সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার


২১ মে ২০২৬ ০৯:৪৭
॥ জামশেদ মেহদী ॥
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অর্থাৎ বিগত অধিবেশনের শেষের দিকে গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ঐ প্রস্তাবে বলা হয় যে, সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। এই ১৭ জনের মধ্যে সরকারি দল থেকে থাকবেন ১২ জন এবং সংসদে বিরোধীদলের আনুপাতিক সংখ্যা অনুযায়ী বিরোধীদল থেকে থাকবেন ৫ জন সদস্য। মোট ১৭ জন সদস্য। প্রস্তাব উত্থাপনকালে তিনি বিরোধীদল থেকে ৫ জন সদস্যের নাম দেওয়ার জন্য বিরোধীদলের নেতার প্রতি আহ্বান জানান। জবাবে বিরোধীদলের নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো নাম দিতে পারবেন না। বিষয়টি তাদের ভেবে দেখতে হবে। তাছাড়া তাদের ১১ দলীয় জোটের সাথেও তাকে আলোচনা করতে হবে। এরপর সংসদের অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়।
গত সপ্তাহে ইংরেজি ডেইলি স্টারের প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম সংবাদে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সংসদীয় কমিটিতে কোনো নাম দেবে না। কারণ তারা মনে করেন যে, সংবিধানের কোথায় কোথায় সংশোধনীর প্রয়োজন এবং কী কী সংশোধনী আনা প্রয়োজন, সে ব্যাপারে গণভোটে স্পষ্ট রায় দেওয়া হয়েছে। গণভোটে ৪৭টি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং ঐ ৪৭টি প্রস্তাবে দেশের জনগণের নিকট থেকে হ্যাঁ বা না সূচক ভোট চাওয়া হয়েছিল। জনগণ ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দিয়ে ঐ ৪৭টি প্রস্তাবকে সংবিধানে সংশোধনী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন আর নতুন করে সংসদীয় কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে না।
গত ১৮ মে সোমবার ডেইলি স্টারে রিপোর্ট করা হয় যে, সরকার ‘ডেইলি স্টারের’ মাধ্যমে বিরোধীদলের অবস্থান জেনেছে। তবে সরকার বিরোধীদলের উত্তর বা অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চায়। এজন্য বিরোধীদলকে পুনর্বার অনুরোধ করা হবে। এছাড়া আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের যে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে, ঐ অধিবেশনেও সরকার পুনর্বার প্রস্তাবটি উত্থাপন করবে। সেখানে সরকার বিরোধীদলের উত্তর আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাইবে।
ইত্যবসরে এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলাম এমপি সাংবাদিকদের বলেছেন যে, তার দল সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। জুলাই বিপ্লবের অব্যবহিত পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দাবি করেছিল যে, বর্তমান সংবিধান হলো মুজিববাদী সংবিধান। এই সংবিধান ছাত্র এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার বা পরিবর্তন। এজন্য তারা দাবি তুলেছিলেন সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণা। এই সেকেন্ড রিপাবলিক গঠনের নিমিত্তে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। ঐ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হবে একটি গণপরিষদ। ঐ গণপরিষদ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী একটি নতুন সংবিধান রচনা করবে। এই নতুন সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পর ঐ সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যে নির্বাচনে গঠিত হবে জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক কমিটি বা এনসিপি গঠিত হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এসব দাবি এনসিপি তাদের মেনিফেস্টোতে ধারণ করে।
ঐকমত্য কমিশনে ৩৩টি দল যখন সংবিধান সংস্কারের জন্য ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে যাচ্ছিল, তখন দেশের বড় দল বিএনপির সাথে জামায়াত, এনসিপি, এবি পার্টিসহ অনেকগুলো দলের মধ্যে মতভিন্নতা লক্ষ করা যায়। সেই মুহূর্তে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে এনসিপি গণপরিষদ গঠন এবং নতুন সংবিধান রচনার দাবি থেকে সরে আসে। এই সরে আসার লক্ষ্য এই ছিল না যে, তারা তাদের নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি থেকে স্থায়ীভাবে সরে যাচ্ছে। তবে বিএনপির সাথে তাদের মতানৈক্যের সুযোগ নিয়ে ইন্ডিয়ান এজেন্ট এবং আওয়ামী লীগ যেন জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্যই তারা ঐ দাবি থেকে সরে আসে। তবে মধ্যমপন্থা হিসেবে তারা ঐ ৪৭টি সুপারিশের ভিত্তিতে গণভোটের দাবি তোলে। সেই অনুযায়ী নির্বাচন ও গণভোট হয়।
নির্বাচনে জালিয়াতি না হলেও ভোটগণনায় বিরাট কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। এছাড়া বিএনপিকে যেকোনো মূল্যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতিয়ে আনার জন্য ঋণখেলাপি এবং বিদেশি নাগরিকদেরও এমপি করার সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবে দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি সরকার গঠন করে।
সরকার গঠনের পরই বিএনপি চোখ উল্টে ফেলে। জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, এই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে কীভাবে? অর্থাৎ এই সনদকে সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়া বা সংবিধানের অংশ করা হবে কীভাবে? ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. আলী রীয়াজ এবার ৫ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে ৫-৬টি বৈঠক করেন। অতঃপর তিনি রাজনৈতিক দলসমূহের সাথেও বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের পর এই মর্মে সিদ্ধান্ত হয় যে, জুলাই বাস্তবায়নের জন্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ নামে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশ জারি করা হবে। ঐ আদেশ মোতাবেক একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ঐ গণভোটে জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ তুলে ধরে জনগণকে বলা হবে যে, তারা সংবিধান সংস্কারের উদ্দেশ্যে জুলাই সনদের উল্লিখিত অংশগুলোর বাস্তবায়ন চান কিনা? চাইলে ‘হ্যাঁ’ ভোট, আর না চাইলে ‘না’ ভোট। ১২ ফেব্রুয়ারি যেদিন জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়, ঐ দিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার একাধিক নির্বাচনী জনসভায় জনগণকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচ্য প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশে ২টি ব্যালট ছিল। ১টি হলো এমপি নির্বাচনের, আরেকটি হলো গণভোটের। নির্বাচনের পর নির্বাচিত সদস্যদের দুটি শপথ গ্রহণ করতে হবে। একটি এমপি হিসেবে, আর একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
