তোষামোদকারীরা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
স্বতঃসিদ্ধ বাক্য ‘তোষামোদকারীরা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।’ তোষামোদকারীরা সবসময়ই নিজের কল্যাণের জন্য কাজ করে। আর যাদের তোষামোদ করে, তারা মনে করে এরা তাদের ভালো করার জন্যই পরামর্শ দিচ্ছে অথচ তা সবার জন্যই ক্ষতিকর।
স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৫৪ বছরে আমরা কয়েকটি সরকার দেখলাম। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান চাটুকারীদের এবং তোষামোদকারীদের খপ্পরে পড়ে একদলীয় সরকার ‘বাকশাল’ করে তার রাজনৈতিক পরাজয় নিশ্চিত করেন। অপঘাতে মারা যান। এত বড় নেতা, কিন্তু তার জানাযায় মাত্র ১৭ জনের উপস্থিতি প্রমাণ করে তোষামোদকারীদের কারণে বড় নেতারও এরকম পরিণতি ভোগ করতে হলো।
পরপর কয়েকটি সরকার পরিবর্তন হলেও জনগণ তাদের প্রত্যাশিত ফল ভোগ করতে পারেনি। তাই তো সরকারগুলোর পরিণতি ভালো হয়নি। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের দুনিয়ার ইতিহাসে জঘন্য পরিণতির শিকার হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সুরক্ষিত গণভবন থেকে দুপুরের খাওয়া টেবিলে রেখেই পালাতে হয়। বর্তমানে পরাধীনতার শিকল কাঁধে নিয়ে দাদার বাড়িতে অবস্থান করছে। জনগণ তার দুর্নীতির অবস্থা সম্মুখে আসার পর তাকে দুর্নীতির রানি বলে আখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছে। সে একা পালিয়ে যায়নি, তার দোসররা, তার তোষামোদকারীরা একে একে পালিয়েছে। পিয়ন থেকে বিচারপতি, মসজিদের ইমাম, এমপি, মন্ত্রী, আমলা সবাই জীবন বাঁচাতে পালিয়েছে। তারা আগেই দেশের টাকা লুট করে ব্যাংক খালি করে দেশে দেশে বেগমপাড়া বানিয়ে রেখেছিল। সেখানে তারা অপরাধী হিসেবেই বসবাস করছে। তাদের মনে যে শান্তি নেই, তা মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিয়ে দেশের মধ্যে অরাজকতা করার চেষ্টা করছে, যা কোনোদিনই দেশের মানুষ আর খাবে না।
৫ আগস্ট ২০২৪-এ দেশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতা জানিয়ে দিয়েছে- কোনো স্বৈরাচার আর এদেশে আসতে পারবে না বা দেশের কোনো শক্তি যদি স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালাতে চায়, জনগণ তাদের পাত্তা দেবে না। ইতোমধ্যে দেশে সচেতন অংশ ছাত্র-ছাত্রী সমাজ ৫টি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দল-মত নির্বিশেষে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেলকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের মধ্যে এ নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ হয়েছে। উৎসব পরিবেশে ছেলে-মেয়েরা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটে উপস্থিত হয়ে ভোট দিয়েছে এবং সৎ, যোগ্য, ছাত্রবান্ধব নেতা বানিয়েছে। অনেকে মন্তব্য করেছে, শিবিরের ছেলেরা দল করেও এত ভালো মেধাবী হয় কী করে? শুধু তাই নয়, কয়েক মাসের মধ্যেই শিবিরের প্যানেলে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে, মাদক উচ্ছেদ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পাঠাগারের উন্নতি, ছেলে-মেয়েদের নামাযের জায়গায় এসি লাগানো, ফাও খাওয়া বন্ধ করা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে ৫৪ বছরের মধ্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে কয়েকদিন পূর্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংসদ নির্বাচনে শিবিরের প্যানেল বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার বাংলাদেশে উপস্থিতিতে ছাত্রদলের এমন পরাজয় দেখতে হলো। খবরে প্রকাশ, তারা শিবিরবিরোধী সব দলকে টাকা খরচ করে এক করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু