দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আধুনিকায়নে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
১৪ মে ২০২৬ ১০:০৯
॥ জামশেদ মেহদী ॥
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে গত ৪ মে। এর ৫-৬ দিন আগেও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশ সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করেন। বাংলাদেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বিজেপি এবং বিজেপিপন্থী গণমাধ্যমের একটি খাসলতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারী এক জনসভায় বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীরা (তার ভাষায়) খুব ভারতবিরোধিতা দেখায়। অথচ ওরা জানে না যে, বাংলাদেশকে শায়েস্তা করতে ভারতের ৩-৪ দিনও… (এখানে এসে তিনি একটু থামেন)। তারপর আবার বলেন, বাংলাদেশকে শায়েস্তা করতে ভারতের ৩-৪ মিনিটও লাগবে না। এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বাংলাদেশকে বিগত ৫৫ বছরে আর কেউ করেনি।
ড. ইউনূস সরকারের সময় ভারতের একশ্রেণির টেলিভিশন এবং পত্রপত্রিকা যখন-তখন বাংলাদেশকে দখল করে নেওয়ার হুমকি দিত। এর কারণ হলো, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ১৫ বছর ধরে ভারতের চরণতলে নৈবদ্য হিসেবে এটা-ওটা সুযোগ-সুবিধা অর্পণ করেছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সেই সরকার বাংলাদেশকে ভারতের গোলামির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে আনে। আর এর ফলে ভারতের যত আক্রোশ, সব গিয়ে পড়ে জুলাই বিপ্লব তথা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। এর মধ্যে ড. ইউনূস চীনে গিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে বিশাল বঙ্গোপসাগর। আর বঙ্গোপসাগরই খুলে দিতে পারে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়ক। বাংলাদেশ থেকে ভারতের ৭ রাজ্য এবং চীনের কুনমিং পর্যন্ত হতে পারে উন্নয়নের এই মহাসড়ক। ড. ইউনূসের এই বক্তব্যে ছিলো না কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ছিলো না কোনো সামরিক উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারত তার স্বভাবসুলভ পথে এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আবিষ্কার করে। তাদের মিডিয়া বলে যে, সেভেন সিস্টার্স দিয়ে চীনের কুনমিংয়ে যাওয়াটা একটা বাহানা। আসলে তিনি চীনের নজর ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেকের দিকে আকর্ষণ করছেন।
ভারতের পত্র-পত্রিকায় এবং একশ্রেণির টেলিভিশনে বলা হয় যে, চিকেন নেকের প্রতিরক্ষা এখন আর আগের মতো দুর্বল নেই। আর এই ভারতও ১৯৬২ সালের ভারত নয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৬২ সালে চীন ভারত আক্রমণ করেছিলো এবং অরুণাচল দখল করেছিলো। ১৯৬২ সালেই তারা কাশ্মীরের আকসাই চীন দখল করে, যেটি তার আগ পর্যন্ত ভারতের অধীনে ছিলো। এখন কাশ্মীর বর্তমানে ৩ ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীর। অন্য ভাগে ভারতের কাশ্মীর ও লাদাখ এবং অন্য ভাগে আকসাই চীন।
ভারতের দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হয় যে, চিকেন নেকের প্রতিরক্ষার জন্য সেখানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সর্বাধুনিক ফরাসি জঙ্গিবিমান রাফালের স্কোয়াড্রন মজুদ রয়েছে। আরো রয়েছে স্বল্প ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। বাংলাদেশকে সাবধান করে দিয়ে ভারতের ঐ প্রভাবশালী মহল থেকে বলা হয় যে, ভারতের যেমন দুর্বল স্থান হলো চিকেন নেক, তেমনি বাংলাদেশেরও রয়েছে একটি চিকেন নেক। এটি বাংলাদেশের দুর্বলতম স্থান। আর সেটি হলো, ফেনী করিডোর। বাংলাদেশ যদি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে ভারত মুহূর্তের মধ্যেই ফেনী কেটে দেবে। সেক্ষেত্রে ফেনী, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
