দেশে বাড়ছে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা
৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১৮
বাড়ছে শঙ্কা ও উদ্বেগ
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে ভূমিকম্প স্বাভাবিক বিষয় থাকলেও গত বছরের নভেম্বরে ঘটে যাওয়া কম্পন মানুষকে চরম আতঙ্কিত করেছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটতে সময় লেগেছে কয়েক মাস। সব বয়সী মানুষ কয়েক মাস ট্রমার মধ্যে ছিলেন। কোনো কারণে চেয়ার-টেবিল নড়াচড়া করলেই যে কারো মনে হতো ভূমিকম্প হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের সেই ভূমিকম্পে শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশও কেঁপে ওঠে। এরপর থেকে প্রায় ভূমিকম্প হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিলও ভূমিকম্প হয় দেশে। আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হওয়া ভূমিকম্পগুলোর তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে বৃহত্তর সিলেট এলাকায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যেসব ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে গড়ে প্রতি ১৩ দিনে একটি ভূমিকম্প ঘটেছে দেশে।
ধারাবাহিক ভূমিকম্পে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। কেননা গত বছরের নভেম্বরের ভূমিকম্পনে বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় ফাটল ধরার পাশাপাশি ভবন ও দেওয়াল ধসে ১০ জনের মৃত্যু ঘটে। বিগত প্রায় তিন দশকের মধ্যে দেশে সবচেয়ে মারাত্মক ভূমিকম্প হয়েছে ২১ নভেম্বর ২০২৫। ওই ভূমিকম্পটি বাংলাদেশ সময় সকাল ১০:৩৮:২৬ সময়ে আঘাত হানে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মাধবদীর নিকটে এবং এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ (টঝএঝ) ভূমিকম্পটির মাত্রা গি ৫.৪ হিসেবে নির্ধারণ করে। আর বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর (ইগউ) এর মাত্রা গখ ৫.৭ বলে জানায়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের মতে, ভূমিকম্পটির কম্পন ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। কম্পন শুধু বাংলাদেশেই নয়, কলকাতা ও ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যেও অনুভূত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অনুমান করে যে ঢাকায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ এবং নরসিংদীতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ তীব্র কম্পন অনুভব করেছেন। গত ৩০ বছরে এটিই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প, যা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমার শক্তির সমতুল্য শক্তি নির্গত করেছিল।
গত বছরের নভেম্বরের মূল ভূমিকম্পের পর অন্তত চারটি পরাঘাত (আফটারশক) শনাক্ত করা হয়। প্রথম পরাঘাতটি আঘাত হানে ওইদিন সকালেই। যার উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশে। পরবর্তী দুটি পরাঘাত আঘাত হানে ওইদিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬:০৬:০৪ মিনিটে। এর মধ্যে একটি পরাঘাতের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা এলাকায়, আর অন্যটির উপকেন্দ্র ছিল নরসিংদীতে। পরাঘাতগুলোর একটির মাত্রা ৪.৩। ভূমিকম্পের সময় এবং পরবর্তী মুহূর্তে বহু মানুষ ভবন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। সারা দেশে বিভিন্ন ভবনে আগুন লাগে, ফাটল ধরে, হেলে পড়ে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ভূমিকম্পের পরপরই সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্নিত হয় এবং ফলে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট দেখা দেয়। নরসিংদীতে পাঁচজন, ঢাকায় চারজন এবং নারায়ণগঞ্জে একজনসহ মোট কমপক্ষে ১০ জন মারা গেছেন এবং সারা দেশে ৬০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এর আগে বড় ভূমিকম্পন হয় ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসেম যার মাত্র ছিল ৬.১।
সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল সকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্পন হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫। এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা। আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সূত্র জানিয়েছে, গত ২১ এপ্রিল সকাল ৬টা ২৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মণিপুর রাজ্য। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল ৪৩৬ কিলোমিটার।
আবহাওয়া অধিদফতরের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পপ্রবণ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে আছে বাংলাদেশ। তাই এ দেশে যে ভূমিকম্প মাঝেমধ্যে হবে, সেটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন তারা। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, সম্প্রতি দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের কম ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্প বেড়ে গেছে।