শিবিরের ভূমিধস বিজয় ঠেকাতে পারেনি। তাই তো মিডিয়ায় তোলপাড় উঠেছে এ ছাত্র-ছাত্রীরাই তো দেশের শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধি। তারা দেশের গ্রাম-গঞ্জের সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত শিক্ষিত প্রার্থী জামায়াতের লোকেরা ইতোমধ্যেই জনগণের কাছে পৌঁছে গেছে, তাদেরই দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার কাজে লেগে গেছে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পরপরই দেশের শিক্ষিত সমাজ তাদের মতের পরিবর্তন ঘটিয়ে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যারা দেশ দুর্নীতিমুক্ত করতে চায়, যারা চাঁদাবাজিমুক্ত করতে চায়, সুদ-ঘুষ স্বজনপ্রীতি, টাকার খেলা বন্ধ দেখতে চায়, তারা সবাই জামায়াতের সুচিন্তিত মত ও পথের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। শুধু তাই নয় আমি কয়েকদিন পূর্বে ধানমন্ডিতে রাত দেড়টায় এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি কোথায়? সে বলল, কুড়িগ্রাম। ভোটের কথা জিজ্ঞাসা করাতে বলে উঠলো, স্যার আমরা এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেব, সবাই সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। ঢাকা এবং গ্রামেও এ কথা বলাবলি হচ্ছে- আর চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের সংসদে পাঠানো যাবে না। তারা সাধারণ জনতার কথা চিন্তা করে না। দল আর ব্যক্তির উন্নয়নেই তারা ব্যস্ত থাকে। আমরা এবার তাদেরই ভোট দেব, যাদের প্রয়োজনে হাতের কাছে পাওয়া যায়। তারা সাধারণ বাসে চলে, রিকশায় চলে, হাটে-ঘাটে পায়ে হেঁটে ভোট চাচ্ছে, তাদেরই এবার তারা ভোট দেবে।
ওপরতলার লোক যারা ভোটের সময় বড় বড় গাড়ি, বুলেটপ্রুফ গাড়ি নিয়ে চলে, তাদের ভোট দেবে না। দেশের বর্তমান অবস্থায় ভোটে লড়বে জামায়াত জোট এবং বিএনপি জোট। জামায়াত জোটের নেতা ডা. শফিকুর রহমান তিনি ইতোমধ্যেই দেশে মানবিক নেতা হিসেবে জনপ্রিয়। পানির মধ্যে নেমে বন্যাদুর্গতদের খাদ্য পৌঁছেছেন। অমুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় জনতার নেতা হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী ময়দানে অসুস্থ হয়েও ঘোষণা দিয়েছেন আমরা দেশ থেকে ফ্যাসিস্ট তাড়িয়েছি, এবার দেশ থেকে দুর্নীতি তাড়াবো।
এ দেশের মানুষ যেহেতু শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়াকে ভালোবাসতেন, তারা ভারতবিরোধী নীতি ও সাধারণ জীবনযাপন করতেন, তাই শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার জানাযায় লাখ লাখ লোকের উপস্থিতি দেখা যায়। আমরাও উপস্থিত ছিলাম।
বেগম জিয়ার বিদায়ের পর বিএনপির দেশদরদি রাজনীতির অবসান ঘটে। শুরু হয় তোষামোদকারীদের খপ্পরে পড়া তারেক জিয়ার রাজনীতি। তিনি শতকোটি টাকার বুলেটপ্রুফ গাড়িতে চলেন। তাকে অবৈধ সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমলারা তার তোষামোদে দেশের নিয়মনীতি ভঙ্গ করে রাজকীয় প্রটোকল দেয়া শুরু করেছে, যা তার রাজনৈতিক জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জামায়াত জোটের ছাত্র-জনতা জুলাই ২৪ বিপ্লবে মাঠে ছিল, তারা জুলাই বিপ্লবের সনদ বাস্তবায়নে একমত পোষণ করেছে। কিন্তু বিএনপি জোট এ সনদ বাস্তবায়নে সন্দেহ পোষণ করে বক্তব্য দিচ্ছে। আন্দোলন চলাকালে বিএনপির মহাসচিব প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, তারা এ ছাত্র-আন্দোলনের সাথে নেই। আরেক নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক তো বলেই ফেললেন, জুলাই সনদ দরকার নেই। যারা জুলাই সনদের সাথে থাকবে না, তারা স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে জুলাই সনদ পাস করার ব্যাপারে কারা হ্যাঁ ভোট দেবে এবং জনগণকে হ্যাঁ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।
