কোথায় শেখ হাসিনা?


৪ জুন ২০২৬ ০৯:৫৫

প্রকাশ্যে দেখা যায়নি দুই বছর

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের অবসান হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ওইদিন দুপুরে শেখ হাসিনাকে একটি সামরিক বিমানে উঠে দেশ ছেড়ে পালাতে দেখা গেছে। সেই দেখার পর ইতোমধ্যে এক বছর ১০ মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে কেউ আর প্রকাশ্যে দেখেননি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শেখ হাসিনা প্রতিবেশী একটি দেশে অবস্থান করছেন। ওই দেশে তিনি ছাড়াও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট অনেক নেতাই অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা ছাড়াও যুবলীগের শীর্ষনেতা, ছাত্রলীগের শীর্ষনেতারাও সেখানে রয়েছেন। প্রতিবেশী এই দেশটি ছাড়াও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সাবেক মন্ত্রীরা অন্য বেশ কয়েকটি দেশে রয়েছেন। তারা প্রায় প্রকাশ্যে আসছেন, কথা বলছেন। বিভিন্ন মার্কেটে কেনাকাটা করছেন। ছাত্রলীগের সভাপতিকে ভারতের রাস্তায় প্রকাশ্যে চলতে দেখা গেছে। শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুল মোমেন, হাছান মাহমুদসহ একাধিক মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। হাসিনাপুত্র জয় (সজীব ওয়াজেদ জয়) ক্ষমতা হারানোর পর বেশ কিছুদিন লাইভে এসে কথা বলেছেন। প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পোস্ট করেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। দলের সিনিয়র নেতা; এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও শেখ হাসিনাকে ৫ আগস্টের পর আর দেখা যায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয় যে, শেখ হাসিনা কোথায় আছেন? কীভাবে আছেন? আদৌ তিনি জীবিত রয়েছেন কিনা?
সমর্থকদের উচ্ছ্বাস
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সময় তার রাজনীতিতে ফেরা না ফেরার প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে ‘শিগগিরই’ দেশে ফিরবেন বলে শেখ হাসিনার যে বক্তব্য প্রকাশ হয়েছে, তাতে নতুন করে এই আলোচনা সামনে এসেছে। দলটির প্রথম সারির কেউ কথা না বললেও কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা বেশ সরব। আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতার জানাজায় অংশ নেওয়া সমর্থকরা নানা স্লোগন দেন, সেই স্লোগানের মধ্যেও শেখ হাসিনার ফেরার কথা বলছিলেন তারা। যদিও নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে এবং দলটির নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। একইসঙ্গে চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে শেখ হাসিনার। এছাড়া একাধিক দুর্নীতির মামলায়ও তার সাজা হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা অথবা নতুন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু আদৌ সম্ভব কিনা। বাস্তবতা হচ্ছে, হাসিনা ফেরার বিষয়ে দলটির নীতিনির্ধারক কেউ স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি। অন্যদিকে দলের ফেরিভায়েড ফেসবুক পেজেই এ বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
হাসিনা কী রাজনীতিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা আছে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পরপরই বিশ্লেষক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, হাসিনা পালিয়ে দল ও নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন। তিনি যখন এ কথা বলেছেন, তখনো তিনি ড. ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হননি। হাসিনাপূত্র জয় বিদেশে থেকে বলেছিলেন, নেতাকর্মীদের কী হবে, সেটা আমরা জানি না। তার এই মন্তব্যে দলটির সমর্থকরা ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন। ফলে তার ফেরা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এদিকে বেলজিয়ামভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত ক্ষীণ’ হয়ে পড়েছে। এই থিঙ্কট্যাঙ্ক আরও মনে করে, তিনি যতক্ষণ আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি না হবেন, ততক্ষণ দলটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসাও কঠিন হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর গ্রুপটি এ মন্তব্য করেছে। আইসিজির বাংলাদেশবিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট টমাস কিয়ান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার রায়কে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানানো হবে। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভকারীদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার জন্য তার দায় নিয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব কম।’ বিবৃতিতে জাতিসংঘের তদন্তের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশেই ওই দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত বিচারকাজে এ বিষয়ে আরও প্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে, যার মধ্যে দমন-পীড়ন নিয়ে শেখ হাসিনার আলোচনার রেকর্ডিং ও সাবেক পুলিশপ্রধানের সাক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হাসিনা কোথায় আছেন কেউ নিশ্চিত করছে না
