বদরগঞ্জে ১০ হাজার মানুষের ভরসা বাঁশের সাঁকো
১৫ মে ২০২৬ ২১:৩৩
এনামুল হক, বদরগঞ্জ (রংপুর) : স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর দামোদরপুর ও ১০ নম্বর মধুপুর ইউনিয়নের দুই পাড়ের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যে জোটেনি একটি সেতু। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি মিললেও এখনো ভরসা শুকনো মৌসুমে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো আর বর্ষাকালে নৌকা। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। কালারঘাট জামাতলী হাফিজ ও এতিমখানা মাদরাসার সামনে যমুনেশ্বরী নদীর ওপর একটি সেতুর দাবিতে যুগের পর যুগ ধরে অপেক্ষা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি আজও।
নদীর পশ্চিম পাড়ে দামোদরপুর ও আশপাশের মাটিয়ালপাড়া, ডাঙাপাড়া, ফকিরপাড়া, ডারকাহাড়া, শাহপাড়া, প্রামানিকপাড়া, ডাঙ্গরবাড়ি, চিলাপাক বাজার, বালাপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম রয়েছে। এছাড়া চিলাপাক হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল, কমিউনিটি হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এপাড়ে। অপরদিকে পূর্ব পাড়ে রয়েছে জামাতলী হাফিজিয়া এতিমখানা মাদরাসা, দালালিপাড়া, ভাঙ্গেরপাড়, মাঠেরহাট, ডাক্তারপাড়া ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এখনো সাঁকো ও নৌকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েই বছরের পর বছর পার করা হচ্ছে। শেখেরহাট হাইস্কুলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘বর্ষার সময় নদী পার হতে খুব ভয় লাগে। নৌকায় করে যেতে হয়। অনেক সময় ক্লাস মিস হয়ে যায়। আবার শুকনো মৌসুমে সাঁকো পার হতে গিয়েও ভয় থাকেÑ হাতে বই ধরব, না সাঁকো ধরব বুঝতে পারি না।’
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকেই এই ঘাটে চলাচলের প্রধান মাধ্যম ছিল বাঁশের সাঁকো ও নৌকা। শুষ্ক মৌসুমে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এলাকাবাসী নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে সাঁকো মেরামত করেন। কিন্তু বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে সাঁকো তলিয়ে যায়, তখন নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
দালালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও আবুল হোসেনের ডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমরা বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছি। কিন্তু সেতু নির্মাণে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও রোগীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে। রাজনৈতিক কারণে কাজটি বাস্তবায়ন হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা গেছে, যমুনেশ্বরী নদীর কালারঘাটের বাঁশ ও কাঠের সাঁকোটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৫ মিটার। নড়বড়ে এই সাঁকো পার হতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের।
এই সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই যাতায়াত করছে আশপাশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে রয়েছে জামাতলী হাফিজিয়া ও এতিমখানা মাদরাসা, ডাক্তারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঠেরহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাশিয়াবাড়ী হাইস্কুল, আবুল হোসেনের ডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলাপাক হাইস্কুল, চিলাপাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলাপাক মাদরাসা, কাঠাবাড়ী দাখিল মাদরাসাসহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রায়ই ছোট-খাটো দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ফকিরপাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী মিল্লাদুর রহমান, তালিমুল ইসলাম, আশিকুর রহমান, ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি বাবর আলী এবং যুব জামায়াতের সভাপতি নুর আলম বলেন, ‘দুই পাড়ের প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিয়মিত এই ঘাট ব্যবহার করে। সেতু না থাকায় উপজেলা সদরে যেতে হলে ৬-৭ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। একটি সেতু নির্মাণ হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।’
স্থানীয় সমাজসেবক ও মাদরাসা শিক্ষক রাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষে জনস্বার্থে এই সেতুটি দ্রুত নির্মাণ করা জরুরি। এতে দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব হবে।’ এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা এলজিডি প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশিদ জানান, গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুটি দ্রুত নির্মাণের জন্য বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন একটাই- প্রতিশ্রুতি আর কাগজে নয়, বাস্তবে কবে নির্মিত হবে এই কাক্সিক্ষত সেতু? ততদিন পর্যন্ত হাজারো মানুষকে ভয় ও অনিশ্চয়তা নিয়েই চলাচল করতে হবে নড়বড়ে সাঁকো আর নৌকার ওপর নির্ভর করে।