আলোকে তিমিরে

ঐক্য ও অনৈক্যের মিউজিক্যাল চেয়ার


২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৫

॥ মাহবুবুল হক ॥
দেশের অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে পাকিস্তানের কথা মনে পড়ে। পাকিস্তানের স্থপতি স্বাধীনতার আগে যে স্লোগান তৈরি করেছিলেন, তা ছিল ঐক্য, ঈমান ও শৃঙ্খলা। ঐক্য শব্দটি প্রথমে দেয়ায় এ নিয়ে কিছু তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। আবেগপন্থীরা দাবি করেছিলেন, প্রথমে ঈমান শব্দটি আনতে হবে, তারপর ঐক্য ও শৃঙ্খলা। তাদের ধারণা ছিল, ঈমান আসলেই বা ঈমান অর্জিত হলেই বা যারা ঈমানের মধ্যে আছে, তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলেই ধীরে ধীরে অন্যসব গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু জিন্নাহ সাহেব এ চিন্তার সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করেননি। তিনি আলেমদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন, আলেমগণ ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখলেন, হিজরত করে রাসূল (সা.) মদিনায় আসার পর ঐক্যের কথাই তো প্রথমে বলেছিলেন। তিনি তো মদিনার জনগণকে প্রথমে পৃথক করতে চাননি। শুধু প্রথমে কেন, তিনি তো বরাবরই ঐক্যের কথাই বেশি বলেছেন। এমনকি মদিনায় তিনি যে রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, সেটাও তো ছিল ঐক্যগত রাষ্ট্র, ধর্মগত রাষ্ট্র ছিল না। এমনকি সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু প্রশ্নটিও কখনো উত্থাপিত হয়নি। ৪২টি গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করে রাসূল (সা.) যে রাষ্ট্রের প্রধান হলেন, সেই রাষ্ট্রটিও সংখ্যার দিক থেকে মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র ছিল না। অধিকাংশ গোত্রকে শামিল করে মদিনার রাষ্ট্রটি গঠন করা হয়েছিল। এসব তথ্য পেয়ে তদানীন্তন আলেমগণ জিন্নাহর চিন্তাধারাকে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তীতে এ বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা কখনো ওঠেনি।
যেকোনো রাষ্ট্র গঠন করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় ঐক্যের। সেই ঐক্য যে শতকরা ১০০ ভাগ হয়Ñ এমন তো পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় না। সাধারণত দেখা যায়, মেজরিটিরাই রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। নানা আদর্শ, নানা মতামত, নানা ধর্ম ও উপধর্মের লোকেরা সেখানে শামিল থেকেছে। স্থান-কাল ভেদে এ বিষয়টিও নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এখনকার যুগে যেমন আর্থিক নিরাপত্তাই প্রধানতম কারণ হিসেবে সমুপস্থিত। বিশ্বব্যাপী যে মাইগ্রেশন চলছে, তা থেকেই বিষয়টি সবার সামনে স্পষ্ট। যুগে যুগে, কালে কালে প্রয়োজনে এর বিভিন্ন রূপ আমরা দেখেছি। কখনো জীবনের নিরাপত্তা, কখনো আদর্শ বা ধর্মের নিরাপত্তা, কখনো নারীদের নিরাপত্তা, কখনো আবাসের নিরাপত্তা, কখনো স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা এভাবেই চলে আসছে মানুষের রাষ্ট্র সম্পর্কিত পরিক্রমা।
এরও আবার ব্যতিক্রম আছে। আদিবাসী বিশ্বে আমরা দেখেছি, কিছু আদিবাসী বর্তমানকে নয়, অতীতকে ধারণ ও বাহন করে ভূমিপুত্র হিসেবে সকল ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করে নিজের মাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার তীব্র প্রচেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সন্তান জন্মদান করে নিজেদের শক্তি ও সম্পদ বাড়াতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। মানুষ সাধারণত কমফোর্ট চায়, কম পরিশ্রম চায়, আরাম-আয়েশ চায়- এটাই আধুনিকতা, এটাই আবার উত্তর আধুনিকতা। সে কারণে ভূমিপুত্রের সংজ্ঞা বিস্তারিত হতে পারেনি। ধর্ম বা আদর্শ সবসময় মানুষকে নিজস্ব বাউন্ডারিতে আবদ্ধ রাখতে পারেনি।
