বাংলাদেশের বিদেশনীতি চীন ও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা দৃশ্যমান


৪ জুন ২০২৬ ০৯:৫৮

॥ জামশেদ মেহদী ॥
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে? এ নিয়ে সর্বশ্রেণির মানুষ; বিশেষ করে যাদের এলিট এবং শিক্ষিত বলা হয়, তাদের মধ্যে বিপুল কৌতূহল রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে। তবে সেটা মোটাদাগে। সাধারণ মানুষ এভাবে বোঝেন যে, অমুক সরকার কি আমেরিকাপন্থী? নাকি চীনপন্থী? নাকি ভারতপন্থী? শেখ হাসিনার সরকারকে ঐ রকম মোটাদাগে সহজেই চিহ্নিত করা যেত। একবাক্যে সকলেই বলতেন, হাসিনা ভারতপন্থী। শুধু ভারতপন্থী নন, তিনি ছিলেন ভারতের তস্য গোলাম। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন তো বলেই দিয়েছিলেন যে, বাংলা-ভারত সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। এখানে নরেন্দ্র মোদি পুরুষ এবং শেখ হাসিনা মহিলা। ড. মোমেন যে উদাহরণ দিয়েছিলেন, সেটি বেআক্কেলের মতো। আমরা তার মতো অত নিচে নামতে যাবো না।
পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সুস্পষ্ট কিছুই বলেননি। ড. খলিল তো এ ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তার পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর হবে, সবার আগে বাংলাদেশ। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি বলেননি। গত ৪-৫ দিন আগে শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকীতে তিনি বলেছেন যে, তার সরকার শহীদ জিয়ার আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। তিনি এই বাক্যে যা বলেছেন, তা যদি কার্যে পরিণত করেন, তাহলে আমরা পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট রূপরেখা আন্দাজ করতে পারি।
তার আগে একটি কথা বলা দরকার। যখন শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে বিরোধীদলে ছিলেন, তখন তিনি কোনো সময় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তিনি সবসময় পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে বলতেন বাংলাদেশ। বিরোধীদলে থাকার সময় তিনি একাধিক জনসভায় যে বক্তৃতা করেছেন, তার অনেকগুলোয় আমি নিজে হাজির ছিলাম। তিনি বলতেন, বাংলাদেশ হবে সুইজারল্যান্ডের মতো। এ কথা বলে তিনি বোঝাতেন যে, সুইজারল্যান্ডের মতো বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ এবং জোট বা ব্লক নিরপেক্ষ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনিই বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেন। ঐ সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হবে, সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। এটি ছিলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দ্বিতীয় উদ্বোধনী ভাষণ। তিনি বলেছিলেন, ‘With malice toward none, with charity for all; with firmness in the right, as God gives us to see the right’-এর প্রেক্ষাপট ছিলো মার্কিন গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে উত্তর (টহরড়হ) ও দক্ষিণ (ঈড়হভবফবৎধপু)-এর মধ্যে চার বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে দেশ গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতিতে লিংকন বিজয়োন্মত্ততা বা প্রতিশোধের ভাষা ব্যবহার না করে জাতীয় পুনর্মিলন, ক্ষত নিরাময় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কারো প্রতি বিদ্বেষ না রেখে সবার প্রতি সহমর্মিতা ও দয়া প্রদর্শন করা উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধানে শেখ মুজিব মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ঐ উক্তির আলোকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির কর্নার স্টোন তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবে কি হয়েছিলো? বাংলাদেশ না হয়েছিলো সুইজারল্যান্ড, না হয়েছিলো নিরপেক্ষ। সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ঐ রকম গালভরা বুলি আউড়িয়ে তিনিই ভারতের সাথে ২৫ বছরের গোলামি চুক্তিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনিই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
