স্মৃতির পাতায় কবি মুকুল চৌধুরী


১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৮

॥ শরীফ আবদুল গোফরান ॥
সাহিত্য অন্তরের অভিব্যক্তি। যিনি তা নির্মাণ করেন, সেই নির্মাতাকে আমরা স্মরণ করি, খুঁজে দেখি কিংবা আবিষ্কারের চেষ্টা করি। এখানে আছে অন্তরের নিরন্তর তাড়না। সমাজের মানুষে মানুষে বিরোধ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিরোধ সম্ভবত ভাবরাজ্যে। আমরা কবি ও শিল্পীর কাব্যধর্ম ও শিল্পসত্তার বিচারে তাদের পরিচিতিকে চিহ্নিত করি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে। সমালোচকদের কোনো কোনো বিচার প্রশ্নাতীতভাবে হয়ে ওঠে নির্ভুল, আবার কখনো তাদের বিচার-বিবেচনা নিয়ে জন্ম নেয় সংশয়, সন্দেহ ও বিতর্ক। আমাদের বিচারবুদ্ধি কখনোবা অনুজ্জ্বল ব্যক্তির দেহে ছড়িয়ে দিতে পারে নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা। আবার তেমনি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নামে ছড়াতে পারে কলঙ্কের কালিমা।
আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি মুকুল চৌধুরীর সাহিত্যের রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়েছে দীপ্তিময় সূর্যের উজ্জ্বলতায়। এর সকল পরিচয়ে ছড়িয়ে রয়েছে এক অসামান্য শিল্পীর আত্ম-প্রতিকৃতি।
সুরমা, কুশিয়ারা, যমুনা, গোয়াই নদীর স্বচ্ছ পানিতে প্লাবিত শ্রীময় ভূমির নাম সিলেট। সবুজ টিলা আর শ্যামল বর্ণের মাঝখানে ভারি সুন্দর জায়গা সিলেট। একদিকে ঝাউগাছের পাতায় বাতাসে মর্মর ধ্বনি, আরেকদিকে নির্জন দুপুরে পায়রাদের নিষ্পাপ ওড়াউড়ি। অন্যদিকে দুটি পাতা একটি কুড়ির চা-বাগানে খাসিয়া মেয়েদের টুকরি ভরে চা-পাতা সংগ্রহ দেখে মনে হয়, আল্লাহ বুঝি অনেক মমতা, অনেক যত্ন নিয়ে রঙিন তুলিতে এঁকেছেন এ অঞ্চলকে। খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, আর কূল-কিনারাহীন হাওরের আরেক সৌন্দর্য। সফটিক স্বচ্ছ পানিতে দরিয়ার মতো ঢেউ জাগানো হাওরের ওপর যেন ভাসছে শাহজালালের পুণ্যভূমি সিলেট।
হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, করিমগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটÑ এই পাঁচটি জেলাই ছিল একসময় মহকুমা। আর এই পাঁচটি মাহকুমা নিয়েই ছিল সিলেট জেলা। এই সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার ইউনিয়নের খালপার গ্রামে ১৯৫৮ সালের ২২ আগস্ট কবি মুকুল চৌধুরীর জন্ম। তার পিতা বদরুর রাজ্জাক চৌধুরী। মাতা সালেহাতুন্নেসা চৌধুরী। তার পূর্ণ নাম মো. মঞ্জুরুল করীম চৌধুরী। তবে সে মুকুল চৌধুরী নামেই লেখালেখি করতেন। ফলে সাহিত্যপ্রেমিকরা মুকুল চৌধুরী নামেই তাকে চিনতো। কবি মুকুল চৌধুরী ছিলেন স্নিগ্ধ মেজাজের মানুষ। তার চিত্তের আনন্দ-স্নিগ্ধ হাসির আমেজ চোখে-মুখে কণ্ঠে ফুটে উঠতো। সদালাপী, বন্ধুবৎসল এ মানুষটি কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও সুধী পরিবৃত থাকতে ভালোবাসতেন। কঠিন পরিশ্রমী এ মানুষটির মন অকৃত্রিম ভালোবাসায় ভরপুর ছিল।
কবি মুকুল চৌধুরী ঐতিহ্যবাদী কমিটেড কবি। বড়দের জন্য সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা রাখতেন তেমনি শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও তিনি তার ঐতিহ্যপ্রীতি ও উদ্দেশ্য থেকে সরে দাঁড়াননি। শিশুসাহিত্যে তিনি শিশুদের কোমল বৃত্তির পুষ্পকরকে আদর্শ ও চিরন্তন সত্যের সৌরভ পরশ দিয়েছেন।
