মোবাইল আসক্তি : ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর ভবিষ্যৎ
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪১
স্টাফ রিপোর্টার : যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার এখন অনেকটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে এর অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে একটি মারাত্মক সমস্যার জন্ম দিয়েছে মোবাইল ফোন। এ আসক্তি ধীরে ধীরে শিশুদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুরা এখন মোবাইল ফোনে অনলাইন গেম, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও কনটেন্ট দেখে। ফলে এরা বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়ালজগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। এতে একপর্যায়ে শিশুরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে অস্বস্তিবোধ করে। ডুবে থাকতে চায় ভার্চুয়ালজগতে।
শিশুরা কেন মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলে উত্তর আসবে এর জন্য শিশুর অভিবাবকই দায়ী। কারণ অভিভাবকরাই শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছে। এতেই আসক্তি বাড়ে। কারণ কর্মব্যস্ত বাবা-মা অনেক সময় সন্তানদের সময় দিতে না পেরে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। অনলাইন গেম ও ভিডিওর রঙিন জগৎ শিশুদের কৌতূহল ও আনন্দের চাহিদা পূরণ করে। এ কারণে শিশুরাই এতে আগ্রহী হয়। বিশেষ করে করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে শিশুদের হাতে দীর্ঘসময় মোবাইল থাকার অভ্যাস গড়ে উঠেছে, যা আর কেউ ছাড়তে পারছে না।
মোবাইল আসক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের শিক্ষাজীবনে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। ক্লাসের বইয়ের চেয়ে গেম ও ভিডিও তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। অনেক শিশু রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করে, যার ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং পরদিন পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়া, শেখার আগ্রহ হারানো এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
দীর্ঘসময় মোবাইল ব্যবহারে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠের ব্যথা এখন খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া দীর্ঘসময় বসে থাকার কারণে স্থূলতা বাড়ছে, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাচ্ছে। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও এতে ব্যাহত হচ্ছে।
মোবাইল আসক্ত শিশুদের মধ্যে মানসিক সমস্যাও বাড়ছে। তারা সহজেই রাগান্বিত হয়ে পড়ে, ধৈর্য হারায় এবং একাকিত্বে ভোগে। মোবাইল কেড়ে নিলে অনেক শিশু আক্রমণাত্মক আচরণ করে বা কান্নাকাটি শুরু করে। বাস্তব জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার পরিবর্তে তারা ভার্চুয়ালজগতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে সামাজিক দক্ষতা কমে যায় এবং আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দেয়।
মোবাইল আসক্তির কারণে শিশুদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা করা কিংবা গল্প করার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণেও তারা অনীহা প্রকাশ করে। এর ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে সমাজবিমুখ হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু যদি তারা শৈশব থেকেই মোবাইল আসক্তিতে ডুবে থাকে, তবে ভবিষ্যতে দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা থাকা ভালো, কিন্তু এর অপব্যবহার জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের পরিবর্তে শিশু যদি কেবল স্ক্রিনে আবদ্ধ থাকে, তবে জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে এবং সন্তানের মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুদের খেলাধুলা, বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুলে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু এবং শিশুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটিয়ে তাদের মানসিক চাহিদা পূরণ করতে হবে অভিভাবকদের।