কিডনি সমস্যায় দেশের ৫০ লাখ শিশু
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৪
॥ হামিম উল কবির॥
বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের কিডনি সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে। এই ৫০ লাখের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ শিশু (প্রায় আড়াই লাখ) ক্রনিক কিডনি ডিজিজে (সিকেডি) ভুগছে। বর্তমানে হাসপাতালে আউটডোরের শিশু রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ শিশু কিডনি সংক্রান্ত রোগ নিয়ে আসে। কিডনি শুধু রক্ত পরিশোধন করে না, ফসফরাস, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপুর্ণ খনিজ পদার্থের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এরিথ্রোপয়েটিন নামক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে লোহিত কণিকা উৎপাদনে সহায়তা করে ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে। কিডনি তার ছাঁকনির মাধ্যমে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিয়ে বিশুদ্ধ রক্ত শরীরে সঞ্চালন করে। এছাড়া পানি-ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটি। এক বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশু দিনে ১১৫ থেকে ১৪৫ লিটার রক্ত পরিশোধন করে (বয়স্করা ১৭০ থেকে ১৮০ লিটার)। রক্ত পরিশোধন করতে না পারলে শিশু কেন, কেউই সুস্থ থাকতে পারবে না। শিশুরা অনেক সময় জন্মগত কারণে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির ত্রুটি নিয়েই জন্ম নেয়। আবার জন্মের পর কিছু কারণে শিশুর কিডনিতে জটিলতা তৈরি হয়ে থাকে। কিডনি শরীরের রক্ত ছাঁকন ছাড়াও রক্ত থেকে বর্জ্য আলাদা করে নিষ্কাশন ও খনিজ দ্রব্যের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসচেতনতার কারণে শিশুদের মধ্যে কিডনি রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর মধ্যে নেফ্রোটিক সিনড্রোম ও জন্মগত কিডনি বিকলাঙ্গতা বা কনজেনিটাল অ্যানোমেলি’ অন্যতম।
নেফ্রোটিক সিনড্রোম
নেফ্রোটিক সিনড্রোম কিডনির কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি কতগুলো উপসর্গের সমষ্টি। নেফ্রোটিক সিনড্রোম শিশু কিডনির অন্যতম একটি সমস্যা। কিডনির ভেতরে গ্লোমেরুলাস নামক যে ছাঁকনি থাকে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ সমস্যাটি হয়ে থাকে। এ ছাকনি অস্বাভাবিক হলে শিশুর শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (অ্যালবুমিন) প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। নেফ্রোটিক সিনড্রোম দেখা দিলে কিডনির ছাঁকনি এই প্রোটিনগুলো ধরে রাখতে পারে না। এ কারণে শরীরে প্রোটিনের মাত্রা কমে যায় এবং শরীর ফুলতে শুরু করে। নেফ্রোটিক সিনড্রোম হলে সকাল বেলা চোখের পাতা ফুলে যায়। এর পরের ধাপে পা, পেট; এমনকি পুরো শরীর ফুলে যেতে পারে। এমন হলে শিশুর প্রস্রাব কমে যেতে পারে, প্রস্রাবে ফেনা যুক্ত হতে পারে। শরীরে পানি জমে গেলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে। কিডনির এ সমস্যাটি হলে শিশুর; এমনকি বয়স্কদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে ঘন ঘন জ্বর হতে পারে; এমনকি তা থেকে নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ( ৩ থেকে ৬ মাস) হতে পারে। দীর্ঘসময় লাগলেও পিতা-মাতাকে ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দিলে শিশুর মারাত্মক বিপদ হয়ে থাকে।
শিশুর জন্মগত কিডনি জটিলতা
জন্মগত কিডনি জটিলতা বা কনজেনিটাল কিডনি ডিজিজ শিশুর আরেকটি কিডনি সমস্যা। অনেক শিশু জন্মের পর থেকে কিডনি বা মূত্রতন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। একে কনজেনিটাল অ্যানোমেলিস অব দ্য কিডনি অ্যান্ড ইউরিনারি ট্র্যাক্ট (সিএকেইউটি) বলা হয়। অনেক শিশু একটি কিডনি নিয়েই জন্মাতে পারে অথবা একটি কিডনি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে। ছোট কিডনি থেকে প্রস্রাব বের হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হলে কিডনি ফুলে যায় বা ফুলে যেতে পারে। এর ফলে প্রস্রাব বের হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। ছোট কিডনি নিয়ে জন্মানো ছাড়া শিশু প্রোস্টেরিয়র ইউরেথ্রাল ভালভের সমস্যা নিয়েই জন্মাতে পারে। এমন হয়ে থাকে সাধারণত ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে। মূত্রনালির ভেতরে একটি ছোট পর্দা প্রস্রাব চলাচলে বাধা দিতে পারে। এই সমস্যাটির সমাধান দ্রুত করা না হলে শিশুর কিডনি ফেইলিউর বা অকেজো হয়ে যেতে পারে। আবার কিডনিতে অনেক ছোট ছোট সিস্ট বা পানির থলি সৃষ্টি হতে পারে। আবার পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ হলে কিডনিতে অসংখ্য ছোট ছোট সিস্ট বা পানির থলি তৈরি হতে পারে। কারণ হিসেবে বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম সেলিম বলেন, গর্ভবতী মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ থাকলে, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে শিশু কিডনি সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে। তিনি বলেন, শিশুর জন্মগত পলিসিস্টিক কিডনি রোগ হয়ে থাকে বংশগত কারণে। বংশে কারো থাকলে কোনো কোনো শিশু শুধু পলিসিস্টিক নয়, অন্যান্য কিছু ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। সেজন্য গর্ভে থাকতেই কমপক্ষে চারবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। সেখান থেকেই গাইনিকোলজিস্টরা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেয়ে থাকেন এবং চিকিৎসা করে থাকেন। সুস্থ মা একটি সুস্থ শিশু জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশে এই রোগের চিকিৎসা
