রাজনীতিতে ফিরতে মরিয়া আ’লীগ


২১ মে ২০২৬ ০৯:৪১

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের পতিত ফ্যাসিবাদী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাত্ত্বিকভাবে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, দলটি এখন বেপরোয়াভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে এই পথ অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ। মূলধারার রাজনীতিতে দলটির পুনরুত্থান মূলত কয়েকটি জটিল আইনি, কাঠামোগত এবং সামাজিক নিয়ামকের ওপর নির্ভর করছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতা হারায়নি; হারিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রভাব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক নিরাপত্তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে- একটি বড় অংশের জনসমর্থনের নৈতিক ভিত্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ‘চিরতরে শেষ’ বলে কিছু নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে বাস্তবতা এখন তাত্ত্বিক সম্ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দলটির পুনরুত্থানের পথে অন্তত তিনটি বড় দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে- আইনি অবরোধ, সাংগঠনিক ভাঙন এবং সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যাখ্যান। এই তিন সংকট একসঙ্গে দলটিকে এমন এক রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় ফেলেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
আইনি পাঁচিল : রাজনীতিতে ফেরার প্রধান অন্তরায়
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং প্রথম বাধাটি হলো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির অঙ্গ-সংগঠন ও কার্যক্রমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বিএনপি সরকারের সময়ও সেটি বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার প্রক্রিয়া এবং সরকারের পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। যদি বিচারে দলটিকে দীর্ঘমেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয় বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়, তবে দলগতভাবে এর রাজনৈতিক পুনরুত্থান আইনি গোলকধাঁধায় আটকে যাবে।
২০২৫ সালের পর থেকে অন্তর্বর্তী প্রশাসন আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর ধারাবাহিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। দলটির একাধিক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে সহিংসতা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিবন্ধন পুনর্বহাল ছাড়া দলটির সাংবিধানিক রাজনীতিতে ফেরা কার্যত অসম্ভব। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, যদি আদালত গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগের দলগত দায় প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে দলটিকে কেবল নির্বাচনীভাবে নয়, সাংগঠনিকভাবেও নিষিদ্ধ করার বিতর্ক সামনে আসতে পারে। যদিও অন্য একটি অংশ বলছে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একটি রাজনৈতিক দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে- আইনি প্রক্রিয়া এখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাগ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নও আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
নেতৃত্বের সংকট : কেন্দ্র হারানো এক রাজনৈতিক কাঠামো
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং তাঁর গুরুতর আইনি মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ এক নজিরবিহীন নেতৃত্বহীনতার মুখোমুখি হয়েছে। দলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির অধিকাংশ নেতাই হয় আত্মগোপনে, নয়তো কারাগারে। এই শূন্যতা পূরণে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় দলের হাল ধরার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং তৃণমূলের ক্ষোভ ও মতামত শুনে দলকে পুনর্গঠনের কথা বলছেন। আবার অন্য একটি পক্ষ চাচ্ছে হাসিনা-তনয়া সায়মা ওয়াজেদ পুতুল দলের দায়িত্ব গ্রহণ করুক। দেশের অভ্যন্তরে কিছু স্থানীয় কার্যালয় পুনরায় খোলার চেষ্টা করা হলেও যুবসমাজ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র প্রতিরোধের মুখে তা সফল হচ্ছে না। একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারলে দলটির কৌশলগত টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দলটির দ্বিতীয় বড় সংকট সাংগঠনিক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমান্ড কার্যত ভেঙে পড়ে। বহু শীর্ষনেতা আত্মগোপনে চলে যান, কেউ গ্রেপ্তার হন, আবার কেউ প্রকাশ্যে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। দলের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক পুরোনো নেতাকর্মী এখন প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত।
প্রবাস থেকে সজীব ওয়াজেদ জয় দল পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। অনলাইনে কিছু ভার্চুয়াল মিটিং, বার্তা ও সাংগঠনিক আহ্বান থাকলেও, দেশের ভেতরে দৃশ্যমান সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ দেখা যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কয়েকটি অঞ্চলে ‘পকেট কমিটি’ বা সীমিত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সচল করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ছাত্র-জনতা, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং প্রশাসনিক নজরদারির কারণে সেসব প্রচেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয়নি।
একজন সাবেক জেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে আওয়ামী লীগ ছিল রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রের মতো। এখন স্থানীয় পর্যায়ে নেতারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত।’
