় মে মাসের আবহাওয়ার বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক অপেক্ষা কম বৃষ্টিপাত এবং বাকী বিভাগসমূহে স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, জুন মাসে দুই থেকে তিনটি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে চলমান তাপপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত আছে। এ মাসে দেশে বিছিন্নভাবে একাধিক তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
দেশের কোথাও তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে সেটিকে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে বলা হয় ‘মাঝারি’ এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’ বলা হয়। তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির ওপরে উঠলে সেটিকে ধরা হয় ‘অতি তীব্র তাপপ্রবাহ’। আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে এ মাসে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে বেশি থাকতে পারে। এ প্রতিবেদন লেখার দিন গত ৩ মে বুধবার তাপপ্রবাহ দেশের ৪১ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, যা আগের দিন ছিল ৪০ জেলায়।
দেশব্যাপী তীব্র রোদে কাজ করতে গিয়ে এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিভিন্ন স্থানে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ে বোরো ধান কাটার সময় তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ২ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগী ভর্তি হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি সতর্কবার্তা
হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচতে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চিকিৎসকরা কিছু বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছেন- ১. ছাতা ও জুতা ব্যবহার: রোদে বের হওয়ার সময় অবশ্যই ছাতা, টুপি এবং জুতা ব্যবহার করতে হবে। ২. পর্যাপ্ত পানিপান: তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার বিশুদ্ধ পানি বা স্যালাইনের পানি পান করতে হবে। ৩. দুপুরের রোদ পরিহার: খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি সূর্যের আলোতে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।