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, বাংলাদেশে পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বা শিশুদের কিডনি চিকিৎসা গত এক দশকে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল) এবং শেরেবাংলা নগরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেজ অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) হাসপাতালে শিশু কিডনি রোগের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে এবং সেখানে দক্ষ চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন। তারা রোগের অবস্থা বুঝে শিশুকে ডায়ালাইসিস করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন অথবা অন্য চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এছাড়া জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের জন্য রয়েছেন দক্ষ পেডিয়াট্রিক ইউরোলজিস্টরা। ইউরোলজিস্টরা লেপারোস্কোপিক ও পুনর্গঠনমূলক (রিকন্সট্রাক্টিভ) সার্জারি করে রোগটি সারিয়ে তুলতে পারেন। শিশুর কিডনি রোগ হলে কিছু প্রতিকার রয়েছে এবং সচেতন থাকলে কিডনি রোগ এড়ানো যায়। ইউরোলজিস্টরা বলছেন, গর্ভকালীন মায়েরা কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকলে শিশুর এমন রোগ নাও হতে পারে।
গর্ভকালীন কিছু সচেতনতা
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম (অ্যানুমেলি স্ক্যান) করিয়ে নিলে তাতে গর্ভস্থ শিশুর কিডনির কোনো ত্রুটি আগে-ভাগেই জেনে ব্যবস্থা নেয়া যায়। শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করানো উচিত, বর্ষাকাল বা শীতকালে বেশি প্রস্রাব করবে বলে কম পানি পান করানো উচিত নয়। এছাড়া অতিরিক্ত লবণ ও ফার্স্টফুড বা জাঙ্কফুড জাতীয় খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ থাকে ও অতিরিক্ত চর্বি ও চিনি থাকে। এ তিনটির সবগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে কোনো ব্যথানাশক ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো যাবে না। ব্যথানাশক কিডনির জন্য মারাত্মক বিশেষ করে শিশু কিডনির জন্য। বয়স্কদের জন্যও একই রকম সমস্যা হয়ে থাকে। কোনো শিশুর মধ্যে উপরিউক্ত লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নির্দিষ্ট বিষয়ের চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পারলে ভালো। ধারে কাছে এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ না থাকলে অন্তত মেডিসিন বিশেষজ্ঞকেও দেখাতে হবে। জন্মগত কিডনি সমস্যা খুবই জটিল হলেও সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে পারলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুকে সম্পূর্ণ সুস্থ বা রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বাংলাদেশে এ চিকিৎসার সুযোগ এখন অনেক প্রসারিত। সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো এবং প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে শিশুর জন্মগত কিডনি জটিলতা কমিয়ে আনা যায় এবং শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।
ইনফেকশনের কারণে কিডনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে
ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ইনফেকশন বা সংক্রমণের কারণে কিডনির ফিল্টারিং অংশে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। শরীরের প্রদাহজনিত রোগ বা ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিক তৎপরতার কারণে এই সমস্যাটি হতে পারে। প্রদাহের কারণে কিডনি যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে রক্ত অথবা প্রোটিন চলে আসতে পারে প্রস্রাবে। আবার ডায়রিয়া হলে কিডনি ফেইলিউর বা কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি দ্রুত বের হয়ে যায়। রক্তে তরলের অভাবে কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা কমে যায়। এটা একিউট কিডনি ইনজুরিতে পরিণত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়াজনিত একিউট কিডনি ইনজুরি হতে পারে। দেখতে হবে ডায়রিয়া হলে শিশুর প্রস্রাব কমে যায় কি না। প্রস্রাব কমে গেলে শিশুকে বেশি করে তরল (খাবার স্যালাইন) পান করাতে হবে। ডায়রিয়া হলে শিশু তরলসহ সব ধরনের খাবার বন্ধ করে দিতে পারে। এমন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক অবস্থা বুঝে শিরা দিয়ে স্যালাইন দেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। কিছু শিশুর কিডনি সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (ইউটিআই) কারণে। ইউটিআই চিকিৎসাহীন থাকলে জীবাণু ওপরের কিডনিতে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং কিডনিতে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া যাদের প্রস্রাবে প্রোটিন থাকে তাদের কিডনি ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।