আমরা ঐক্যের কথায় ছিলাম। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষটি রাষ্ট্র গঠনের সময় ধর্মের কথা উচ্চকিত করেননি। উচ্চকিত করেছেন ঐক্যের বিষয়কে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ঐক্যই মানবতাকে মুক্তি দিতে পারে। কারণ ঐক্যের মধ্যেই মানবতার গুণাবলি ধীরে ধীরে চুম্বকের মতো বা মৌমাছির চাকের মতো সংঘবদ্ধ হয়। ঐক্যের মধ্যে সংযুক্ত হয় সহনশীলতা, বড়ত্ব, উদারতা, মহত্ত, সুখে সুখী হওয়া, দুঃখে দুখী হওয়া, মমত্ববোধ, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব। এ পর্যায়ে এসে লিখতে গিয়ে হাসি পাচ্ছে। কেন জানেন, ডিকশনারি খুলে যত ভালো গুণের শব্দ পাবেন, তা দেখা যাবে বক্ষমান এই ঐক্যের মধ্যে। অনৈক্যের মধ্যে কোনো গুণই যেন খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঐক্যের মধ্যে দুনিয়ার সব গুণ বিরাজিত এবং আরো একটু আগ বাড়িয়ে যদি বলি, তাহলে সৃষ্টির বিষয়ে মহান আল্লাহর যত গুণ আমরা জেনেছি, বুঝেছি, শিখেছি সবই তো ঐক্যের মধ্য বা একতার মধ্যে।
মহান আল্লাহর সৃষ্টিতে আমরা তো ঐক্যই দেখি। মহান আল্লাহ কোনো বনে শুধু সিংহের জন্য অবস্থান তৈরি করেননি। সেখানে অন্য পশুদেরও অবস্থান রয়েছে। পশু তো দূরে থাক, পাখিসহ কীট-পতঙ্গ, সবকিছুই তো একসাথে বসবাস করে। আমাদের সুন্দরবনে হিংস্র বাঘ আছে বলে কি নিরীহ, বিনয়ী, ভীতু পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ সেখানে বসবাস করে না? আমরা সবাই জানি, সেখানে কাছে-দূরে সবকিছু বসবাস করে। এটাই ঐক্য। পাহাড়-পর্বত যেখানে আছে, সেখানে কি অন্য সৃষ্টি বসবাস করে না? সমুদ্রে কি একই সৃষ্টি বসবাস করে? সহজেই জবাব আসবে না। আমরা যদি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে দাঁড়াই, তাহলে শত শত রকম ও রঙের মানুষ মুহূর্তেই দেখতে পাই। এরা কিন্তু একসাথে বসবাস করে। তাদের মধ্যে বাহ্যত কোনো কিছুরই তো সমতা দেখা যায় না। নানা রকম অসমতা বিদ্যমান থাকে। কিন্তু তারা সবাই এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে। সবাই কিছু নীতি-নৈতিকতা উদযাপন বা পালন করে। এর মধ্যে ব্যত্যয় থাকে না, এমন নয়। সেটা পারসেন্টেজের ব্যাপার। মন্দ তো কিছু থাকবেই। আমরা যখন বলি, ভালো-মন্দ বাজার করেছি। তার মানে এই নয় যে, মন্দ বা খারাপ কিছু আমরা ক্রয় করেছি। এর অর্থ হলো- কম গুণের কিছু খাদ্য ক্রয় করেছি। এই তো এসে গেল আবার গুণের কথা। গুণের সমাদর করে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন করা হয় না। গুণ, বে-গুণ সব ধরনের মানুষ নিয়েই সংসার, সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠিত হয়।
