বহু মেরুতে রূপান্তরিত হচ্ছে বিশ্ব

অশান্ত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য


৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৮

॥ ফারাহ মাসুম ॥
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যে স্থবির হয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ প্রস্তাব ও পাল্টা অবস্থান একটি গভীর আস্থাহীনতার সংকেত দিচ্ছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে কার্যত আটকে দিয়েছে।
প্রথমত, তেহরান হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায়, এই প্রস্তাব শুধু সামরিক নয়, গভীর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বহন করে। ইরান কার্যত জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবকে আংশিক ও অসম্পূর্ণ হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে হরমুজ ইস্যু আলাদা করে সমাধান করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চিত সমঝোতা হয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘সামগ্রিক চুক্তি’ চায়, যেখানে নিরাপত্তা, পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব- সবকিছু একসাথে সমাধান হবে।
এই অবস্থানগত পার্থক্যই এখনকার কূটনৈতিক অচলাবস্থার মূল কারণ। ইরান যেখানে ধাপে ধাপে সমঝোতার দিকে এগোতে চায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চায় একক বৃহৎ চুক্তি। এই ভিন্ন কৌশল শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
দ্বিতীয়ত, এই পরিস্থিতি একটি ‘হিমায়িত সংঘাত’-এর ঝুঁকি তৈরি করছে, যার বিষয়ে কাতার ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে। ‘হিমায়িত সংঘাত’ বলতে এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে যুদ্ধ থেমে থাকে কিন্তু মূল বিরোধের সমাধান হয় না। ফলে যেকোনো সময় সংঘাত আবারও জ্বলে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন উদাহরণ বহুবার দেখা গেছে।
তৃতীয়ত, ইরানের বক্তব্য- যুক্তরাষ্ট্র আর শর্তারোপ করার অবস্থানে নেই। এই সংকটের আদর্শিক দিকটিকে সামনে নিয়ে আসে। এটি শুধু একটি সামরিক বা কূটনৈতিক বিরোধ নয়; বরং এটি ক্ষমতার ভারসাম্য ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও। ইরান নিজেকে একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে বাইরের চাপ মেনে নেওয়া তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।
চতুর্থত, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো কার্যকর ফল আসেনি। পরোক্ষ আলোচনার এই কাঠামোয় আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট- যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করতে অনিচ্ছুক।
এই অচলাবস্থার বৈশ্বিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বজায় থাকলে জ্বালানি বাজার অনিশ্চিত থাকবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। একই সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন জোট রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘যুদ্ধও নয় শান্তিও নয়’ বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। যুদ্ধ থেমে থাকলেও স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থা এখনো অনুপস্থিত। ফলে এই সংঘাত যেকোনো সময় আবারও বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
কেন এই সংঘাত
সাম্প্রতিক উত্তেজনা; বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল সংঘাতকে ঘিরে যে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; বরং এটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র, কূটনৈতিক অচলাবস্থা, জ্বালানি রাজনীতি ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা- এই চারটি স্তর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কার্যত পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষ এখন আর সীমিত নয়; এটি সরাসরি সামরিক হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং প্রক্সি যুদ্ধ সব মিলিয়ে একটি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’-এ পরিণত হয়েছে।
ইসরাইল গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে; বিশেষ করে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ইরান সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে।
এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- এটি একক ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং পারস্য উপসাগর সব জায়গায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের মাধ্যমে এটি বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি যেমন বাড়ছে, তেমনি এর নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠছে।
আলোচনা চলছে, সমাধান নেই
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো কূটনৈতিক অচলাবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চললেও তা কার্যত স্থবির। ইরান হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেলআবিব উভয়ই নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বাসহীন আলোচনার উদাহরণ- যেখানে উভয় পক্ষই আলোচনায় অংশ নেয়, কিন্তু কোনো পক্ষই ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
কূটনৈতিক ব্যর্থতার পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করছে- পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। এর ফলে যুদ্ধ ও আলোচনা- দুই প্রক্রিয়া একসাথে চললেও সমাধান দূরবর্তী হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু সীমান্তে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেও পড়ছে। ইরানে বর্তমানে ক্ষমতার ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী-আইআরজিসি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। রাজনৈতিক নেতৃত্বের তুলনায় সামরিক নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যা দেশটির নীতি আরও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।
এই পরিবর্তন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হওয়া- এই দুটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্রে সামরিক নেতৃত্ব প্রাধান্য পায়, তখন নীতিনির্ধারণে আপসের সুযোগ কমে যায়। বর্তমান ইরান সেই ধরনের একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত ও শক্তির পুনর্বিন্যাস
মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাতের মতোই এবারও জ্বালানি বাজার সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়।
এর ফলাফল হলো- আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই জ্বালানি সংকট। উন্নয়নশীল দেশগুলো; বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
আঞ্চলিক জোট ও বর্তমান সংকট মধ্যপ্রাচ্যের জোট রাজনীতিকে নতুনভাবে গঠন করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরাইল; অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’- এই দুই ব্লকের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
এছাড়া আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে গড়ে ওঠা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবার নতুন সম্পর্কগুলো এখন চাপের মুখে। কিছু আরব দেশ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু জনমত ও ফিলিস্তিন ইস্যু তাদের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে। এই দ্বৈধতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরান সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলো এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইসরাইল এই গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের ‘অগ্রগামী প্রতিরোধ কৌশল’ হিসেবে দেখে। ফলে যেকোনো হামলা শুধু একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রক্সি যুদ্ধ সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল করে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া- এই তিন শক্তি ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে এই অঞ্চলে সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়; চীন অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায় আর রাশিয়া কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি ‘বৈশ্বিক দাবার ক্ষেত্র’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে।
