সওয়াল ও সফর
১৫ মে ২০২৬ ২১:২১
ফররুখ আহমদ
[এক]
‘নেকি কর দওলত পানিতে ফেলিয়া।
কহিবে এহার ভেদ মোরে বুঝাইয়া॥’
(হুসনা বানুর দুসরা সওয়াল)
‘দৌলত পানিতে ফেলে নেকি করো’- কে লিখেছে, কেন
কি কারণে এই কথা?’- প্রশ্ন শুনে হ’ল রাহাগির
আবার হাতেম তায়ী, ডাক দিল অজানা সড়ক
আবার দূরান্ত দূরে, কেননা এ সফরের পথে
জিন্দেগীর গূঢ় অর্থ পায় খুঁজে সত্তা গতিমান,
নদী পায় সমুদ্রের দেখা, মঞ্জিলের দিশা পায়
মুসাফির। চলে তাই অবিশ্রাম তীব্র প্রাণাবেগে
হাতেম জিজ্ঞাসা নিয়ে-যমন দুর্মদ গতিস্রোতে
দীর্ঘ করে শিলাতল, অন্ধকার পাহাড় পেরিয়ে
জীবন্ত প্রবাহ চলে স্থির লক্ষ্য পানে,- জিন্দা দিল
‘যমনের শাহজাদা সেই মত চলে একা পথে;
চলে একা রাত্রিদিন দ্বিধাহীন অচেনা জগতে।
[দুই]
‘কহ ভাই তোমার দেশের সমাচার।’
দুসরা সওয়ালের পথে এই ভাবে চলে রাত্রিদিন,
গ্রন্থি খুলে সমস্যার, ছায়াচ্ছন্ন সন্ধ্যায় হাতেম
পৌঁছিল নগর-প্রান্তে সম্পূর্ণ অচেনা; শুনিল সে
লক্ষ সমাসিত কণ্ঠে আর্তস্বর, আহাজারি কারো।
শুধালো হাতেম তায়ী যখন দেশের সমাচার
বলিল প্রবীণ বৃদ্ধ, ‘প্রাণী এক পাহাড় সমান
হিংস্রতায় অতুলন পেরেশান করে প্রতিদিন
ত্রস্ত জনপদ। আশ্চর্য রাক্ষস সেই মধ্যমুখ
মরে না অস্ত্রের মুখে কিম্বা হাতিয়ারে। দুঃসাহসী
জঙ্গী নৌ-জোয়ান যত মারা গেছে সম্মুখ সংগ্রামে
রাক্ষসের হিংস্র নখে, ভয়ঙ্কর হিংস্র সে পিশাচ
এ শহরে হানা দিয়ে তুলে নেয় প্রত্যহ শিকার;
আদম-সন্তান এক প্রতি দিন যায় তার মুখে।
পারি না তাড়াতে আর। দুর্বিষহ এই জিন্দেগানি
যেখানে আওলাদ যায় প্রতি দিন রাক্ষসের গ্রাসে
পালাক্রমে। এভাবে হয়েছে শেষ সংখ্যাহীন প্রাণ
একে একে অন্ধ অপমৃত্যুর সম্মুখে; যাবে আজ
আমার চোখের আলো রাক্ষসের মুখে।’ দূর-দেশী
বলিল হাতেম তায়ী, ‘যাব আমি পুত্রের বদলে
রাক্ষসের কাছে, শুধু জানাও আমাকে নামদার
কেমন গঠন আর রাক্ষসের কেমন আকার॥’
[তিন]
‘জমিনে লিখিয়া নকশা করে নমুনাদার।’
হাতেমের কথা শুনে নকশা এঁকে দেখালো জমিনে
বাসিন্দা বস্তির (মধ্যমুখ সেই প্রাণী ভয়াবহ
মূর্তি হিংস্রতার)। বলিল হাতেম তায়ী চিত্র দেখে,
‘হলুকা প্রাণীর নাম, হাতিয়ারে মরে না কখনো
হিংস্র এ রাক্ষস। তবু প্রাণ নিতে চাও যদি আজ
সুকৌশলে দুঃসাহসী হাতিয়ার আনো হিকমতের।’
বলিল প্রবীণ বৃদ্ধ, ‘জানি না কেমন হাতিয়ার
চাও তুমি সর্বাত্মক সংগ্রামের পথে।’ ‘যমনের
শা’জাদা বলিল ফের, ‘আনো লক্ষ শিয়াগর ডেকে
এ ময়দানে। দরাজ আরশি চাই- যাতে রাক্ষসের
