সম্পাদকীয়

যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই : মানবতার বিজয় আসবেই


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৭

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার সাফল্য কামনা করছে সারা বিশ্বের মানুষ। কারণ তারা চায় পৃথিবী হবে শান্তির নীড়। কোনো যুদ্ধ থাকবে না। এটাই প্রত্যেকের মানবিক কামনা। কিন্তু না, এমন সরল ভাবনায় এ গোলাকার পৃথিবীর সবকিছু আবর্তিত হয় না। কারণ পৃথিবীর মাটিতে মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম আ. ও মা হাওয়া আ.-এর সাথে আরো একজনকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পাঠিয়েছেন। সাথে সাথে তিনি ঘোষণা করেছেন, সেই তৃতীয়জন অর্থাৎ শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। তাছাড়া মানুষের নফস বা আত্মার মাঝে বসবাস করে লোভ, লালসা, কাম, ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ এসব ষড়রিপু। এই সাতটি অপশক্তির সাথে মানুষকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই অর্থে আমরা সবাই যোদ্ধা। যারা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হন, তাদের মর্যাদার কথা দার্শনিকরা প্রত্যেকেই গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন।
মাঝে মাঝেই পৃথিবীর রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষের ভেতরের চলমান যুদ্ধ আর ভেতরে থাক না। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তখন মানবসভ্যতা পড়ে হুমকিতে। পৃথিবীর শান্তি নষ্ট হয়। যুদ্ধের বিভীষিকায় হারিয়ে যায় মানবতা। সেই মানবতা ফেরাতে মানবতার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইহুদি জাতির উগ্র অংশ জায়নবাদী গোষ্ঠী যুগে যুগে মানব জাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘তারাই একমাত্র পৃৃথিবী শাসন করার অধিকারী’। তাদের এমন মিথ্যা ও অলীক অহমিকার কারণে পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ বারবার তাদের নিশানার শিকার হয়েছে। এমন উগ্র আগ্রাসী আচরণের কারণে পৃথিবীর কোথাও ইহুদিরা কার্যত কোনো রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি। তাদের নিজস্ব বলে কোনো ভূখণ্ড নেই। পৃথিবীর হৃদয় হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ ভূমি ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্র মুসলমানদের বাস্তুচ্যুত করে তারা তাদের কথিত মিত্র ব্রিটিশ আমেরিকার সহযোগিতায় গঠন করেছে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল।
এ ইতিহাস কারো অজানা নয়, এ জারজ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে তারা প্রায় এক শতাব্দী ধরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্ত করে রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ ইরানের ওপর আমেরিকাকে সাথে নিয়ে সম্প্রতি হামলা করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নীলনকশার অংশ হিসেবে বসতি শুধু ফাঁকা বা জনবসতিহীন এলাকায় নয়, বরং অধিকৃত পশ্চিমতীরের বিভিন্ন স্থানে; এমনকি ফিলিস্তিনি শহরের আওতাধীন তথাকথিত ‘এরিয়া এ’-তেও গড়ে তোলা হতে পারে, যেখানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের। ইসরাইলি গণমাধ্যমের বরাতে ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রশাসনের অনুরোধে এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। এটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হলেও ২০২২ সালে গৃহীত ইসরাইলি জোট সরকারের কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে পুরো পশ্চিমতীর সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইসরাইলের বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকে মোট ১০৩টি নতুন বসতির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ২৭১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট পাস করেছে ইসরাইলি পার্লামেন্ট। বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার রাখা হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিমতীরের বসতি স্থাপন প্রকল্প। কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই বাজেটের মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন শেকেল বরাদ্দ পেয়েছেন, যা দিয়ে ফিলিস্তিনি জমিতে ইহুদিদের জন্য বসতি ও নতুন আউটপোস্ট তৈরি করা হবে। স্মোট্রিচ জানিয়েছেন, এই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া। বাজেটের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, পশ্চিমতীরের নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়নের নতুন ছক আঁকা হয়েছে। অবৈধ বসতিগুলোর সুরক্ষায় ড্রোনের ব্যবহার ও সশস্ত্র বেসামরিক নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া ফিলিস্তিনি শহরগুলোকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে নির্মাণ করা হচ্ছে বিশেষ বাইপাস সড়ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ বাজেট নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পিত ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’। গত কয়েক বছরে পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এর ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করছে।
আমরা মনে করি, একটি অবৈধ উগ্র গোষ্ঠীকে আসকারা দিয়ে আমেরিকা শুধু ইরান নয়, গোটা বিশ্বকেই হুমকির মধ্যে ফেলেছে। এ হুমকি থেকে আমেরিকা নিজেও মুক্ত নয়। আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বের মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে। ইসরাইলের জনগণের একটি বড় অংশও যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তারা ব্যানার-প্লাকার্ড হাতে রাজপথে নেমে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানাচ্ছে। ইসলামাবাদের আলোচনা প্রাথমিকভাবে ভেঙে গেলেও আমরা আশাহত নই।
আমরা আশা করি, জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, আরব লীগসহ বিশ্বের প্রত্যেকটি মানবাধিকার সংগঠন এবং শান্তির পক্ষের মানুষের প্রচেষ্টায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশনিসংকেত হিসেবে চলমান এ যুদ্ধ বন্ধ হবে। বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে। জায়নবাদী উগ্র অপশক্তি ইসরাইল ধ্বংস হবে। মানবতার বিজয় আসবেই।