নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা না কাটলে চরম মূল্য দিতে হবে


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১২

॥ জামশেদ মেহদী ॥
নির্বাচনের আর মাত্র ২৬-২৭ দিন বাকি। এখনো দেখি একটি চিহ্নিত মহলের নির্বাচন নিয়ে সংশয়। গত ১১ জানুয়ারি রোববার অন্তত ৩টি ইউটিউব ভিডিওতে দেখলাম, বলা হয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নাও হতে পারে। গত ১২ জানুয়ারি সোমবার আরেক বহুল পরিচিত ইউটিউবার বলেছেন যে, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ইতোমধ্যেই ঢাকা এসে পৌঁছেছেন এবং দায়িত্বভারও গ্রহণ করেছেন। এখন ঐ ইউটিউবার গল্প ফেঁদেছেন যে, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাজ হবে দুটি। একটি হলো, বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চীনের দিকে অনেক বেশি হেলে পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের প্রধান কাজ হবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কারণে দেশটিকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে চীনের নিকট থেকে যতদূর সম্ভব সরিয়ে আনা। আর দ্বিতীয় কাজ হলো, আসন্ন নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। অর্থাৎ এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিয়ে আসা।
ইদানীং এ ধরনের ইউটিউবারের উৎপাত বড় বেড়ে গেছে। যেখানে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এবং চূড়ান্তভাবে কে টিকলেন বা না টিকলেন, সেই কাজটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নির্বাচন না হওয়ার বা শেষ মুহূর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার খোয়াব রীতিমতো দিবাস্বপ্ন। আমি সোনার বাংলায় একাধিকবার বলেছি এবং আজও বলছি যে, নির্বাচন যথাসময়েই অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে সেই নির্বাচন কতদূর অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং সেখানে রাজনৈতিক দলসমূহের লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড কতদূর রক্ষিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। ইতোমধ্যেই জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক রাজনৈতিক দল ও মহল নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্পর্কে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক পাওলা পাম্পালোনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সাথে জামায়াতের আমীরের বসুন্ধরা অফিসে দেখা করতে গেলে জামায়াত আমীর উপরোক্ত আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দৈনিক ‘সমকালের’ রিপোর্ট মোতাবেক, বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে আমীর সাহেব বলেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন যেভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে, তার ফলে নির্বাচন কতদূর অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, সেটি নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
মিটিং থেকে বের হয়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. তাহের বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, গত এক-দুই সপ্তাহে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এবং প্রশাসন যেভাবে আনুগত্য দেখাচ্ছে, এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অতীতের মতো পাতানো নির্বাচন হবে কি না। জামায়াত মনে করে, পাতানো নির্বাচন বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নিরাপত্তায় সরকারের বন্দোবস্তের প্রতি ইঙ্গিত করে আবদুল্লাহ তাহের বলেন, একজন ব্যক্তি এসেছেন, তাঁর নিরাপত্তা অবশ্যই দরকার। কিন্তু যেভাবে তা দেখানো হচ্ছে, তা মানুষকে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে, যা নির্বাচনী ভারসাম্য নষ্ট করেছে। নির্বাচনে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে সরকার যদি কারো নিরাপত্তায় দুজন পুলিশ দেয়, তাহলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকেও দুজন দিতে হবে। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।
মূলধারা বলে প্রচারকারী একটি বাংলা দৈনিকে সামরিক বাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরের বক্তব্য প্রচার করা হয়। তার নাম মেজর এমদাদ। মেজর এমদাদের সেই বক্তব্যটি আবার জার্মান ডয়েচে ভেলেতে সম্প্রচারিত হয়। ঐ মেজর বলেন, বিএনপিতে অন্তত ৫০ জন প্রার্থী দলীয় সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে বিএনপি প্রার্থীর বিপরীতে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে হাইকমান্ড মনোনীত প্রার্থীর সাথে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাতের ঘটনাও একাধিক স্থানে ঘটেছে। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, দেশে এখনো দেড় হাজারেরও বেশি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপারেশন ‘ডেভিল হান্ট’ নামে অস্ত্র উদ্ধারের ২টি অভিযান চালানো হয়েছে। তারপরও গত ১২ জানুয়ারি সোমবার একশ্রেণির পত্রপত্রিকায় দেখলাম, পিস্তল ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুরস্কারের অংকটাও লোভনীয়, লাখের অংক ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও ঐসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। শহীদ ওসমান হাদিকে ঐরকম অবৈধ অস্ত্র দিয়েই হত্যা করা হয়েছে। কারওয়ান বাজারের আধিপত্য নিয়ে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের যে নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, সেই পিস্তলটিও নাকি ঐ রকম উদ্ধার না হওয়া বেআইনি অস্ত্র। এসব অস্ত্র যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে আরো রক্ত ঝরবে বলে পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ¥ীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সী এক মেয়ের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বিএনপির নেতাসহ তার আরও দুই মেয়ে। গত ১২ জানুয়ারি সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইদিন সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে এক বরফকল ব্যবসায়ীকে গুলি করে এবং রাত ৯টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় আরেক ব্যবসায়ীকে বাড়ির ফটকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
