ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ব্যস্ত ইসি, উঠছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ


২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৫

১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘন
স্টাফ রিপোর্টার : ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে প্রচারে ব্যস্ত প্রায় দুই হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ইতোমধ্যে অনেক জেলায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রার্থী একে অন্যের বিরুদ্ধে চালাচ্ছেন বাগযুদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি মাসে এ পর্যন্ত ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ৯৪টি মামলা করা হয়েছে। প্রতিদিনই ইসির কাছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জমা পড়ছে। কমিশনও এসব বিষয় অবগত রয়েছে। ইসি বলছে, অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও সাবির্ক পরিস্থিতি ভালো আছে বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনাররা। তবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে।
ভোটে বাগযুদ্ধ, ইতিবাচক দেখছে ইসি : দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের খবর এলেও ভোটের মাঠে ‘চমৎকর পরিবেশ’ দেখছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। সভা-সমাবেশে, প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহারকে ঘিয়ে নানা ধরনের বক্তৃতা-বিবৃতিকেও ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখছেন তিনি। আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন মানেই দল, প্রার্থীদের এজেন্ডা, ইশতেহার নিয়ে কথা হবে। বক্তৃতা-বিবৃতিতে একজন আরেকজনের পজিটিভ-নেগেটিভ দিক তুলে ধরবেন, এর মধ্য থেকে জনগণ বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে যে কাকে ভোট দেবে।’ গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব বিষয়ে কথা বলেন। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল বলেন, ‘বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যা খবর পাচ্ছি এবং বাস্তবে আমরা মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, নির্বাচন কমিশন মনে করে, অতীতের অনেক নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার।’ কিন্তু ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে, অনেক প্রার্থী ও দলের পক্ষ থেকে ইসিতে অভিযোগ আসছে। অনেকে ভোটের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্ক প্রকাশ করছেন। এসব বিষয়ে সাংবাদিকরা আনোয়ারুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আপনাদের দিক থেকে প্রশ্ন এসেছে যে অনেকেই এ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করছে। নির্বাচন কমিশন কোনো শঙ্কা প্রকাশ করছে না। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমাদের কাছে আসছে, উনাদের পরামর্শ, অবজারভেশন, পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিষয়গুলো আসছে, তাৎক্ষণিক কমিশন তা রিটার্নিং অফিসারদের নজরে আনছে বলে তার ভাষ্য। আনোয়ারুল বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে এসব ঘটনায় দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়, সেজন্য কমিশনও ‘ত্বরিত ব্যবস্থা’ নিচ্ছে।
ভোট হবে শান্তিপূর্ণ, সততা নষ্ট হলে ছাড় নয় : নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, কোনো অবস্থায় ভোটের সততা নষ্ট হওয়ার বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ যদি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুশীলন না করে ভোট দেন, তাহলে তার ভোট বাতিল হয়ে যাবে। গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল, ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, একই সময় সাধারণ ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনা করা হবে। তবে পোস্টাল ব্যালট গণনায় সময় লাগবে। ১১৯টি প্রতীক রয়েছে প্রতিটি ব্যালটে। প্রবাসীদের ব্যালটের প্রতীকগুলো এজেন্টদের দেখিয়ে নিশ্চিত করতে হবে, তারা কোথায় ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, এবারে ভোটার ও জনগণের মধ্যে ভোট দেওয়ার অধীর আগ্রহ কাজ করছে। সবাই যেন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারেন। অনেক সময় দেখা যায় দুষ্টচক্র প্রতিপক্ষের ভোটারকে আসতে বাধা দেয়। সবাই নিজের ভোটারকে সাথে করে নিয়ে আসুক, এটাতে কোনো বাধা নেই। তবে কেউ যেন নির্বাচনে কাউকে বাধা দিতে না পারে, এটা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পোস্টাল ব্যালট প্রবাস ও দেশ থেকে দুইভাগে হবে। প্রবাস থেকে যে ব্যালটগুলো আসবে, ডাক বিভাগ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সরাসরি সেগুলো ডেলিভারি করবে। আর দেশের ভেতরে যে পোস্টাল ব্যালটগুলো আছে, সেগুলো স্থানীয় পোস্ট অফিসের মাধ্যমে আসবে।
নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে যাবেন না : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে একই দিন গণভোটও হবে। সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও এ প্রচারে আছে। সরকার বা সরকারি কর্মকর্তারা একটি পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলামের কাছে গণভোটের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অবস্থান কী, তা জানতে চান একজন সাংবাদিক। জবাবে তিনি বলেন, ‘গণভোটের বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, গণভোটের জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। নির্বাচনী কাজের দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা আইনগতভাবে কোনো পক্ষে কাজ করবেন না। এটি নির্বাচনের দায়িত্বে রিটার্নিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার এবং অন্যান্য যাঁরা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁরা গণভোটের প্রচার করবেন, বাট পক্ষে-বিপক্ষে যাবেন না।’ গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
মোটরসাইকেল তিন দিন, অন্যান্য যান ২৪ ঘণ্টা বন্ধ : নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে ভোটগ্রহণের দিন এবং এর আগে-পরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের দিন ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্যাক্সিক্যাবসহ চার ধরনের যানবাহন ২৪ ঘণ্টা চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর তিন দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের আগের মধ্যরাত অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ২৪ ঘণ্টা ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। অন্যদিকে ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি সেবা ও বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসনের যানবাহন; অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যমের গাড়ি; জরুরি চিকিৎসা ও ওষুধ পরিবহনের যানবাহন; বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রী বা তাদের স্বজনদের গাড়ি (টিকিট প্রদর্শনসাপেক্ষে); দূরপাল্লার যাত্রীবাহী যানবাহন এসব ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনি এজেন্টদের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদনসাপেক্ষে একটি গাড়ি (জিপ/কার/মাইক্রোবাস) চলাচলের সুযোগ থাকবে। টেলিযোগাযোগ সেবায় নিয়োজিত বিটিআরসি ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহনও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, জাতীয় মহাসড়ক, বন্দর এবং আন্তঃজেলা বা মহানগর এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা শিথিল রাখা যাবে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার চাইলে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা শিথিল করার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
ভোটে নিরপেক্ষতা ও নাগরিকবান্ধব আচরণের আহ্বান সেনাপ্রধানের : সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনকে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্ব পালনে আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার রংপুর সার্কিট হাউসে আয়োজিত সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। এতে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য সামরিক-বেসামরিক প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মতবিনিময় সভা শেষে নির্বাচনী দায়িত্বে মোতায়েন করা সেনাসদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি। শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়ামে সেনাসদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্যও রাখেন সেনাপ্রধান। এ সময় তিনি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সবাইকে নাগরিকবান্ধব আচরণের নির্দেশ দেন।