চুপ্পুর চিকিৎসা নাকি ভ্রমণবিলাস
২১ মে ২০২৬ ০৯:৫৯
সোনার বাংলা রিপোর্ট : ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের প্রিয়ভাজন প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গত ১৮ মে সোমবার যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ফলোআপ চিকিৎসা ও হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার শেষে দেশে ফিরেছেন। সরকারের কঠোর ব্যয় সংকোচনের নির্দেশের মধ্যেও রাষ্ট্রপতির লন্ডন অবস্থানকালে তার সাথে বিশাল বহর, ৭টি বিলাসবহুল গাড়ি ভাড়া করা এবং হিল্টন ও বেডফোর্ড লজের মতো দামি হোটেলে ব্যয় মেটাতে জনগণের বিপুল অর্থের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, রাষ্ট্রপতির বিমান ভাড়া, বিলাসবহুল হোটেলের আবাসন এবং চিকিৎসা ব্যয় মিলিয়ে ৯ দিনের এ সফরে সরকারের ন্যূনতম ২ কোটি থেকে ২.৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। দেশের রিজার্ভ সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই সময়ে রাষ্ট্রপতির এত বড় বহর নিয়ে বিদেশ সফরকে অপচয় হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এ ধরনের উন্নত চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই সম্ভব। বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তা প্রমাণ করেছেন। তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে দেশের অভিজ্ঞ ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে তার হার্টের জটিল অপারেশন সম্পন্ন করেছেন। আল্লাহর রহমতে সুস্থভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এদেশের বিরোধীদলীয় নেতা এমন উদাহরণ সৃষ্টি করার পর রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফর এবং এর খরচের স্বচ্ছতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন উঠছে।
লন্ডনের ক্যামব্রিজে অবস্থিত বিখ্যাত রয়্যাল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে (জড়ুধষ চধঢ়ড়িৎঃয ঐড়ংঢ়রঃধষ) রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের চিকিৎসা বাবদ হাসপাতালের নির্দিষ্ট চূড়ান্ত বিলের পরিমাণ সরকারিভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাজ্যে ব্যক্তিগত বা আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য হার্টের এনজিওগ্রাম এবং রিং পরানোর (অহমরড়ঢ়ষধংঃু ধহফ ঝঃবহঃরহম) যুক্তরাজ্যের নামী হাসপাতালগুলোর খরচ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির চিকিৎসার আনুমানিক বিলের বিবরণ বিভিন্ন সূত্র জানা গেছে, এনজিওগ্রাম ও কনসালটেশন ফি: হার্টের ব্লক পরীক্ষা (অহমরড়মৎধস) এবং বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ ফি বাবদ খরচ সাধারণত ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩.৮ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা)।
অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি এবং রিং পরানো সাধারণত ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ পাউন্ড হয়ে থাকে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২৩ লাখ টাকা। হার্ট অপারেশনের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ বা হাসপাতালের প্রাইভেট কেবিনে থাকার খরচ প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ পাউন্ড (প্রায় ১.৫ লাখ থেকে ২.৩ লাখ টাকা)। সারসংক্ষেপ : সব মিলিয়ে রয়্যাল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির হার্টের পরীক্ষা ও রিং পরানোর সম্পূর্ণ চিকিৎসা বাবদ ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ পাউন্ড বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৩ লাখ থেকে ৩১ লাখ টাকা হাসপাতালের বিল বাবদ খরচ হয়েছে।
গত শনিবার (৯ মে) সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়েন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বঙ্গভবনের প্রেস উইং। রাষ্ট্রপতির এই সফরে তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ, ব্যক্তিগত চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সঙ্গে রয়েছেন। অথচ ফ্যাসিস্ট হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জরুরি প্রয়োজনেও বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেননি। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য ছিল প্রয়োজন। কিন্তু চুপ্পুর মতো অনেকেই যাচ্ছেন ভ্রমণবিলাসিতার কারণে।
দরিদ্র দেশের শাসকদের বিদেশ ভ্রমণবিলাসিতা নতুন নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের এ বিলাসিতা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন কিংবা সভা-সেমিনারেই সীমাবদ্ধ নয়, চিকিৎসার মতো জীবনরক্ষাকারী বিষয়েও চলে। তাই কথায় আছে, ‘গরিব মরে ক্যান্সারে দেশের হাসপাতালের বারান্দায়, হাঁচি-কাশি দিয়ে রাজা বিমানে বিদেশ উড়ে যায়।’ মানে খুবই সহজ, দেশের সিংহভাগ মানুষ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সুচিকিৎসার সুযোগ বঞ্চিত। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, এমপিরা সামান্য ছোট-খাটো রোগের চিকিৎসা; এমনকি চেক আপের জন্যও বিদেশ যান দরিদ্র জনগণের করের টাকায় বিশাল বহর নিয়ে। এশিয়ার অন্যতম মহান রাজনৈতিক নেতা আধুনিক মালেশিয়ার কারিগর ডা. মাহাথির মোহাম্মদের জীবনের একটি ঘটনা আছে- তাকে একবার চিকিৎসকরা বিদেশে চিকিৎসার পরামর্শ দিলে তিনি তাদের কাছে জানতে চান- কেন তাকে বিদেশ যেতে হবে? হাসপাতালটির কী কী আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কারণ তিনি বিদেশ যাবেন, কিন্তু তার দেশের জনগণের কী হবে? তাই নির্দেশ দেন হাসপাতালে আধুনিকায়নের এবং তাদের জানিয়ে দেন তিনি দেশেই চিকিৎসা নেবেন। তিনি কথা রেখেছেন, হাসতালের আধুনিকায়নের পর তিনি ঐ হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছেন।
সফরসঙ্গীদের বিশাল বহর নিয়ে সমালোচনার জবাবে বঙ্গভবনের প্রটোকল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির বয়স ও বর্তমান শারীরিক জটিলতার কারণে সার্বক্ষণিক নিবিড় সেবার প্রয়োজন ছিল। বহরে রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্য ছাড়াও তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, স্টাফ নার্স এবং বঙ্গভবনের অতিপ্রয়োজনীয় অফিশিয়াল ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। চিকিৎসার প্রটোকল বজায় রাখতেই এই দলটিকে সাথে নেওয়া অপরিহার্য ছিল।