সম্পাদকীয়

ঈদযাত্রা হরিষে বিষাদ : জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে


২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:১৯

ঈদ আনন্দ প্রতি বছরের মতো এবার অনেকের জীবনে এসেছে হরিষে বিষাদ হয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত বছর অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের চেয়ে এবার ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বেড়েছে। যদিও জনগণের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকারের আমলে তাদের ঈদযাত্রা হবে আরো স্বস্তির। কিন্তু না, তাদের সেই আশার গুড়েবালি। বিশৃঙ্খলা, যানজট, বাড়তি ভাড়া, দুর্ঘটনা আর চাঁদাবাজির কারণে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার সময় এবং জীবিকার প্রয়োজনে কর্মক্ষেত্রে ফেরাÑ কোনোটাই স্বস্তির হয়নি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে ব্যাপক দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ। গত ১৭ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৮ দিনে এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এ সময়ে মোট ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে ঈদযাত্রা এখনো চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঈদের পরদিনই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওইদিনেই নিহত হন ২৮ জন। ঈদের দিন প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ রয়েছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উদ্বেগজনক। নিহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে কুমিল্লায়। ঈদের দিন গভীর রাতে নগরীর পদুয়ার বাজার লেভেক্রসিং এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস ট্রেনের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত হন।
আমাদের প্রশ্নÑ প্রতি বছরই কেন এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শত শত মানুষ জীবন দিচ্ছে, পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? ২০২২ সালে ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭২টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৪৪৩ জন নিহত এবং ৮৬৮ জন আহত হন। ১৬৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত হন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২২ সালে ঈদুল আজহায় ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৪০ জন নিহত এবং আহত হন ৭৯১ জন। ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ১৩১ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের ৩৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।
২০২৩ সালে ঈদুল ফিতরে দেশে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হন। ১৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৬৭, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে ঈদুল আজহায় ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৩৪০ জন নিহত এবং ৫৬৯ জন আহত হন। ৯১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৯৪ জন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ঈদুল ফিতরে ৪১৯টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ১ হাজার ৪২৪ জন আহত হন। সেবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে ছিল মোটরসাইকেল, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। ২০২৪ সালে ঈদুল আজহায় ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৬ জন নিহত ও ৭৬২ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত এবং ৮৩৫ জন আহত হন। সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে মোটরসাইকেল ঘিরে। ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে ১৩৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫১ জন নিহত হন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ। ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় সারা দেশে ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৯০ জন ও আহত হন ১ হাজার ১৮২ জন। ১৩৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪৭ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
বাড়তি ভাড়া মেটাতে না পেরে অনেক কর্মজীবী ঈদ আনন্দে শামিল হতে বাড়ি ফিরতে পারেননি। প্রিয়জনের সান্নিধ্য বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা মনে করি, বিষয়টির একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান প্রয়োজন। মালিক সমিতির দাবি, ঈদের সময় তাদের একমুখী যাত্রী বেশি। দ্বিগুণ, তিনগুণ নয়, খরচ উঠে এমনভাবে নির্ধারণ করে মনিটরিং করতে হবে। ঈদের পর যেন সেই ধারাবাহিকতা না থাকে, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কম বেতনের কর্মী; বিশেষ করে পোশাকশিল্পের সাথে জড়িত নারীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা মালিকদের পক্ষ থেকে করতে হবে।
আমরা জানি, সড়কে দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি, চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা। এককথায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যর্থতা। ব্যর্থতার জন্য দায়ীরা বারবার পার পেয়ে যায় বলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতি আনন্দ আয়োজনই আমাদের হরিষে বিষাদে পরিণত হয়।
আমরা মনে করি, এ সমস্যা সমাধানে সড়ক ও পরিবহনের ধরন অনুযায়ী গতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।