ভারত ঐ যে ৪১ দিনের জন্য বাঁধ খুলে দেয়, তার পর আর ঐ ৪১ দিন শেষ হয়নি। ৪১ দিন ৪১ বছরেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ বন্ধ হয়নি। তার কন্যা শেখ হাসিনা এসে আবার ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ৩০ বছরের জন্য ভারতের সাথে ফারাক্কা চুক্তি সম্পাদন করেন। এই চুক্তিতে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ কম পানি পায়। এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে ভারতের সাথে প্রথম ফারাক্কা চুক্তি সম্পাদিত হয়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই এবং সেচমন্ত্রী ছিলেন সুরজিৎ সিং বার্নালা।
শেখ মুজিব ভারতের কাছে ঐ যে ২৫ বছরের গোলামির শৃঙ্খলে বন্দী হলেন, তার পর আর সেই শৃঙ্খল তার জীবদ্দশায় ছিন্ন হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার মর্মান্তিক বিদায়ের পর পরবর্তী সরকার ভারতের নাগপাশ ছিন্ন করে। ঐ সরকারেরই উত্তরাধিকারী হলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চেয়েছিলেন। তবে সেটি চেয়েছিলেন সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। তাই ফারাক্কার ব্যাপারে ভারতের অনমনীয় মনোভাব দেখে ফারাক্কা ইস্যুকে তিনি জাতিসংঘে নিয়ে যান। অতঃপর জাতিসংঘের পরামর্শ মোতাবেক ভারতের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে যে চুক্তি হয়, সেই চুক্তিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক বেশি পানি পায়।
সেই চুক্তিতে ছিলো একটি গ্যারান্টি ক্লজ। তার অর্থ হলো, ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ যাই থাকুক না কেন, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি বাংলাদেশকে দিতেই হবে। শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে যে পানি চুক্তি করেন, সেখানে বাংলাদেশ ৭৭-এর চুক্তির চেয়ে শুধু কম পানিই পায়নি, সেখান থেকে শহীদ জিয়ার ঐ গ্যারান্টি ক্লজও তুলে দেওয়া হয়।
শহীদ জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মুসলিম উম্মাহর সাথে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলা। বস্তুত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন তথা ওআইসির তিনিও ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। এছাড়া সার্ক ছিলো তারই ব্রেইন চাইল্ড। কিন্তু ভারতের দাদাগিরির কারণে সার্কের অকাল মৃত্যু ঘটে।
আর শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি তিনি আমেরিকাকে রীতিমতো শত্রু বানিয়েছিলেন। তার সর্বশেষ চীন সফর এত বিরাটভাবে ব্যর্থ হয়েছিলো যে, রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য যে কয়দিন নির্ধারিত ছিলো তার এক দিন আগেই ভগ্ন মনোরথ হয়ে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার পর তার পত্নী বেগম খালেদা জিয়া ভারতের কাছে মাথানত করেননি। তার সময়েই পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের প্রভূত উন্নতি হয়। বেগম জিয়ার আমলে একবার ঘূর্ণিঝড় হয়। তার সাথে ছিলো জলোচ্ছ্বাস। এই জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের তৎকালীন বিমানবাহিনীর অনেকগুলো জঙ্গিবিমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বেগম জিয়া ঐ সব জঙ্গিবিমান মেরামত করার জন্য পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বেগম জিয়ার আমলেই পাকিস্তান থেকে ৪০টি এফটি-৬ জঙ্গিবিমান সংগ্রহ করা হয়েছিলো।
তারেক রহমান এহেন দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। তার কাছ থেকে দেশবাসী আশা করেন যে, তিনি তার মেয়াদকালে তার পিতা এবং মাতার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন।