এই ধরনের হুমকি ধামকি তারা যখন-তখন বাংলাদেশকে দিয়ে থাকে। এমনকি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধেও সরকারি বাহিনীর গোলা বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে এসে পড়ে। এর ফলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ২ জন নাগরিক নিহতও হয়েছেন। দেখা যায় যে, মিয়ানমারও বাংলাদেশকে ভয় পায় না। এর কারণ হলো, বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ হলেও সেই মোতাবেক তার সামরিক শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তি সম্পর্কে দুটি সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া যায়। এগুলোর একটি হলো ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার’। আর একটি হলো লন্ডনের ‘মিলিটারি ব্যালান্স’ ম্যাগাজিন। এই ম্যাগাজিনটি প্রকাশ করে লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)।
বাংলাদেশের সামরিক শক্তি সম্পর্কে ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারে’ বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার। মোট বিমান দেখানো হয়েছে ২১২টি। তবে এর মধ্যে জঙ্গিবিমান কয়টি, সেটি দেখানো হয়নি। ট্যাংক রয়েছে ৩২০টি। নৌযান রয়েছে ১২১টি। সাবমেরিন ২টি এবং ফ্রিগেট ৭টি।
কিন্তু লন্ডনের মিলিটারি ব্যালান্সের তথ্য কিছুটা ভিন্ন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ; বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এই মিলিটারি ব্যালান্সের তথ্যের ওপরেই বেশি নির্ভর করেন। মিলিটারি ব্যালান্সের তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশের সামরিক শক্তি নিম্নরূপÑ সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৩২ হাজার ১৫০। নৌবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ২৭ হাজার ৫০০। বিমানবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১৪ হাজার।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারকে উপহার হিসেবে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ২৮টি ট্যাংক দিয়েছিলেন। এগুলো এখন আর সচল নাই বলেই জানা যায়। বাংলাদেশের ট্যাংকগুলো সাধারণত চীনের পুরোনো টাইপ ৫৯ এর আধুনিক সংস্করণ। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব দক্ষতায় এগুলোকে আরো আপগ্রেড করে ‘দুর্জয়’ নাম দিয়েছে। আধুনিক ট্যাংকের মধ্যে রয়েছে এমবিটি-২০০০।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল হলো বিমানবাহিনী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ১ স্কোয়াড্রন মিগ-২১ জঙ্গিবিমান আমদানি করা হয়। মুজিব সরকারের পতনের পর শহীদ জিয়ার সরকারের আমলে সামগ্রিকভাবে বিদেশনীতি এবং বিশেষভাবে প্রতিরক্ষানীতি চীনমুখী হয়। তদসত্ত্বেও বিমানবাহিনীতে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬) রাশিয়া থেকে ১ স্কোয়াড্রন মিগ-২৯ বিমান আমদানি করা হয়। এখন এই স্কোয়াড্রনের অধিকাংশ বিমানই নাকি গ্রাউন্ডেড।
বিমানবাহিনীর বর্তমান অবস্থা হলো এই যে, আমাদের বিমান বহরে রয়েছে এফ-৭ জঙ্গিবিমান। এটি সোভিয়েত মিগ-২১ জঙ্গিবিমানের চীনা সংস্করণ। ড. ইউনূসের আমলে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজে যে জঙ্গিবিমানটি ক্র্যাশ করে, সেটি ছিলো এই এফ-৭। আগেই বলেছি যে, এফ-৭ হলো সোভিয়েত মিগ-২১ এর চীনা সংস্করণ। এই মিগ-২১ আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধকালে। তখন ভারতীয় মিগ-২১ বাংলাদেশের আকাশ দিয়ে অবাধে বিচরণ করেছে এবং বঙ্গভবন এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় বোমা বর্ষণ করেছে। তখন পাকিস্তানের জঙ্গিবিমান স্যাবর এফ-৮৬ জঙ্গিবিমান মিগ-২১কে তাড়া করেছে। এই দৃশ্য দেখে বিবিসির সংবাদদাতা মন্তব্য করেছিলেন যে, একটি মোটর গাড়িকে (মিগ-২১) একটি বেবি ট্যাক্সি (এফ-৮৬) তাড়া করছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এই দুর্বল অবস্থা দেখে ড. ইউনূস আমাদের বিমানবাহিনীকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গত বছর পাক-ভারত স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে পাকিস্তানের চীনা জঙ্গিবিমান জে-১০সি সর্বাধুনিক ভারতীয় জঙ্গিবিমান রাফালকে ভূপাতিত করেছিলো। আর চীন পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে নির্মিত জে-১৭ থান্ডার ভারতের রুশ জঙ্গিবিমান মিগ-২৯ এবং এসইউ-৩০কে ভূপাতিত করেছিলো।