সহজভাবে বুঝতে হলে বা সাধারণভাবে বুঝতে হলে পরিবারের দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। একটি পরিবারে সাধারণত সকল সদস্য একই আদর্শে বা একই মতবাদে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ধর্ম ও আদর্শ নিয়ে বসবাস করে না। তাই বলে কি সংসারটা সবক্ষেত্রেই টিকে থাকে না? এমন তো সাধারণত হয় না যে, পিতা বা মাতার ইন্তেকাল হলে সবকিছু একসাথে ভেঙে যায়। পরিবারের একটা লেগাসি থেকেই যায়। কেউ হয়তো শহরে অবস্থান করে। কেউ গ্রামে, কেউ বিদেশে, তারপরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা ঐক্যতান খুঁজে পাই। বিভিন্ন আদর্শ নিয়ে এখন আমাদের দেশে বহু পরিবার টিকে আছে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো- আমাদের রক্তের মধ্যে একটা ঐক্যের আবেগ আছে। একটা বাস্তবতা আছে। একটা টান আছে। অনৈক্য থেকে ঐক্যের সৃষ্টি কম হয় এবং সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে বা বিবর্তনের সাথে সাথে ঐক্য থেকে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। কোনো পরিবারের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ময়-মুরুব্বি উন্নত আদর্শের বাণীবাহক হলে এর পরম্পরা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। এজন্যই মানবজীবনে পরিবারের গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক সময় বলি, পুরনো বংশ, উঁচু বংশ, বনিয়াদি ফ্যামিলি, বনেদি ফ্যামিলি ইত্যাদির অর্থই হলো অতীতে তাদের একটা ঐশ্চর্য ছিল। তাদের অতীত সমুজ্জ্বল ছিল। কালের অনিবার্য ঢেউয়ে তা একেবারে ক্ষয়ে যায়নি। এ পরিবারের কিছু লোক নিশ্চয়ই কোনো মহৎ কারণে পরিবারটিকে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এ ধরনের চেষ্টা যদি অহংকার বা বাড়াবাড়িমুক্ত হয় অর্থাৎ সচেতন হয়, তাহলে এর লেগাসি যুগের পর যুগ গতিময় থাকতে পারে বলে এড়াতে চাচ্ছি না। সত্যিকার অর্থে আমরা যদি আমাদের সমাজ বিক্ষণে যাই, তাহলে খুব স্পষ্টভাবে আমরা দেখতে পাব ধর্মপ্রচারক, পীর-মুর্শিদ, মানবদরদি জমিদার, তালুকদার, জোতদার এসব ফ্যামিলির সর্বাংশে ধ্বংস হয়ে গেছেÑ এমন তো আমরা দেখি না। আর্থিকভাবে নানা কারণে দুর্বল হলেও এদের অবশিষ্টাংশ প্রায় সবক্ষেত্রে কিছুটা সম্মানের সাথে এখনো টিকে আছে। এর সবই হলো ঐক্য। ঐক্যের তান, সুর, আবেগ এবং মর্মবাণী এখনো পৃথিবীকে আবেগময় করে রেখেছে।
২০২৪-এ যে বিপ্লব হলো, এটাকে আমরা নানাভাবে পর্যালোচনা করেছি, বিশ্লেষণ করেছি। এ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ মোটাদাগে দুভাবে এসেছে। এক সেক্যুলারভাবে, আরেক ইসলামী পরম্পরাভাবে। সেক্যুলাররা বলেছেন, এটা প্রকৃতির একটা অনিবার্য বিস্ফোরণ। মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় এবং দেয়াল যখন ভেঙে পড়ে না। অত্যাচার, অবিচার, জুলুম-নির্যাতন থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মানুষের সামনে-পেছনে বা বামে-ডানে কোনো অবলম্বন থাকে না, তখন বাঁচার জন্য মানুষ বিস্ফোরণ ঘটায়। ১৭ বছরের গুম-খুন, হত্যা-নির্যাতনে মানুষ এতটাই অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল যে, প্রতিবাদের জন্য সংসার ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীসহ শিক্ষার্থীরা। তাদের পিছু পিছু অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট হয়েছে বড় ভাই-বোন, মাতা-পিতাসহ লাখ লাখ পরিবার। ইসলামপন্থীরা নিজেরা জুলুম থেকে বাঁচার ও বাঁচানোর জন্য একের পর এক সংগ্রামের সিঁড়ি ভাঙছিল। শত শত শিক্ষার্থী শাহাদাতবরণ করছিল। বিপ্লব থেকে কিছু কিছু মানুষ সরে পড়তেও চেয়েছিল। কিন্তু ইসলামিস্টরা এ বিপ্লবকে জিহাদ হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী মজলুমদের বাঁচানোর জন্য তারা জিহাদ থেকে হাত গুটাতে চায়নি। তারা অগ্রসর হয়েছে শার্দূলের মতো। তারা পিছপা তো হতেই চাইনি, বরং ফজহাদে অংশগ্রহণের জন্য দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাদের কেউ পেছনের দিকে তাকায়নি। অনেকটা হঠাৎ করেই তারা নিজেদের সূরা ফিলের অংশীদার হিসেবে দেখতে পেল। তাদের মনে সূরা ফিলের উদ্যমতা তারা নিজেরাই অনুভব করতে থাকল। শিক্ষার্থীরা ভাবছিল তারা তো ছোট, তাদের কাছে তো কোনো অস্ত্র নেই। ছোট্ট পাখির মুখে ছোট্ট ছোট্ট পাথর দিয়ে আবরাহার হস্তি বাহিনীকে আল্লাহ তায়ালা তাদের চিবানো ঘাসের মতো করে দিয়েছিলেন।