তারেক রহমানের সরকারের বয়স মাত্র ৩ মাস ১৬ দিন। এই সাড়ে ৩ মাস একটি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভালো-মন্দ আলোচনা বা সমালোচনা করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে প্রাথমিক যেসব আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যে, শেখ হাসিনার গোলামির জিন্দানখানায় তিনি সম্ভবত প্রবেশ করবেন না। পাকিস্তান ভারতের চিরবৈরী। হাসিনার ১৫ বছরে ভয়ে কেউ পাকিস্তান যেতেন না। কারণ যদি কারো পাসপোর্টে পাকিস্তানি ভিসার সিল-ছাপ্পড় থাকতো, তাহলে তাকে আর ভারতীয় ভিসা দেওয়া হতো না।
ড. ইউনূসের আমলে ঐ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বাংলাদেশে একাধিকবার আসেন। আবার বাংলাদেশেরও সামরিক বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তারা ভারত সফর করেন। তারেক রহমানের এই সাড়ে ৩ মাস শাসন কালেও সেই আসা-যাওয়া অব্যাহত আছে। পাকিস্তান থেকে বিমানবাহিনীর জন্য চীন পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এফ-১৭ থান্ডার জঙ্গিবিমান বাংলাদেশে আমদানির আলাপ আলোচনা ড. ইউনূসের আমলে শুরু হয়েছিলো। এখনো সেই আলোচনা চলমান এবং এ সম্পর্কিত চুক্তি নাকি সম্পাদনের পথে। বলা হয়েছে যে, ২০টি এফ-১৭ থান্ডার জঙ্গিবমান বাংলাদেশ আমদানি করবে।
অবশ্য সামরিক বাহিনীর ৩ শাখার সমরাস্ত্র ক্রয় বা আমদানির খবর সাধারণত জনসমক্ষে আনা হয় না। গণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী কোনো সরকারের আমলেই সেটি করা হয় না। আরো খবর বেরিয়েছে যে, চীন থেকে ড. ইউনূসের আমলে ২০টি জে-১০সি জঙ্গিবিমান আমদানির আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিলো। সেই আলোচনাও এখন নাকি চলমান। চীন থেকে রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের আলাপ আলোচনাও নাকি চলমান।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, বিমানবাহিনীর একদল বৈমানিককে ঐ সব জঙ্গিবিমান চালনার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান পাঠানো হয়েছে। আরেকটি খবর অতীব তাৎপর্য পূর্ণ। ঐ খবরে বলা হয়েছিলো যে, পাকিস্তানে প্রশিক্ষণের জন্য একদল বেসমারিক আমলা অর্থাৎ বিসিএস অফিসারকে পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। পাঠানো ঐ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সালমা সিদ্দিকা মাহতাব, যিনি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব। ঐ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে মোট ১২ জন বিসিএস কর্মকর্তা মনোনীত হন, যার মধ্যে ১ জন অতিরিক্ত সচিব সালমা সিদ্দিকা মাহতাব ও ১১ জন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা।
প্রশিক্ষণটি ছিলো পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত Civil Services Academy-তে অনুষ্ঠিত Executive Development Program, যা ৪ মে থেকে ২১ মে ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের আমলে এসব বেসামরিক আমলাদের ট্রেনিং অনুষ্ঠিত হতো ভারতের মিসৌরিতে। ভারতের মিসৌরি থেকে পাকিস্তানের লাহোরে এই ট্রেনিং স্থানান্তর সবিশেষ তাৎপর্য বহন করে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
চীন এবং পাকিস্তান ছাড়াও মার্কিন সরকারও বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ায় আগ্রহী। আমেরিকার সাথে যে ট্রেড ডিল স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ঠিক ৩ দিন আগে অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই মর্মে জনরব রয়েছে যে, বিএনপিও চাচ্ছিলো যে, তাদের ক্ষমতা গ্রহনের পূর্বেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে এর দায়ভার বিএনপিকে গ্রহন করতে হবে না।
আমেরিকা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে মডার্নাইজ করতে আগ্রহী। তবে এ ব্যাপারে উল্লেখ করবার মতো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়নি।
ওপরের এই বিস্তারিত আলোচনার পর সম্ভবত এই ধারণা করা যেতে পারে যে, বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। অবশ্য একটি সরকার ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। আগামী পৌনে ৫ বছর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com