‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হাম, ইঙ্গিত দিচ্ছে মহামারির

মৃত্যু ও আক্রান্ত অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে প্রাণ হারিয়েছে ৩১৭, আক্রান্ত ৪৩ সহস্রাধিক


৬ মে ২০২৬ ১৮:২১

স্টাফ রিপোর্টার : একদিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১৭ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে গত ৪ মে সোমবার। তার একদিন পর আরও ৬ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ দুই দিনেই প্রাণ গেল ২৩ শিশুর। প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর দিচ্ছে। নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে হাজারের বেশি শিশু। গত মার্চে হামের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর মৃত্যুহীন দিন যাচ্ছে না বললেই চলে। কোনো কোনো দিনের আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাসপাতালগুলোয় এখন হাম রোগীতে ভর্তি। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে শিশুদের এই রোগটি। গত ৫ মে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বার্তা বলছে, গত ৪ মে সোমবার সকাল ৮টা থেকে ৫ মে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে ২৫৯ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে; একই সময় ১ হাজার ১৮৬ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসে; যাদের মধ্যে ৯৮৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। এছাড়া সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে ২৬৩ জন মারা গেছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১২৭ জন ঢাকায় মারা গেছে; আর ৭১ জন রাজশাহী বিভাগের। গেল ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪১৭ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোয়। আর সবচেয়ে কম ৫ জন ভর্তি হয় রংপুরে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৭৯ জন। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৭২৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হলেও এক অর্থে মহামারি হিসেবে বর্তমান বাস্তবতাকে বর্ণনা করতে চান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। এ অবস্থায় গত মাসের শুরুতে বৈঠকে বসে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন (এনভিসি)। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত এই কমিটির কাজ হচ্ছে দেশের হাম-রুবেলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিশনকে অবহিত করা। কারো উপসর্গ দেখা দিলেই আইসোলেশনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরপরই বৈঠক করে টিকাবিষয়ক দেশের সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ)। এনভিসির সুপারিশের সঙ্গে নাইট্যাগ একমত প্রকাশ করে। সেইসঙ্গে আরেক সুপারিশে তারা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের তাগিদ দেয়। সম্প্রতি সেই কমিটি গঠন করা হলেও তা ‘কার্যকর’ হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের দেশে গ্রামের অনেক মানুষ আছে, যারা আইসোলেশন সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না; একটু লক্ষণ দেখা দিলেই হাসপাতালে চলে আসছেন। তাই প্রতিটি হাসপাতালের মধ্যে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার নির্দেশনা দিয়েছি। ‘এমনিতে দেশের যে ঘনবসতি, তাতে কোনো শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে আলাদা রাখতে হবে। এসব কথা ওয়ান টু ওয়ান বলা কঠিন। তবে সেবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টাই করছি।’
এদিকে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চলার মধ্যে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) প্রধানকেই সরিয়ে (ওএসডি) দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্তরে জনবল ঘাটতি থাকা ও এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানামুখী জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আর প্রাদুর্ভাব হয়ে দেখা দেওয়া রোগটি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতা বাস্তবে এক ধরনের মহামারিরই ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে আরো আগেই ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করা দরকার ছিল, কিন্তু সরকার সেটি করেনি। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগটি নিয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ শুরু করে। এর মধ্যে হাম ও উপসর্গ নিয়ে প্রায় তিনশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত ২০ বছরে হামে এতো মৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ। ডব্লিউএইচওর তথ্যানুসারে, ২০০৫ সালে ২৫ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১০০ জনের বেশি শিশু মারা গিয়েছিল। এরপর আর এত বেশি শিশু আক্রান্ত বা মৃত্যু কোনো বছরই হয়নি। ইপিআই কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্যবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন, বিগত বছরগুলোয় পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান না করানো ও অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এ প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর অতীতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর ২০২৪ সালে তা হয়নি। এর আগে ২০২০ সালে কোভিডের কারণে ওই বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। আর অস্থিরতার সময়ে ২০২৪ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও সেভাবে পরিচালিত হয়নি।