প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে মুখ আর পূর্ণ শরীরের॥’
[চার]
‘হেকমত করিয়া ওকে মার দাগা দিয়া।’
বানালো দরাজ আরশি মধ্য দিনে শিয়াগর ডেকে
বস্তির বাসিন্দা যত, তারপর সফেদ চাদরে
রাখিল সে আরশি ঢেকে হাতেমের ইঙ্গিতে (ভোরের
কুয়াশা যেমন ঢাকে রওশন সূর্যকে)। ভয়ঙ্কর
যখন রাক্ষস এল, চলে গেল প্রাণভয়ে ওরা
দূরে… বহু দূরে, শুধু রয়ে গেল নিঃকম্প নির্ভীক
একাকী আল্লার নামে তায়ী পুত্র কোশাদা ময়দানে।
হাতেম দেখিল চেয়ে সবিস্ময়ে-পাহাড় সমান
উদরের মধ্যে মুখ-বীভৎস রাক্ষস হিংস্রতম
অতি ক্ষুদ্র দুই চোখে জিঘাংসার আগুন জ্বালায়ে
প্রচণ্ড গতিতে আসে তীব্র বেগে সে প্রান্তরে; আর
সামান্য সংঘাতে তার পড়ে ভেঙে পাষাণ-প্রাচীর
ক্ষিপ্ত মহিষের পথে বালকের উদ্যান যেমন।
আরো কাছে এল প্রাণী… আরো কাছে… মধ্যমুখ হতে
আগুনের হল্কা এসে মুখে তার লাগিল যখন
দরাজ সে আরশি থেকে নিল খুলে সফেদ চাদর
পলকে হাতেম তায়ী (দূর হতে দেখিল বিস্ময়ে
বস্তির বাসিন্দা যত… চমকালো হলুকা রাক্ষস
বিশাল দর্পণে তার প্রতিচ্ছায়া দেখে)… তারপর
বিকট গর্জনে সেই শঙ্কাহত প্রান্তর কাঁপায়ে
বিশাল পাহাড় যেন পড়ে গেল জমিনে লুটায়ে॥
[পাঁচ]
‘আপন ছুরত দেখে হইল তামাম।’
হলুকার মৃত্যু দেখে দলে দলে ভয়মুক্ত প্রাণ
কৌতূহলী নারী-নর কাছে এসে শুধালো তখন
‘কীভাবে বিকট প্রাণী মারা গেল, কী ছিল হিকমত
আরশিতে গোপন?’- প্রশ্নের উত্তর দিল তায়ী পুত্র
শোকর-গোজারি করে আল্লার দরবারে। বলিল সে,
‘হলুকার মত প্রাণী মরে না কখনো হাতিয়ারে।
ব্যর্থ হয় তলোয়ার, কিম্বা তীর অথবা খঞ্জর
শিলা-সুকঠিন অঙ্গে রাক্ষসের, শুধু যায় প্রাণ
যখন কদর্য প্রাণী দেখে তার নিজের স্বরূপ
আরশিতে, পানিতে, নদ-নদীতে; সাগরে। ছায়া দেখে
দর্পণে সে মারা গেছে আতঙ্কিত কদর্য স্বরূপে।’
বলিল প্রবীণ বৃদ্ধ, ‘এই মত রয়েছে ইনসান
কিন্তু মরে না তো তারা মুখ দেখে আরশিতে কখনো।’
বলিল হাতেম তায়ী, ‘যদি তারা বিকৃত স্বরূপ
দেখে নিত কোন দিন আত্মার দর্পণে, যদি তারা
দেখে নিত প্রবৃত্তির পাশবতা,- যা রেখেছে ঘিরে
বিকৃত কদর্য সত্তা পশুত্বের কাছে; তবে তারা
মারা যেত সে মুহূর্তে আতঙ্কিত, বিকৃত স্বরূপে,
কিংবা বান্দা গোনাহগার ক্ষমা চেয়ে দরবারে আল্লার
ফিরে যেত ইনসানের সুমহান স্বভাবে স্বরূপে।
*
শেষ কথা বলে দিয়ে তায়ী পুত্র হল রাহাগির
আবার দুরন্ত পথে, মঞ্জিল মঞ্জিল রাহা চলে
পৌঁছিল সন্ধ্যায় এক প্রান্তরের পারে। দেখিল সে
নির্জন, নিস্তব্ধ মাঠ, নাই কোন নিশানা প্রাণের;
অনাদৃত গোরস্তান পড়ে আছে প্রান্তে সে মাঠের।