নির্বাচনে জয়লাভ করার পর বিএনপি প্রথম শপথটি গ্রহণ করে, কিন্তু দ্বিতীয় শপথ অর্থাৎ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে জামায়াতসহ বিরোধীদলের ৭৭ জন সদস্য ২টি শপথই গ্রহণ করেন। বিএনপি বলে যে, সংবিধান সংশোধন বাস্তবায়ন আদেশের মতো আদেশ জারির ক্ষমতা বা এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই। তারা এ-ও বলে যে, বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোনো ব্যবস্থা নেই। সোজা কথা, এ ধরনের নতুন নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে বিএনপি জুলাই সনদ তথা জুলাই বিপ্লবকেই এড়িয়ে যাচ্ছে।
এর স্বাভাবিক পরিণতিতে বিরোধীদল যখন সংসদের ভেতরে এবং বাইরে অভিযোগ করে যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জুলাই সনদকে এড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বিএনপি নতুন কথা বলে। তারা বলে যে, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। এই কথাটির মধ্যে রয়েছে একটি বিরাট শুভঙ্করের ফাঁক। কারণ জুলাই সনদে যে ৮৪টি প্রস্তাবনা রয়েছে, সেগুলোর সবকটি গণভোটে দেওয়া হয়নি। বিএনপি ঐ ৮৪টি প্রস্তাবনার মধ্যে ২৩টিতে নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়েছে। কিন্তু বিএনপির ঐসব নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে দেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বিএনপি সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের নির্বাচন দাবি করেছিল। কিন্তু গণভোটে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি দলের সামষ্টিক ভোটে উচ্চকক্ষের ভিত্তিতে আসন সংখ্যা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়। ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে সামষ্টিক ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের স্বপক্ষে রায় দেন।
বিরোধীদলের তরফ থেকে সঠিক এবং যৌক্তিকভাবেই বলা হচ্ছে যে, জনগণের ইচ্ছাই সার্বভৌম। গণভোট সেই ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যম। গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, এখন সংসদের কাজ হলো সেই রায়কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। বিএনপি সংবিধান সংশোধনের জন্য যে সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা বলছে, সেটি গণভোটের প্রতি চরম উপেক্ষা এবং জনগণের রায়কে অমান্য করার শামিল। আর টেকনিক্যাল ভাষায় বিএনপির মতে, সংবিধান গণরায় তথা জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের ওপর। অর্থাৎ জনগণের অভিপ্রায় সংবিধানের সাবোর্ডিনেট। পক্ষান্তরে বিরোধীদলের বক্তব্য হলো, যেহেতু জনগণ তাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই হলো সার্বভৌম তাই সংবিধান সেই অভিপ্রায়ের সাবোর্ডিনেট।
ঠিক এখানে এসে সরকার ও বিরোধীদলের যে মতানৈক্য, সেটি দূর হবার নয়। কারণ এই মতানৈক্য মৌলিক প্রশ্নে, আদর্শগত প্রশ্নে। বিএনপি সংবিধান সংস্কারের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা বলে গণভোট তথা জনগণের অভিপ্রায়কে সংসদীয় কমিটির তথা সংবিধানের সাবোর্ডিনেট করে ফেলেছে।
সরকার এখানে আরেকটি চাতুরী করেছে। নির্বাচনে জয়লাভের এবং সরকার গঠনের কিছুদিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, আজ তারা একথা বলছেন। কিন্তু তাহলে গত বছরের নভেম্বর মাসে যখন সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়, তখন তারা তার বিরোধিতা করেননি কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তখন যদি আমরা বিরোধিতা করতাম, তাহলে ওরা ইলেকশনই দিতো না। আর যদিও-বা দিতো, তাহলে অনেক দেরি করে দিতো। সেজন্যই সময়মতো ইলেকশন দেওয়ার জন্যই তখন আমরা সেটি সমর্থন করেছি।
এর চেয়ে বড় ধোঁকাবাজি আর কী হতে পারে? সালাহউদ্দিন বলেছেন যে, সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশ নাকি জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা। কিন্তু জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি করে, মিথ্যা কথা বলে বিএনপি কী জনগণের সাথে, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার সাথে আরো বড় প্রতারণা করলো না?
যে মুজিববাদী সংবিধান আজ বিএনপির কাছে এত পবিত্র একটি দলিল হয়েছে, সেই সংবিধান তো বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। শুধু তাই নয়, স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান এই সংবিধানের পার্লামেন্টারি পদ্ধতির বদলে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম করেন। বেগম জিয়া তো প্রকাশ্যে বলেছেন যে, মুজিববাদী সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে। বেগম জিয়ার এই উক্তি এখনো ইউটিউবে ভাইরাল হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান এই সংবিধান আমূল পরিবর্তন করেন। তিনি ৭২-এর সংবিধানের সংসদীয় ব্যবস্থাকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারে রূপান্তরিত করেন। বর্তমান বিএনপি তো শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়ার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আদর্শ থেকে অনেক বিচ্যুত হয়েছে।
E-mail:jamshedmehdi15@gmail.com