যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা


১৪ মে ২০২৬ ১০:২০

যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাবে ইরানের ৫ শর্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় নতুন করে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করায় নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কাছে ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি প্রস্তাবে কোনো সুরাহা হয়নি পরিস্থিতির। অবশ্য ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের একটা জবাব দিয়েছে, তবে নতুন করে আলোচনা শুরুর জন্য ইরান যুক্তরাষ্ট্রেকে ৫টি শর্তজুড়ে দিয়েছে। পাঁচটি শর্ত হচ্ছেÑ ১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (বিশেষ করে লেবাননে), ২. ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ৩. জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, ৪. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ৫. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনা শুরু করার জন্য এসব শর্তকে ‘ন্যূনতম গ্যারান্টি’ হিসেবে বিবেচনা করছে তেহরান।
৫ শর্ত মানলে নতুন করে আলোচনায় বসবে ইরান ঃ যুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাঁচটি আস্থা-অর্জনে শর্ত নির্ধারণ করেছে ইরান। এই পাঁচটি শর্ত পূরণ করা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসবে না ইরান। গত মঙ্গলবার (১২ মে) ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে এ সংবাদ প্রকাশ করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। সূত্রটি জানায়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনা শুরু করার জন্য এসব শর্তকে ‘ন্যূনতম গ্যারান্টি’ হিসেবে বিবেচনা করছে তেহরান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (বিশেষ করে লেবাননে), ২. ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ৩. জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, ৪. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ৫. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে তেহরানের অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে এমন বার্তা পাঠিয়েছে ইরান। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, আলোচনায় ফেরার জন্য ন্যূনতম আস্থা তৈরির কাঠামোর মধ্যেই এই শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শর্ত বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয় বলে মনে করে তেহরান। ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাব হিসেবেই ইরান এই পাঁচ শর্ত উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি ছিল ‘সম্পূর্ণ একতরফা’ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জনে ব্যর্থ হওয়া লক্ষ্যগুলো আলোচনার মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টার উদ্দেশ্য নিয়ে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গত ১০ মে রোববার যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপরীতে পাকিস্তানের কাছে এই প্রস্তাব পাঠায় ইরান। তবে ট্রাম্প সেটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
১৪ দফা গ্রহণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পথ নেই: ইরানের স্পিকার
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংসদ স্পিকার বলেছেন, ইরানের জনগণের অধিকার, যা ১৪ দফা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া ছাড়া আমেরিকার অন্য কোনো পথ নেই। সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গলিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরানের জনগণের অধিকার, যা ১৪ দফা প্রস্তাবে এসেছে, তা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। অন্য যেকোনো নীতি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হবে এবং একের পর এক ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে। তারা যত বেশি বিলম্ব করবে, মার্কিন করদাতাদের তত বেশি অর্থ নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করতে হবে।
‘আঙুল ট্রিগারেই’, তবে মূল লক্ষ্য ‘টেকসই শান্তি’: ইরান
ইরান ‘আঙুল ট্রিগারে’ রাখলেও বর্তমানে দেশটির মূল মনোযোগ ‘টেকসই শান্তি ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতির’ ওপরই রয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি। গত মঙ্গলবার (১২ মে) সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। মোহাজেরানি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ৪০ দিন ধরে লড়াই করেছি এবং এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অপেক্ষায় ট্রিগার হাতে ধরে আছি।’ তিনি আরও বলেন, শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির দেখানো পথ অনুযায়ী সম্মান, প্রজ্ঞা ও উপযোগিতা এই তিন নীতি মেনেই ইরান তার কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রণক্ষেত্রের বিজয়কে কূটনৈতিক অঙ্গনেও ধরে রাখতে হবে
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুক্তিসঙ্গত, যৌক্তিক ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অগ্রাধিকার হলো কূটনীতির ক্ষেত্রেও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিজয়কে ধরে রাখতে হবে। পার্সটুডে জানিয়েছে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের পুলিশ বাহিনীর একদল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এই বাহিনীর প্রচেষ্টা, দিন-রাত সংগ্রাম এবং সততার প্রশংসা করে বলেন, সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব সত্ত্বেও ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর শক্তিশালী ও নিঃস্বার্থ উপস্থিতি ছিল। শত্রুকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ইরানি জাতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, শক্তিশালী ইরানি জাতি ও সশস্ত্র বাহিনী তাদের দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা দিয়ে শত্রুকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে বাধা দিতে এবং তাদের যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে ও যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছে।
শত্রুর নতুন আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া হবে: ইরানি কমান্ডার
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, শত্রুর পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের হুমকি, আক্রমণ বা আগ্রাসনের জবাব অবিলম্বে কঠোর ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া হবে। পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সর্দার রেজা তালায়ি নিক মঙ্গলবার বলেন, ‘আমেরিকা ও ইসরায়েলি শত্রুকে মাঠ বা কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই ইরানি জাতির বৈধ ও ন্যায্য অধিকার মেনে নিতে হবে। ইরানি জাতির যৌক্তিক, বৈধ ও অকাট্য অধিকার নিশ্চিত না করলে তারা যে সংকটে আটকে আছে, তা থেকে বের হতে পারবে না।’
প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরাইলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। একই দিনে মিনাব শহরের শারজাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক মিসাইল হামলায় ১৬৮ শিক্ষার্থী নিহত হয়। এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরান সরকার। এর প্রতিবাদে টানা ৩৯ দিনে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান। এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় গত ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর আরেক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প।