কবি মুকুল চৌধুরীর স্মৃতিচারণের ঝাঁপি খুলতে চাইলেও অত সহজে খুলতে পারছি না। কত মানুষই তো ঝরে যায় অকালে কিংবা কালের ক্রদ্ধতায় কত মানুষের অন্তিম শয্যা রচিত হয়। এই আকস্মিক বিদায়কে আমরা বেদনার আঁচড়ে লিখে রাখি। তাকে স্মরণের আবরণে ধরে রাখতে চাই। এ বুঝি মানব হৃদয়ের অক্ষম ভালোবাসার ঋণ শোধের খেয়ালিপনা। মুকুল চৌধুরীকে নিয়ে এ খেয়ালিপনা আমি করতে পারি না। কারণ মুকুল ছিলেন আমার প্রিয় সাথী, প্রিয় বন্ধু।
মুকুলের সাথে আমার অনেকগুলো সময় কেটেছে। মাসিক ফুলকুঁড়ি পত্রিকা প্রকাশনায় দুজনই সময় দিতাম। আবার সাহিত্যাঙ্গনে একই সাথে ঘোরাফেরা করতাম। মুকুল যেখানে যেতেন, আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন। আবার রাতে একই সাথে ৯৪/১ নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ফুলকুঁড়ি অফিসে কখনো আড্ডা দিয়ে আবার কখনো ঘুমিয়ে রাত পার করে দিতাম।
এলিফ্যান্ট রোডের সেই আড্ডায় ঐ সময় অংশ নেননি এমন কবি সাহিত্যিক খুব কমই ছিলেন। কবি আফজাল চৌধুরীর মতো বড় কবিরা পর্যন্ত ফুলকুঁড়ির এলিফ্যান্ট রোডের আড্ডার লোভ সামলাতে পারেননি। তিনি প্রায় রাতে চলে আসতেন আমাদের সাথে রাত কাটিয়ে দিতেন। আসতেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি আসাদ বিন হাফিজ, সিলেট থেকে কোনো কাজে কেউ ঢাকায় এলে ঠিকানা ছিল ৯৪/১ নিউ এলিফ্যান্ট রোড। মুকুলের সাথে সম্পর্কের কারণে কবি সোলায়মান আহসান, কবি ফরিদ আহমদ রেজা, সিলেট কণ্ঠের সম্পাদক মোস্তাবিসুন নূর, এডভোকেট শাহ আলম মহিউদ্দীন আরো কতো সাহিত্যিক-সাংবাদিক এসে আড্ডা দিতেন, রাত কাটাতেন। আমরা হাতিরপুল বাজার থেকে শাকসবজি আনতাম, রাতে খিচুড়ি রান্না হতো, গভীর রাতে খাওয়া হতো। সে কী আনন্দ, তাকি ভুলা যায়? আমি, মুকুল চৌধুরী, শিল্পী আবদুল মান্নান আমরা নিয়মিত থাকতাম। আমাদেরকে কেন্দ্র করেই এই আড্ডা জমতো।
মুকুল চৌধুরী আর আমি আমরা দুজন মাসিক ফুলকুঁড়ি পত্রিকায় কাজ করতাম। আমরা লেখা সংগ্রহ, বাণিজ্যিক দিক ও প্রকাশনার দিক দেখতাম। মুকুল প্রতিদিন অন্তত একবার শিল্পকলা একাডেমিতে যেতেন কবি আল মাহমুদের সাথে দেখা করতে। তাই আমাকেও সাথে নিয়ে যেতেন। ওসব দিনের কথা মোটেও ভুলা যায় না। লিখতে গেলে ছোট করে লেখা যায় না। সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণের আমার প্রিয় সাথী, প্রিয় বন্ধু মুকুলকে নিয়ে লিখতে গেলে অনেক স্মৃতি, অনেক ভালোবাসার কথা লিখতে হয়।
ভালোবাসার এ মানুষটি আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছেন গত ২২ এপ্রিল রাতে। আমাদেরও কোনো একসময় চলে যেতে হবে। কিন্তু তার এই চলে যাওয়াকে মোটেও ভুলতে পারছি না। কবি মুকুল চৌধুরীর বিশালতাকে, বড়ত্বকে কোনোভাবেই এই অল্প কথায় প্রকাশ করা মোটেও সম্ভব নয়। এটা আমার অক্ষমতাই বলবো। বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে মুকুল চৌধুরী একজন সমাজ সচেতন, আদর্শিক ও শুদ্ধ মননের সাহিত্যিক হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। ফলে জ্যোতিজ্যোৎস্নার কবিতা কেউ না কেউ হয়তো একদিন জাতির সামনে ফুলের পাপড়ির মতো মেলে ধরবে। সে সুবাসে আমোদিত হবে বাংলার হাট, মাঠ, প্রান্তর। তখন স্মৃতির পাতায় জেগে উঠবে কবি মুকুল চৌধুরীর নাম। সুগন্ধি রুমালের মতো।