আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে নিজ নিজ কাজের হিসাব পেশ করতে হবে


২১ মে ২০২৬ ১০:২০

॥ শামসুন্নাহার নিজামী ॥
“প্রকৃতপক্ষে ঈমান আনয়নকারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট করুণা এই যে, তিনি তাদের জন্য স্বয়ং তাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূলের আবির্ভাব করেছেন, তিনি তাদের আল্লাহর আয়াত শুনান, তাদের আত্মশুদ্ধি করেন ও তাদের কিতাব ও হিকমার শিক্ষা দেন। নতুবা তারা তো এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহির মধ্যে লিপ্ত ছিল।” (সূরা আল ইমরান : ১৬৪)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাই তার রহমত বান্দাদের প্রতি অপরিসীম। রাসূল (সা.)-এর আগমন মানবজাতির জন্য এক রহমতস্বরূপ। তার তিনটি কাজ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
১. আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজীদ) পড়ে শোনানো। অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশাবলী অবিকল বর্ণনা করা। ২. আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়া করা। অর্থাৎ মানুষকে তাদের জীবনের মন্দ গুণাবলীর রীতিনীতি ও কাজকর্ম থেকে পরিশুদ্ধ করা এবং তাদের মধ্যে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী, আচার-আচরণ ও সঠিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা। ৩. কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেওয়ার অর্থ আল্লাহর কিতাবের সঠিক মর্ম বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের মধ্যে এমন দূরদৃষ্টি সৃষ্টি করা- যাতে করে তারা আল্লাহর কিতাবের গূঢ় রহস্য বুঝতে পারে এবং মানুষকে হিকমত ও বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া; যাতে তারা গোটা জীবনের বিভিন্ন দিকগুলো আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সমাধান করতে পারে।
এই কাজ সৃষ্টির শুরুতে দুনিয়ার প্রথম মানব আদম (আ.) থেকে শুরু হয়েছে। এই দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আগমন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, আর স্মরণ করো, ইবরাহিম এবং তার পুত্র ইসমাইল যখন এই ঘরের ভিত উঠাচ্ছিল, তখন তারা (দোয়া করে) বলেছিল, ‘আমাদের প্রভু আমাদের পক্ষ থেকে এই কাজ কবুল করো নিশ্চয়ই তুমি সব কিছু শোনো, সবকিছু জানো।’
আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই তোমার প্রতি (মুসলিম অনুগত আর আত্মসমর্পিত) বানাও। আমাদের বংশধরদের থেকেও তোমার প্রতি একটি ‘মুসলিম উম্মাহ’ (অনুগত জাতি) বানাও। আমাদেরকে আমাদের ইবাদত পদ্ধতি শিখিয়ে দেও এবং আমাদের তওবা কবুল করে আমাদের ক্ষমা করো। নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী-অতি ক্ষমাশীল, দয়াময়।
হে আমাদের প্রভু! এদের (আমাদের বংশধরদের) কাছে তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠাও, যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে তোমার কিতাব এবং হিকমা শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে তাজকিয়া করবেন। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশক্তিমান সর্বজ্ঞানী। (সূরা বাকারা : ১২৬-১২৯)।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই দোয়ার ফসল। তিনি তার নবুয়তি জিন্দেগীতে এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে গেছেন। আর উম্মতের ওপর তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন : “এভাবে আমরা তোমাদের একটি ‘মধ্যপন্থী উম্মাহ’ বানিয়েছি। যাতে তোমরা বিশ্ববাসীর জন্য সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের জন্য সাক্ষী।” (আল বাকারা : ১৪৩)।
যুগে যুগে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে আল্লাহর দীনের এই কাজ অব্যাহত আছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী নামে এ কাজ হচ্ছে। এটি কোনো নতুন আবিষ্কার নয়, নবী-রাসূলদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নিয়ে এই দলের যাত্রা শুরু। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়েছে। পাকিস্তানের এক অংশ পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ। কিন্তু মুসলমান হিসেবে আল্লাহ বান্দাদের দায়িত্ব-কর্তব্য এক অভিন্ন। এই দায়িত্ব পালনকালে স্থান-কাল-সময় ভেদে হিকমতের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ‘তারা পরামর্শের ভিত্তিতে পরামর্শ নেয়। এই পরামর্শ ভুল হতে পারে। ভুল হলে আল্লাহর কাছে তওবা করে ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহ তওবা কবুলকারী, ক্ষমাশীল।’
বাংলাদেশের ১৯৭১ একটি অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। নারী নির্যাতন হয়েছে। এসব সত্য। কিন্তু এর কোনোটার জন্য জামায়াত কি দায়ী? জামায়াতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে। কারণ ভারতের মতো আগ্রাসী শক্তির সহায়তার ভয়াবহতা জামায়াত আগেই বুঝেছিল। সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল বা ভুল ছিল সে প্রশ্নে না গেলাম, কিন্তু জামায়াতের কেউই কোনো খুন, ধর্ষণ বা লুটপাটে অংশ নেননি, তাদের বিরুদ্ধে কোনো থানায় কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি।
এখনো যদি কোথাও কারো অপরাধ প্রমাণ হয় তার বিচার হোক, কিন্তু এই ট্যাগের রাজনীতি আর কতদিন? জাতি কি এতে লাভবান হচ্ছে, না ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটা ভাবতে হবে। অনেকে দায় এড়ানোর জন্য অনেক কথা বলেন। কিন্তু আমাদের তো কোন হীনম্মন্যতাবোধ নেই। আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভৌগোলিক সীমারেখা মেনে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা দীনের দায়িত্ব পালন করছি।
নাম নিয়েও আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, বরং জামায়াতের অতীত গৌরবময়। এক সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে এই দলের। এই সংগঠনের মাধ্যমে সৎ-যোগ্য, খোদাভীরু মানুষ তৈরি হচ্ছে, যারা বাংলাদেশের সম্পদ। একটা দেশ গড়তে গেলে তার নাগরিককে সৎ হতে হয়। জামায়াত-শিবির সৎ-যোগ্য মানুষ তৈরির ফ্যাক্টরি বলা যায়। সবাইকে এ দল করতে হবে, আমরা সেটা মনে করি না, ইসলামে জোর জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই।
সত্য পরিষ্কার যার ইচ্ছা, সে সত্যকে গ্রহণ করবে। এই সংগঠনে অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তার অবস্থান থেকে ছিটকে পড়েছে। পড়তেই পারে, হকের পথে টিকে থাকার জন্য আল্লাহ দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন।
“হে আমাদের রব! তুমি আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিও না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।” (সূরা আল ইমরান : ৮)।
আল্লাহর দীনের পথে টিকে থাকা আল্লাহর রহমতের ফল। যারা টিকে থাকতে পারে, তারা মহা সৌভাগ্যবান। কোনো দেশ আমাদের মডেল না। আমাদের মডেল মাপকাঠি কুরআন-সুন্নাহ। অবশ্যই বিভিন্ন দেশের অবস্থা আমরা পর্যালোচনা করব। ভালোটা গ্রহণ করলে যদি লাভ হয়, তাতে তো কোনো অসুবিধা নেই।
একটা কথা পরিষ্কার যে আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে নিজ নিজ কাজের হিসাব পেশ করতে হবে। সবাই যদি আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক এবং যত্নবান হই, তাহলে সে সমস্ত ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত দল আল্লাহ প্রদর্শিত পথে চলবে, ইনশাআল্লাহ।