এই সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর সরাসরি পড়ছে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে চাপ সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের ওপর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমাতে পারে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ এই যুদ্ধ শুধু দূরের কোনো সংঘাত নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বৃহত্তর ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণাটি একদিকে যেমন আবেগ, ইতিহাস ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে জড়িত; অন্যদিকে এটি আধুনিক ভূরাজনীতিতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে কাজ করে। তবে এই ধারণাকে ঘিরে যে উত্তেজনা, সন্দেহ ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে, তা বাস্তব রাষ্ট্রনীতির চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। বর্তমান ইরান-ইসরাইল সংঘাত এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা বুঝতে এই ধারণার উৎস, বিবর্তন ও ব্যবহার বিশ্লেষণ জরুরি।
‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণার মূল শিকড় ইহুদি ধর্মগ্রন্থে; বিশেষত তানাক-এ বর্ণিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ ধারণায় নিহিত। এই বর্ণনায় একটি বিস্তৃত ভূখণ্ডের কথা বলা হয়, যা প্রতীকীভাবে নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ এই ধারণাটি মূলত ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার অংশ, আধুনিক রাষ্ট্রের সীমারেখা নির্ধারণের কোনো কার্যকর নীতি নয়। ইতিহাসে বহু ধর্মীয় ধারণাই রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নেয়, কিন্তু সবসময় তা বাস্তব রাষ্ট্রনীতিতে রূপান্তরিত হয় না। ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ও তেমনই একটি প্রতীক, যা সময়ের সাথে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পেয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জায়নবাদ আন্দোলনের উত্থান আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। এর প্রধান প্রবক্তা থিউডর হারজল মূলত একটি নিরাপদ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইহুদি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তার চিন্তায় ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণার কোনো স্পষ্ট উপস্থিতি ছিল না। বরং তিনি বাস্তববাদী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। এর ফল হিসেবে ১৯৪৮ সালে ‘ইসরাইলি ডিক্লারেশন অব ইন্ডেফেন্ডেন্স’ ঘোষণার মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বলা হয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক দর্শন ছিল নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি- বিস্তারবাদ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ৬ দিনের যুদ্ধের মাধ্যমে। এই যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুসালেমসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে। এই ভূখণ্ডগত পরিবর্তন ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। কিছু ডানপন্থী ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এই দখলকে ঐতিহাসিক ভূমি পুনরুদ্ধার হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এই দখলকৃত অঞ্চলগুলো এখনো বিতর্কিত এবং এগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
আজকের বাস্তবতায় ইসরাইল রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমাধান হলো দুই রাষ্ট্র সমাধান- যেখানে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকৃত হবে।
তবে বাস্তব সমস্যা হলো, রাজনৈতিক বক্তৃতা ও মতাদর্শে এই ধারণা বারবার উঠে আসে। ফলে এটি একটি পারসেপশন হিসেবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, এটি একটি অতিরঞ্জিত বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত ধারণা, যা ফিলিস্তিন প্রশ্নকে জটিল করে এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
ইরান-ইসরাইল উত্তেজনায় ‘বৃহত্তর ইসরাইল’
বর্তমান ইরান-ইসরাইল সংঘাতে- এই ধারণার ভূমিকা সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষ ও ধারণাগত। ইরান ও তার মিত্ররা প্রায়ই ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণাকে ব্যবহার করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির চিত্র তৈরি করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘প্রতিরোধ শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে ইসরাইল তার নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে।
এই পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসই সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি- যেখানে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। ইরান সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়, যেমন হিজবুল্লাহ এবং হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যা ইসরাইলের দৃষ্টিতে একটি ঘেরাও কৌশল।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণা আরও বেশি করে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা সংঘাতকে আদর্শিক মাত্রা দেয়।
এই ইস্যু নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে এক জটিল জোট রাজনীতি গড়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরাইল; অন্যদিকে ইরান-নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ অক্ষ। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ফিলিস্তিন ইস্যু এখনো একটি বড় রাজনৈতিক চাপ হিসেবে রয়ে গেছে। এই দ্বৈত অবস্থান-বাস্তববাদ ও জনমতের মধ্যে ভারসাম্য- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।
একই সাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, সামুদ্রিক সীমানা বিরোধ এবং জ্বালানি জোটÑ সবকিছুই ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ বিতর্কের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও সংঘাতের রূপান্তর
বর্তমান বিশ্ব ধীরে ধীরে একমেরু থেকে বহুমেরু ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। এখানে যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়Ñ তথ্য, আদর্শ, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। ‘বৃহত্তর ইসরাইল’-এর মতো ধারণা এই বহুমাত্রিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সংকট- যেখানে সামরিক সংঘর্ষ, কূটনৈতিক ব্যর্থতা, জ্বালানি রাজনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা একসাথে কাজ করছে। এই সংঘাতের তাৎপর্য তিনটি স্তরে গুরুত্বপূণ- আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এই সংঘাত কি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে, নাকি এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেবে? বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, যদি কূটনৈতিক অগ্রগতি না ঘটে, তাহলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী আরও গভীর হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট শুধু একটি যুদ্ধ নয়, এটি একুশ শতাব্দীর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় পরীক্ষাক্ষেত্র। এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরোধ শক্তি জয়ী হলে একসময় ইসরাইলের মানচিত্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুছে যেতে পারে। আর ইসরাইল জয়ী হলে মুসলিম উম্মাহকে আরো দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে হবে