আনন্দবাজারে শেখ হাসিনার বার্তা
শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্যেও তিনি ‘মাথা উঁচু করে দ্রুত ফিরবেন’ এবং রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর অনুপস্থিতিকে অনেকে নীরবতা হিসেবে দেখলেও বাস্তবে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘অনুপস্থিতি মানে নীরবতা নয়।’ তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে এবং তাঁর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে কাজ করছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সীমিত করার চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল কোনো একটি সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বাস্তবতার অংশ। তিনি ইঙ্গিত দেন, নয়াদিল্লি এখনো তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করছে না। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকারও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে।
হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে বড় ও শিকড়-সংবলিত রাজনৈতিক দল’ এবং জনগণের সমর্থন এখনো তাদের পক্ষে রয়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।
সাক্ষাৎকারে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। যদিও আগে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছিলেন- তিনি অবসরের কথা ভেবেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি এখনো সক্রিয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশা ছাড়েননি।
সব মিলিয়ে আনন্দবাজারকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেকে রাজনৈতিকভাবে এখনো প্রাসঙ্গিক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি একদিকে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেছেন; অন্যদিকে নিজের প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের আশাবাদী রাখার চেষ্টা করেছেন। সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক মহলেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
‘জেন-জি’ ফ্যাক্টর : নতুন প্রজন্মের গভীর অবিশ্বাস
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটি এসেছে তরুণ প্রজন্ম থেকে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শহুরে তরুণ সমাজ। এই প্রজন্মের বড় অংশ আওয়ামী লীগকে শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং ‘কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা, গুম, দমন-পীড়ন এবং ডিজিটাল নজরদারির অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সময়ের সঙ্গে নিজেদের নতুন করে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমস্যা হচ্ছেÑ তরুণদের একটি বড় অংশ দলটির আদর্শিক ভাষ্যই আর গ্রহণ করতে রাজি নয়।
দলের ভেতরেও আত্মসমালোচনার আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি অংশ মনে করছে, অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা, সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান এবং নতুন নেতৃত্ব ছাড়া পুনর্বাসন সম্ভব নয়। তবে পুরোনো প্রভাবশালী অংশ এখনো ‘কঠোর অবস্থান’ বজায় রাখতে চায়, যা দলীয় পুনর্গঠনের পথকে আরও জটিল করে তুলছে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দলটির গভীর আদর্শিক পুনর্মূল্যায়ন এবং অতীতের ভুলভ্রান্তির জন্য আত্মশুদ্ধি। শুধু সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা কৌশলগত জোট নয়, বরং জনগণের কাছে নতুন রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাই এখন দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ‘জেন-জি’ প্রজন্ম দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ, দমননীতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক একচেটিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে রাস্তায় নেমেছিল। ফলে তাদের কাছে আওয়ামী লীগের পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা বা উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রচার আর আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে কার্যকরভাবে ফিরতে চায়, তাহলে দলটিকে অতীতের ফ্যাসিবাদী বা নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক আচরণ, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- নতুন প্রজন্মের ভাষা, ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা বুঝতে না পারলে আওয়ামী লীগের জন্য জনআস্থা পুনর্গঠন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
তবুও কেন আওয়ামী লীগ পুরোপুরি শেষ নয়
সব সংকটের পরও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আওয়ামী লীগকে ‘সমাপ্ত অধ্যায়’ বলতে রাজি নন। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের নজির অস্বাভাবিক নয়। আওয়ামী লীগের এখনো ছোট হয়ে এলেও একটি স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে; বিশেষ করে গ্রামীণ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে। দলটির দীর্ঘ ঐতিহ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এখনো একটি অংশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি।
আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে- দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বাস্তব চরিত্র। এখানে রাজনৈতিক জোট, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক সংকট বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। অতীতে বহু দল ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরও নতুন বাস্তবতায় ফিরে এসেছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন আকার নেয় এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের কোনো ‘রিব্র্যান্ডেড’ বা নতুন নেতৃত্বভিত্তিক সংস্করণ আবার রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
দিল্লির হিসাব : আওয়ামী লীগ কী এখনো প্রয়োজনীয়?