এটাই ছিল মহান আল্লাহর সরাসরি সাহায্য। যে কথা উত্তর-আধুনিক যুগে বলা যায় না, অথচ না বললেও নয়, তাহলে দেশময় এত বিপ্লবী এলো কোথা থেকে? সারা দেশের সব রাস্তাতেই তো ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বড় বড় ঢেউ- সবার হাতেই ছোট ছোট ইটের টুকরো! শত শত আগ্নেয়াস্ত্রের বিপরীতে ইটের টুকরো! ফুটন্ত ফুলের মতো তাজা তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে, অল্পসংখ্যক বিপ্লবী তাদের সামলাচ্ছে, বাকিরা আল্লাহু আকবর বলে এগোচ্ছে এবং লুটিয়ে পড়ছে। কী এক অলৌকিক দৃশ্য। কে দেখেনি সেই দৃশ্য? সেদিন অনেকেই বলেছেন, বদরসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধের পূর্বে মহান আল্লাহ তো রাসূল (সা.)-কে বলেছেন, আমি ফেরেশতা পাঠিয়ে তোমাদের সাহায্য করব, ইতিহাস সাক্ষী, মহান আল্লাহ তাঁর কথা রেখেছেন, তাঁর ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। বাংলাদেশে শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ গত ১৬ বছর যে অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতন হয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, তা কি অতীতের জুলুম-অত্যাচারের চেয়ে কোনো অংশে কম? নিশ্চয়ই নয়। পিচঢালা কালো রাস্তা কিশোর-তরুণের রক্তে লালে লাল হয়ে গেছে, সে অবস্থায় আল্লাহর সাহায্য আসেনি, তা কি ভাবা যায়? মহান আল্লাহ তো মজলুমের সাহায্যকারী ও বন্ধু। তাঁর রহমত ও নিয়ামতের সুন্নত সবকালে এবং সর্বযুগে সমান।
অন্যায় ও অসম যুদ্ধের মধ্যে এ ধরনের কথাই আমরা শুনেছি দেশের প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ-মান্যবরদের কাছ থেকে। শুধু তাই নয়, বিজয়ের অনেক পর পর্যন্ত একই ধরনের কথাবার্তা আমরা শুনেছি এবং প্রদীপ্ত হয়েছি। পরে জানি না কী কারণে যেন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ ধরনের আলোচনা ধীরে ধীরে বিলুপ্তের পথে পা বাড়াল। বোঝা গেল, বন্ধুর বেশে সেক্যুলাররা (পূর্বের সকল যুগ ও কালের মতো) জাতির মহান অভিভাবক হয়ে বসেছে। ইসলামিস্টরা চিরকাল তাদের একশ্রেণিকে, অর্থাৎ তথাকথিত গুণিজন ও বুদ্ধিজীবীকে মান্য করে, গণ্য করে এবং আস্থাভাজন মনে করে নিজেদের মামলা তাদের হাতে তুলে দিয়ে পরাভূত ও পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এবারও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৬৯ বছর ধরে আমরা এমন এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন করেছিল ব্রিটিশদের লর্ড ক্লাইভ আর বাঙালিদের মধ্যে মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, স্বরূপচাঁদ, উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগম প্রমুখ। সেই বিশ্ববিদ্যালয় এখনো স্বগর্বে চালু আছে। শুধু চালু নয়, বাঙালিরা পৃথিবীর যেখানে গিয়েছে অভিবাসী ও প্রবাসী হয়েছে, সেখনেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রোপণ করেছে। যার ফলে দেশ-বিদেশের এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারেগ হওয়া শিক্ষিত সমাজ ডিগ্রিধারী বিশ্বাসঘাতক ধরনের কর্মজীবীদের হয়েছে। অপরদিকে মুসলিমদের দ্বারা তৈরি