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে আসেননি। কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে- শেখ হাসিনা আসলে কোথায় আছেন? এর বেশ কারণও রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, একটি দলের সভাপতিও তিনি। ফলে দলটির সমর্থক, নেতা-কর্মীরা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ থাকে। তেমনি তার ক্ষেত্রেও রয়েছে। দিল্লিতে মন্ত্রীরা বা সিনিয়র এমপিরা যে সংরক্ষিত এলাকায় থাকেন, হাসিনা সেখানেই আছেনÑ এমনটাই ধারণা দিয়ে রাখা হচ্ছে তার বিষয়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা ভারতের কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য জানা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে তার শাসনামলের, ওই সময় তিনি পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। শেখ হাসিনা ভারতে আছেন- ভারত সরকার কখনো তা অস্বীকার করেনি। আবার ভারত থেকে তিনি অন্য কোনো দেশে গিয়েছেন এখন পর্যন্ত এরকম কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। ভারতীয়সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘আপনারা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান নিয়ে জানেন… তাকে এখানে খুব স্বল্প সময়ের নোটিশে চলে আসতে হয়েছিল প্রধানত সুরক্ষার কারণে। তিনি এখনো সেভাবেই আছেন।’ এর আগে শেখ হাসিনার সংযুক্ত আরব আমিরাত বা মধ্যপ্রাচ্যের বা ইউরোপের কোনো দেশে চলে যাওয়ার বিভিন্ন গুঞ্জন বিভিন্ন সময় ওঠে। ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের পার্লামেন্টে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ভারতের রাজ্যসভার সদস্য ডা. জন বৃত্তাস ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংয়ের কাছে জানতে চান, বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে কি না। যদি চেয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে তাকে ফেরত চেয়েছে এবং ভারত সরকারের এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া কী? জবাবে কীর্তি বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের জবাব দেয়নি ভারত। রণধীর জয়সোয়াল ও কীর্তি বর্ধন সিংয়ের এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে এটুকু নিশ্চিত শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই। অনেকের মতে, উত্তরপ্রদেশে আছেন হাসিনা, আবার অনেকে বলছেন দিল্লিতে। কেউ কেউ বলছেন, ভারত সরকারের রুটিন অনুযায়ী মাস অন্তর ভারতের মধ্যে একাধিক স্থান পরিবর্তন করেছেন হাসিনা। আবার অনেকেই বলছেন, তাকে সম্প্রতি রাজস্থানে রাখা হয়েছে। কারো কারো মতে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থান করছেন। কারণ একাধিক মাধ্যম বলছে, আওয়ামী লীগের পলাতক অনেক মন্ত্রী-নেতা কলকাতার সল্টলেক এবং নিউ টাউন অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন। ফলে তিনি ওই দুই অঞ্চলের মধ্যে অস্থায়ী অবস্থান করছেন। মনে করা হয়, দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নানা ছক কষতে কলকাতায় একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন হাসিনা। তবে এ নিয়ে নিশ্চিত কেউ বলতে পারছে না।
বোন-ছেলে বা মেয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও দেখা যায়নি হাসিনাকে
পালিয়ে থাকা শেখ হাসনার সঙ্গে আসলে কে আছেন, তাকে কে সঙ্গ দিচ্ছেন সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। তার পালানোর পর এখন পর্যন্ত তার পরিবারের কারো সঙ্গে তাকে দেখা যায়নি। এমনকি দলটির সিনিয়র কোনো নেতার সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়নি। অর্থাৎ দল বা পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার কোনো ভিডিও বা স্থিরচিত্র কারো নজরে আসেনি। ফলে তার অবস্থান ও অবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। নেতাকর্মীরাও এ বিষয়ে রয়েছেন অন্ধকারে। তিনি ভারতের একটি গণমাধ্যমকে যে সাক্ষাৎকারে দিয়েছিলেন, সেটিও সশরীরে দেননি। ফলে এ বিষয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়ার খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও বক্তব্য এআই নাকি হাসিনার নিশ্চিত নয়
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হওয়ার পরপরই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দপ্তর বদল করে শেখ হাসিনা আইনজীবী শ ম রেজাউল করিমকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পাদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার স্বৈরশাসনের পতন হওয়ার পর রেজাউল করিম কীভাবে দেশে আত্মগোপনে ছিলেন, কীভাবে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, তার ফিরিস্ত তুলে ধরেছেন লাইভে এসে। ঠিক একইভাবে অনেকই ছোট বড় নেতাও নানা সময় লাইভ করে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন।