ভারত ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। দিল্লির দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, ট্রানজিট সুবিধা এবং চীনের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় একটি নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি ছিল। ফলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও ভারতের কৌশলগত হিসাব থেকে আওয়ামী লীগের গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় ভারত প্রকাশ্যে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বললেও, বাস্তবে দিল্লি এমন কোনো পরিস্থিতি চায় না যেখানে অতিরিক্ত চীনঘেঁষা, তীব্র ভারতবিরোধী বা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। বাংলাদেশের ভূগোল, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবস্থান ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দিল্লি এখানে একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবেশকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান কৌশল সম্ভবত আওয়ামী লীগের ‘সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত পুনঃঅন্তর্ভুক্তি’। অর্থাৎ দলটিকে আগের মতো একক আধিপত্যে ফিরিয়ে আনার চেয়ে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে আওয়ামী লীগ পুরোপুরি বিলুপ্তও হবে না এবং একইসঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্যও বজায় থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার গঠন করার ঢেউ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও লাগতে পারে বলে আশা করছে আ’লীগ সমর্থকরা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি ‘সফট বাফার’ হিসেবে কাজ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস অনেক সময় দিল্লির কঠোর নীতির বিপরীতে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দিল্লির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ও সীমান্তনীতি পশ্চিমবঙ্গেও আরও কঠোরভাবে কার্যকর হতে পারে। এনআরসি, সিএএ, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন আবার নতুন করে উত্তপ্ত হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। ভারতবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এটিকে ‘হিন্দুত্ববাদী চাপ’ হিসেবে তুলে ধরবে। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থি রাজনীতিও নতুন ভাষা ও নতুন ইস্যু পাবে।
বেইজিংয়ের বাস্তববাদ
চীন দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যক্তিনির্ভর সম্পর্কের চেয়ে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও বেইজিংয়ের অবস্থানে সেই বাস্তববাদী প্রবণতাই স্পষ্ট। চীনের প্রধান আগ্রহ এখন কোনো নির্দিষ্ট দল নয়; বরং তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল অবকাঠামোসহ বেল্ট ও রোড উদ্যোগ-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। ফলে বেইজিং এমন একটি সরকার চায়, যারা প্রশাসনিকভাবে কার্যকর থাকবে এবং পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে চীনের দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সেটি ছিল টেকনিক্যাল। বর্তমান বাস্তবতায় বেইজিং প্রকাশ্যে কোনো পক্ষকেন্দ্রিক অবস্থান নিচ্ছে না দৃশ্যত। তবে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক দল স্বার্থগতভাবে চীনের কাছাকাছি বলে মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চীনের অগ্রাধিকার এখন ‘স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা’। অর্থাৎ যে শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষমতা দেখাবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখবে, চীন বাস্তববাদীভাবে তার সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত।
এই নীতির মাধ্যমে বেইজিং মূলত একটি বার্তা দিচ্ছে- বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
ওয়াশিংটনের দ্বৈত সংকট
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অংশীদারদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল ও দ্বিমুখী। একদিকে তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাসের প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে তারা এটাও বুঝছে যে, হঠাৎ রাজনৈতিক শূন্যতা বা রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির কারণে ওয়াশিংটন বাংলাদেশে একটি কার্যকর রাষ্ট্রকাঠামো বজায় রাখতে আগ্রহী। ফলে পশ্চিমা কূটনীতিতে এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারণাটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর অর্থ হচ্ছে- কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে, বরং নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্যে রাখা। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে পুরোপুরি বাদ দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও র‌্যাডিক্যালাইজেশন, প্রতিশোধমূলক রাজনীতি ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।
ফলে ওয়াশিংটনের সামনে এখন এক ধরনের দ্বৈত সংকট তৈরি হয়েছেÑ গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, কিন্তু একইসঙ্গে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেখানে রাষ্ট্রীয় ভাঙন বা চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ সমীকরণ : পুনর্জন্ম নাকি দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন?
বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে তিনটি নির্ধারক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, অন্তর্বর্তী বা ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক পুনর্মিলনের পথে হাঁটবে, নাকি কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখবে?
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কোন দিকে যায়? দলগত দায় প্রতিষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, দলটি কী সত্যিই নিজেদের আমূল সংস্কার করতে প্রস্তুত? নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব, রাজনৈতিক ক্ষমাপ্রার্থনা এবং আদর্শিক পুনর্গঠন ছাড়া তাদের পুনরুত্থান কঠিন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে সারকথা হচ্ছে- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ভাগ্যের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। দলটি বাংলাদেশে দেড় দশকের বেশি সময়জুড়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে রেখেছিল। মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে পড়ার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ফলে এই দলের জন্য আগের রূপে ফিরে আসাও এখন অত্যন্ত কঠিন। সামনে যে পথ, তা ক্ষমতায় ফেরার সরল রাস্তা নয়; বরং এক জটিল, অনিশ্চিত এবং বহুস্তরীয় রাজনৈতিক গোলকধাঁধা।
আওয়ামী লীগের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, তৃণমূল ভিত্তি এবং আদর্শিক সমর্থক গোষ্ঠী, যা দলটির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি রোধ করতে পারে। তবে দলটির স্বল্পমেয়াদি ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ঝুলে আছে- বর্তমান প্রশাসনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, চলমান আইনি বিচার প্রক্রিয়ার রায় এবং দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সংস্কারের মানসিকতা। এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ কত দ্রুত এবং কীভাবে নিজেকে সংস্কার করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের টিকে থাকার ভবিষ্যৎ।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একটি অংশ এখন বাংলাদেশের জন্য একটি ‘নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিন্যাস’ মডেল খুঁজছে- যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে না; আওয়ামী লীগ থাকবে, কিন্তু আগের মতো একক আধিপত্যে নয়; পরিবর্তন হবে, কিন্তু তা হবে কৌশলগত ভারসাম্যের ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির বড় প্রশ্ন- এখন কেবল ‘কে ক্ষমতায় যাবে,’ তা নয়, বরং ‘কোনো ভূরাজনৈতিক ছাতার নিচে নতুন ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠবে?’