বিদ্যায়াতনগুলোয় একশ্রেণির সহজ-সরল মানুষ তৈরি হয়ে আসছে, যারা জাগতিক বা পার্থিব বিষয়ে পণ্ডিত হতে পারেনি। তাদের মধ্যে গত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমন একটা ইনফ্রিওরিটি কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে, যারা বিশ্বাস করেন উপর্যুক্ত ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পণ্ডিত হিসেবে বের হয়ে আসেন, তারাই দুনিয়াবী জ্ঞানের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছেন। এ হীনম্মন্যতা এখনো দিব্যি বজায় রয়েছে। ঘুরেফিরে বাঙালি মুসলমান উপদেশ বা পরামর্শ গ্রহণের জন্য তাদেরই কাছে ফিরে ফিরে যায়। এবারও একই অবস্থা হয়েছে। দুঃসহ ও দুর্বহ অবস্থাকে দূরে ছুড়ে ফেলে যে বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মিনার গড়ে তোলা হলো, তার মুয়াজ্জিন হলাম আমরা। আর শেষমেশ দেখা গেল সেই মসজিদের ইমাম হয়ে গেছে পূর্বালোচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতরা। আমরা শুধু চিরকাল আজানই দিলাম, মসজিদ তৈরি করলাম, জায়নামাজ বিছালাম এবং খুঁজে খুঁজে এমন খতিব ও ইমাম বসালাম, যারা গত প্রায় ৩০০ বছর ধরে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা করেই আসছে (প্রতীকী শব্দাবলি)। এজন্য দায়ী কে? দায়ী আমাদের ঐতিহাসিক হীনম্মন্যতাবোধ। যারা বিপ্লব সংঘটিত করেছে (প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে), তাদের মধ্যে যারা অন্তত সানী ইমামের যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন, তারা তো ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইমাম হয়ে যেতে পারতেন। কেন আমরা এতবড় ভুলটি করলাম, কেন আমরা পেয়েও হারালাম, কেন আমরা নিজেদের হারিয়ে আবার অতীতের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি- এর কি কোনো জবাব আমাদের কাছে রয়েছে।
যাদের কাছে জবাব আছে, তারা তো অতিশয় ভদ্রলোক। তারা ঘরে বসে বসে কথার তুবড়ি ছোড়েন। জনসম্মুখে আসতে চান না। তথাকথিত ঝামেলায় জড়াতে চান না। সেট লাইফকে বিপন্ন করতে চান না। প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ বয়সে গালাগালি শুনতে চান না। এ শ্রেণির মহামান্য মানুষেরা নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে চান না। তাদের একটাই কথা, দিনকাল ভালো নয়। কোথায় গিয়ে কোন ঝামেলায় পড়ি। উত্তরাধিকারীরা কোন বিপদে পড়ে, সেই আশঙ্কায় এখন ঘরে বসে থাকাই ভালো।
অপরদিকে বিপ্লবীদের মধ্যেই চিরকালই অপর একটি গোষ্ঠী লুকিয়ে থাকে, যারা সুপিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগেন, যারা সহযোদ্ধা হয়ে আপন শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে অতিরিক্ত প্রত্যয়বান হন অথবা স্বীয় হীনম্মন্যতা লুকানোর উদ্দেশ্যে অপরের প্রতি তাচ্ছিল্যসূচক আচরণ করেন। অথবা শ্রেষ্ঠত্বের ভান করেন। তাদের মধ্যেই এমন কিছু গোষ্ঠী আছেন, যারা নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে একের পর এক দুর্দম ঐক্যকে দিশেহারা অনৈক্যে পরিণত করে চলেছেন। ইতিহাস এদের কি করে ক্ষমা করবে, জানি না।

বাংলা সাহিত্যে রোজা
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬

আল মাহমুদের গল্পে প্রেম ও প্রকৃতি
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫

প্রেরণার বাতিঘর : আল মাহমুদ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪

বাবারা এমনই হয়
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৩