চীনা জঙ্গিবিমানের এই প্রশংসনীয় পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ২০টি চীনা জে-১০সি এবং ২০টি পাকিস্তানি জে-১৭ থান্ডার জঙ্গিবিমান সংগ্রহের চেষ্টা করে। এছাড়া চীনের আধুনিক রাডার এবং মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহেরও সিদ্ধান্ত হয়। বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তান এবং চীনের সাথে আমাদের বিমানবাহিনীর বিশেষজ্ঞদের আলাপ-আলোচনাও চলছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়।
আরো খবর প্রকাশিত হয় যে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে লালমনিরহাটে ব্রিটিশ আমলে যে এয়ার স্ট্রিপ ছিলো, সেটিকে এখন পূর্ণাঙ্গ এবং বিশাল বিমানবন্দরে রূপ দেওয়া হবে। এ বিমানবন্দরের একটি অংশ হবে সিভিল এভিয়েশনের বিমান ওঠানামার জন্য। আর একটি অংশ হবে বিমানবাহিনীর জঙ্গিবিমানের ঘাটি হিসেবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউনূস সরকার বিদায় নিয়েছে। এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং লালমনিরহাট বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তের কী হলো, সেটি পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়নি। আর সামরিক বাহিনীর সমরাস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি সবসময় পাবলিকলি জানানো হয় না। তাই বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে কী করছে বা না করছে, সেটি নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন তুলছি না। তবে জনগণ ড. ইউনূসের সিদ্ধান্তকে বিপুলভাবে স্বাগত জানিয়েছিলো, এটুকু বলা যায়।
এ প্রসঙ্গে আমরা প্রতিবেশী মিয়ানমার এবং পাকিস্তানের সামরিক শক্তির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি। সূত্র ঐ একই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জনবল ২ থেকে ২.৫ লাখ বলে দাবি করা হয়। তাদের ট্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে টি-৭২, টি-৬৯, টি-৫৯ এবং পিটি-৭৬। তাদের বিমানবাহিনী বাংলাদেশের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
তাদের বিমানবাহিনীতে রয়েছে মিগ-২৯, জেএফ-১৭ থান্ডার, ইয়াক-১৩০ প্রভৃতি। তাদের নৌবহরে রয়েছে একটি ভারতীয় এবং চীনা সাবমেরিন। এছাড়া রয়েছে ফ্রিগেট।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলেও বিগত ৫৫ বছরে পাকিস্তান বিপুল সামরিক শক্তি অর্জন করেছে। এর মধ্যে তারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও আনবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সেনাবাহিনীতে রয়েছে সাড়ে ৬ লাখ সৈন্য। ট্যাংকের সংখ্যা ২ হাজার। বিমানবাহিনীতে রয়েছে মার্কিন এফ-১৬, চীনা জে-১০সি, ফরাসি মিরাজ-৩ এবং জেএফ-১৭ থান্ডার। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, অতি সম্প্রতি পাকিস্তান চীন থেকে ৪০টি চীনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন জঙ্গিবিমান জে-৩৫ স্টেলথ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনের জে-৩৫ আমেরিকার সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এফ-৩৫ জঙ্গিবিমানের সমতুল্য। এগুলোর সবগুলোই মাল্টিরোল ফাইটার এয়ারক্রাফট।
ভারতের সামরিক শক্তি এখানে উল্লেখ করলাম না। কারণ ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তি। তার ওপরে রয়েছে রাশিয়া, চীন ও আমেরিকা।
ওপরের এই আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং যৌক্তিক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী হওয়া এখন সময়ের দাবি।
E-mail:jamshedmehdi15@gmail.com