জামায়াত বেশ কিছুদিন থেকে বলে আসছে যে, মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষ নয়। স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে যে, মাঠপর্যায়ে ডিসি, এসপি, ইউএনও এবং ওসি উদীয়মান সূর্যের (তাদের ধারণা অনুযায়ী) পূজা করা শুরু করেছেন। একটি দুটি নয়, সারা বাংলাদেশের অনেক জেলা বা উপজেলা থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, মাঠপর্যায়ের অফিসাররা একটি বিশেষ দলের প্রতি প্রকাশ্যে পক্ষপাতিত্ব করছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, বাতিল এবং আপিলকে কেন্দ্র করে মাঠের বেসামরিক আমলাদের পক্ষপাতিত্ব নগ্নভাবে ধরা পড়ছে।
এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী নমিনেশন পেপার জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে রিটার্নিং অফিসার পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৭২৩টি নমিনেশন পেপার বাতিল করা হয়। এগুলোর অধিকাংশই অত্যন্ত তুচ্ছ গ্রাউন্ডে বাতিল করা হয়। ৭২৩টি কেস একটি একটি করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যারিস্টার শাহরিয়ার, আয়নাঘরে দীর্ঘকাল আটক লে. কর্নেল হাসিনুর রহমানসহ আরো কয়েকজন বিশ্লেষক এ ব্যাপারে পরিষ্কার মন্তব্য করেছেন। নমুনা হিসেবে দুই-তিনটি কেস নিয়ে আলোচনা করছি।
কক্সবাজারে জামায়াতের প্রার্থী দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছিলো। কারণ কী ছিল? কারণ ছিলো, শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার নামে একটি মামলা ছিলো। এ সম্পর্কে যথাযথ কাগজপত্র তিনি নমিনেশন পেপারের সাথে সাবমিট করেননি। শেখ হাসিনার মামলা নিয়ে জুলাই বিপ্লবের কাণ্ডারির নমিনেশন পেপার বাতিল করাÑ এমন বিষয় কি বিশ্বাস করা যায়? নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে কমিশন অফিস থেকে বলা হয় যে, অত্যন্ত ‘সিলি’ গ্রাউন্ডে অর্থাৎ তুচ্ছ কারণে তার নমিনেশন বাতিল করা হয়েছিলো। কমিশন মাত্র ২ মিনিটের শুনানিতে তার প্রার্থিতা ফেরত দেন।
আরেকটি চরম অভিজ্ঞতা ও হেলাফেলা করে নমিনেশন পেপার বাতিলের ঘটনা ঘটেছে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার ক্ষেত্রে। প্রথমে তাকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করা হয়। যে ব্যক্তি খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ জমা দিয়েছেন তার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। মান্না ২ শতাংশের বেশি জমা দিয়েছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের হেড অফিস তাই সেই ঋণ পুনঃতফসিল করে। কিন্তু তার পরেও ব্যাংকের জেলা শাখা তাকে ঋণখেলাপি হিসাবে কল ব্যাক নোটিশ দেয়। অতঃপর সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বেঞ্চ তাকে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে খারিজ করে দেয় এবং জেলা শাখার কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করে স্ট্যান্ড রিলিজ করে।
মান্না বগুড়া-২ এবং ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। একই মনোনয়নপত্রের ২ সেট তিনি ২ কেন্দ্রে দাখিল করেন। বগুড়ায় বিএনপি প্রায় ২শত লোক দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা করে নিয়ে ডিসি ও এসপিকে মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য করে। অথচ ঢাকা-১৮ আসনে সেটি বৈধ হয়। এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার, লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান প্রমুখ প্রশ্ন তোলেন, একই মনোনয়নপত্র ঢাকায় বৈধ হলে বগুড়ায় অবৈধ হয় কীভাবে? গত ১১ জানুয়ারি রোববার নির্বাচন কমিশন আপিল শুনানিতে মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে তার বগুড়ার মনোনয় বৈধ ঘোষণা করে।
তাসনিম জারা আইন মোতাবেক ১ শতাংশেরও বেশি সমর্থকের স্বাক্ষরসহ নমিনেশন পেপার দাখিল করেন। রিটার্নিং অফিসার কোনো যুক্তি সংগত কারণ ছাড়াই তার নমিনেশন অবৈধ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ইলেকশন কমিশন কয়েক মুহূর্তের শুনানিতেই সেটি বৈধ বলে ঘোষণা করেন।
এ ধরনের উদাহরণ দিয়ে এ ভাষ্যের কলেবর বাড়াতে চাই না। ইসলামী আন্দোলনের অনেক প্রার্থীর নমিনেশন বাতিল করা হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রার্থী আপিলে তাদের প্রার্থিতা ফেরত পান।
দল-মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মতামত দিচ্ছেন যে, যেভাবে দলবিশেষ বা নেতাবিশেষকে বিশেষ প্রটোকল ও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, তার ফলে দেশ-বিদেশে এরকম একটি বার্তা যাচ্ছে যে, ঐ দল বা ব্যক্তিবিশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতায় যাচ্ছে। সুতরাং মাঠ প্রশাসন আগে থেকেই তাদের খুশি করায় ব্যস্ত হয়ে গেছে।
যারা জুলাই বিপ্লব নিয়ে ভাবেন, তারা বলেন যে, যদি এরকম অগ্রিম আনুকূল্য দেখানো হতে থাকে, তাহলে আওয়ামী প্রশাসন এবং বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না। আর প্রশাসনের এরকম অগ্রিম আনুকূল্যে দলবিশেষ যদি আগামী ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় যায়, তাহলে জুলাই বিপ্লব সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। কারণ জুলাই বিপ্লব ঘটেছেই পুরোনো বন্দোবস্ত ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে নতুন বন্দোবস্ত দিয়ে দেশ এবং রাজনীতি সাজানোর জন্য। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি যদি কাটিয়ে ওঠা না যায়, তাহলে বাংলাদেশকে অনেক অনেক বড় মূল্য দিতে হবে।
Email: [email protected]

বাংলা সাহিত্যে রোজা
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬

আল মাহমুদের গল্পে প্রেম ও প্রকৃতি
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫

প্রেরণার বাতিঘর : আল মাহমুদ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪

বাবারা এমনই হয়
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৩