এমন একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে যাদের সঙ্গে পলাতক থেকেই আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যরা যোগাযোগ রাখছেন। কথা বলছেন, দেশে কী কৌশলে চলতে হবে সেই পথও বাতলে দিচ্ছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেটি দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময় শেখ হাসিনার অডিও বার্তায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। প্রচার হওয়া ওই সব অডিও বার্তায় কখনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার আলামত আবার কখনো কোনো সোর্স ছাড়াই হাসিনার কণ্ঠে নানা সমালোচনার কথা শোনা যায়। কিন্তু এসব সত্যি সত্যি শেখ হাসিনা বলেছেন কি না, সত্যিকারার্থে প্রচার হওয়া সেই সব বার্তায় শেখ হাসিনার কি না, তা স্বীকৃত কোনো সংস্থা বা ফেক চেকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়নি।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ দলীয় কোনো বার্তা দেওয়ার জন্য দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে বিবৃতি দিয়ে আসছে। এমনকি বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলটির পক্ষ থেকে শোক বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি যদি দলীয়ভাবে কোনো বার্তা দিতে চান, সেটি অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। সামাজিকমাধ্যমে দেওয়ার কথা নয়। আর প্রযুক্তি বর্তমান প্রেক্ষাপটে এআই বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-এর মাধ্যমে যে কারো কণ্ঠ হুবহু নকল করা যায়। ফলে সামাজিকমাধমে বিভিন্ন সময় ছড়িয়ে পড়া শেখ হাসিনার ভয়েসগুলো সত্যিকারার্থে তার ভয়েস কি না, সেটিও নিশ্চিত নন কেউ কেউ। তাছাড়া আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এসব বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।
জীবিত আছেন কিনা এমন প্রশ্নও আসছে কারো কারো মনে
হাসিনা কীভাবে আছেন, বেঁচে আছেন কিনা, বেঁচে থাকলে তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন কিনা? এমন নানা প্রশ্নই মানুষের চোখের সামনে চলে আসে। পলাতকরা বেঁচে থেকে দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে থাকার নজির যেমন আছে, তেমনি মৃত্যুবরণের পর গোপনে দাফন করার ঘটনাও কিন্তু রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের খুনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদকে ৭ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়, গভীর রাতে রিকশায় ঘোরাঘুরির সময় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা তাকে আটক করে। এরপর তাকে আদালতে তোলা হয় এবং ১২ এপ্রিল তার দণ্ড কার্যকর করা হয়। এমন আরও উদাহরণ সামনে আসছে। শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখতে না পাওয়ার কারণে তার বেঁচে থাকা ও অবস্থান নিয়ে নানা সংশয় রয়েই যাচ্ছে।
সরকারের ভাবনা ও পদক্ষেপ
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই মামলায় তাঁর সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও। মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘চব্বিশের অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার গুঞ্জন ও আইনি অবস্থান সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, আমরা তো তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে- যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।
আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; মাথা উঁচু করে গণতন্ত্রে ফেরা আওয়ামী লীগের নৈতিক দায়িত্ব। এটিই সমগ্র জাতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা, সেটা হলো, প্রতিশোধ নয় বরং আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তিনি নিশ্চিত করতে চান। সেক্ষেত্রে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার সমস্ত কিছুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান। আওয়ামী লীগকে বাদ রেখেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে পুনর্গঠনের বিষয়টি ‘সম্পূর্ণ বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেন বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, এই আদালতকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, এই কোর্টকে বাংলাদেশের মানুষও প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই আদালতে শেখ হাসিনা যেতে চান, যেখানে আইনের শাসন থাকবে। যেখানে ন্যূনতম স্বাধীন, সার্বভৌমভাবে আদালত কাজ করতে পারবে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের বক্তব্য
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও বিচারের মুখোমুখি করা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেন, পিলখানা হত্যা মামলা থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণসহ নজিরবিহীন গণহত্যার মূল নির্দেশদাতা ছিলেন শেখ হাসিনা। সে কারণে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ায় তার কৃতকর্মের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা দল দেশের ঊর্ধ্বে নয়। তাই পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা এখন জাতির অন্যতম প্রধান দাবি।
যা বলছেন চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে আছেন বলে তাঁরা জানেন। তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁকে ফেরত আনাটা আইনগত ব্যাপার। নিশ্চয়ই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তাঁরা নেবেন। চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ প্রতিবেদক জানতে চেয়েছিলেন ‘প্রসিকিউশন তো আগে উদ্যোগ নিয়েছে। সেটার অগ্রগতি কত দূর?’ তবে অগ্রগতির বিষয়ে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলতে চাননি।