আমি ফিরে আসি তোষামোদকারীরা কী করছে। দুর্নীতির রানিকে স্বৈরাচার বানিয়ে যে সমস্ত তোষামোদকারী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আমলা, তারাই আবার তারেক জিয়াকে তোষামোদের উচ্চ শিখরে নেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যবসায়ী গ্রুপ হাসিনাকে তোষামোদ করে তাকে স্বৈরাচার হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ঐ তোষামোদকারী ব্যবসায়ী গ্রুপ ইতোমধ্যেই তারেক জিয়াকে ঘিরে ফেলেছে। একইভাবে তোষামোদকারী সাংবাদিকরা তারেক জিয়াকে দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এ বিষয়গুলো কোনোমতেই দেশের উন্নয়নে সহায়ক নয়। শহীদ জিয়া, বেগম জিয়ার রাজনৈতিক ধারা তারেক জিয়া ধারণ করলেই তিনি আগামী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন। ১৭ বছর দেশের বাইরে থাকার কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিত তার কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট।
তারেক জিয়াকে তার দলের লোকদের বাছাই করতে হবে যে, গত ১৭ বছর কারা আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের কোপানলে পড়েছিলেন। জেল খেটেছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। কারা আওয়ামীদের সাথে থেকে বিএনপি তাদের ব্যবসা চালাতে পেরেছে। কারা জেল থেকে দূরে থেকেছে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য কারা ভূমিকা রেখেছে আর কারা ভূমিকা রাখেনি, তাদের চিহ্নিত করে রাজনীতি করতে পারলেই কেবল সামনে তিনি ভালো করতে পারবেন। ছাত্রদলের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। গত ১৭ বছরে ছাত্রদলের নেতৃত্ব কারা দিয়েছে। কীভাবে তাদের নেতা নির্বাচন হয়েছে, নেতারা দুর্নীতিমুক্ত আছে কিনা? চাঁদাবাজির সাথে কারা জড়িত ছাত্রদল এবং মূল দলের তাদেরও চিহ্নিত করে তারেক জিয়াকে এগোতে হবে। দেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির কারণ খুঁজে বের করাও তারেক জিয়ার বড় দায়িত্ব। কারণ ছাত্রদলের ছেলেরাই আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। তাই তাদের চরিত্র এখন থেকেই তৈরি করতে হবে।
ইসলামী ছাত্রশিবির আওয়ামী আমলে সবচেয়ে জুলুমের শিকার হয়েছে, জেল খেটেছে, খুনের শিকার হয়েছে, গুম হয়েছে, অনেকেই এখনো গুমের অন্তরালেই রয়েছে। তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জুলাই বিপ্লবে অংশীদার ইসলামী ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়েছে। তাদের চরিত্র মাধুর্য, ক্লাসে লেখাপড়ায় ভালো করা, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি থেকে দূরে থাকছে বলেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আশার চাইতেও ভালো ফল করেছে এবং ভোটে জিতেই তাদের কর্মতৎপরতা ছাত্র-ছাত্রীবান্ধব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
আমরা দেশের রাজনীতি আর ৫ আগস্টের পূর্বে ফিরে যেতে দেব না- এ তোষামোদকারীদের অনুসরণতাড়িত হয়ে জনগণের কাছে যেয়ে লাভ হবে না। ৫ আগস্টের পর দেশের পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাই কারো করুণা বা সামরিক-বেসামরিক, আমলা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকনির্ভর হয়ে নেতা হওয়া যাবে না। নিজের ক্যারিশমা দেখায়েই জনগণের কাছে যেতে হবে। যেমন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে ১১ দলকে একজোটে আনতে পেরেছে। আবার তার ক্যারিশমার কারণে জনগণ জামায়াত জোটকে ক্ষমতায় আনার স্বপ্ন দেখছে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com

একেএম রফিকুন্নবী

সম্পর্কিত খবর