প্রসঙ্গ : এম আহমদ আলীর কাব্যে কুরআন
১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩
॥ প্রফেসর মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম ॥
কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদের যারা মনোযোগ সহকারে কথা (কুরআন) শ্রবণ করে এবং তার মধ্যে যা উত্তম, তা অনুসরণ করে (সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হয়), আল্লাহ তাঁদের সৎপথে প্রচলিত করেন এবং তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। (সূরা যুমার : ১৮)। এ আলোকে যাঁর চিন্তা, জ্ঞান, গবেষণা, বিবেক সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাধনায় ব্যস্ত থাকে, যার কলম দিয়ে অনাগতকালের ভবিষ্যৎ রচনায় দিকপাল হয়ে কাজ করে, তিনিই বুদ্ধিজীবী। তিনি মরেও অমর। সেই দিক দিয়ে এম আহমদ আলী একজন বুদ্ধিজীবী। বিশেষ করে যখন বাঙালি মুসলমানরা কুরআনের জ্ঞানার্জন থেকে বহু দূর পিছিয়ে, বলতে গেলে যখন কুরআনের পরে তেমন কোনো পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশিত এবং সহজলভ্য ছিল না, তখন আহমদ আলী ‘কাব্যে কুরআন’ লিখে মুসলমানদের হৃদয়ে কুরআনের আলো জ¦ালিয়ে অন্ধকার দূর করতে প্রয়াসী হন। তাঁর উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ এবং পরিষ্কার। তিনি ভূমিকায় স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সা.) সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই তাঁর এই প্রচেষ্টা’। তাই তাঁর শ্রম-সাধনা কখনো বৃথা যায়নি।
পলাশী যুদ্ধের পর বাঙালি মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, তাদের অবস্থা চরম সংকটাপন্ন ছিল। এমনকি অস্তিত্ব সংকট প্রকট হয়ে উঠেছিল। এ সময় হিন্দুরা বহু দূর এগিয়ে গেলেও মুসলমানরা ছিল বহু পিছনে। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের পর শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং সাংবাদিকতায় মুসলমানদের সামান্য কিছু অগ্রগতি হলেও অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না। ভারত বিভক্তির পর মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে ধর্মীয় আজাদীও অর্জিত হয়। পাকিস্তানের পূর্বাংশে মাতৃভাষার চেতনাবোধও বাড়তে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা ভাষা চর্চার পথটি আরও উন্মুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এ অঞ্চলে বাংলাভাষা চর্চার ব্যাপকতা ঘটে। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ফলে বাংলা ভাষায় সৃজনশীল সাহিত্যও সৃষ্টি হতে থাকে। বাংলা সাহিত্যের এ উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি এর ধর্মীয় শাখায়ও কুরআনি সাহিত্যেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের মুসলিম পণ্ডিত, কবি-সাহিত্যিক ও লেখকরা এ উপমহাদেশে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ ও বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রবন্ধ রচনা করে আরও ব্যাপকভাবে কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি রচনা করেন। এ সকল রচনার হাত ধরেই কুরআনি সাহিত্য বাংলা ভাষায় একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে। এম আহমদ আলীর ‘কাব্যে কুরআন’ও সেই পথ অনুসরণ করে কুরআনি সাহিত্য রচনায় এক নব দিগন্ত উন্মোচন করে।
আহমদ আলী রচিত ‘কাব্যে কুরআন’ রচনার প্রেক্ষাপট
প্রথম কুরআনের বাংলা অনুবাদ কার হাত ধরে পূর্ণতা পায়, তা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। কেউ বলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন (পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক), কেউ-বা রংপুরের আমিরুদ্দিন বসুনিয়া (অপূর্ণাঙ্গ অনুবাদক), কেউ-বা নঈমুদ্দিনের নাম উচ্চারণ করেন। যাঁর হাত ধরেই পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশ হোক না কেন, তা ছিল বাঙালি মুসলমানদের জীবনে এক সপ্তশ্চার্য ঘটনা। কারণ অন্য ভাষায় আল্লাহর বাণীর কোনো অনুবাদ হওয়া অসম্ভব-উনিশ শতকে এরূপ ধারণা নিয়েই বাংলার মুসলিম সমাজ গঠিত ছিল। অঘোষিতরূপে বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা করা বা তার অনুবাদ প্রকাশ করা হারাম বলে ধর্মতাত্ত্বিকদের দ্বারা নিষিদ্ধ ছিল। তাই এ পথে অগ্রসর হতে কেউ সাহস করেনি। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে মক্কাভিত্তিক রাবেতা আল আলম ইসলামী আন্তর্জাতিক সংস্থার এক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় এবং অন্যান্য ভাষায় কুরআন অনুবাদের সকল বাধা দূরীভূত হয়। এরপর অনেকেই কুরআন নিয়ে গবেষণা করতে প্রয়াসী হন। বিংশ শতকে যারা কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত সাহিত্য ও কাব্য সাহিত্য রচনা করে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন, তাদের মধ্যে খলিলুর রহমানের লেখা ‘কেরাতুল কুরআন’ (১৯৪৭), কারী বশিরউল্লাহর ‘কাওয়ায়েদুল কুরআন’ (পায়রাডাঙ্গা, ঝিকরগাছা, যশোর, ১৯৮১-প্রবন্ধকারের নিকটে বইটি সংরক্ষিত আছে), কবি বন্দে আলি মিয়ার ‘কুরআনের গল্প’ (১৯৪৯), কাজী এ আহমদ এর ‘বৈদ্যুতিক দর্শনে কুরআন শরীফ’ (১৯৫২), (শরীফ কুরআনের শব্দ নয়, কুরআনের সাথে এরূপ শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়), খানবাহাদুর আহসানউল্লাহর ‘কুরআনের বাণী ও পরমহংশের উক্তি’ (১৯৫৬), আলাউদ্দিন আল আজহারীর ‘কুরআন বিজ্ঞান’ (১৯৬১) ইত্যাদি। যাঁরা কাব্য কুরআন সাহিত্য রচনা করে অমর হয়ে রয়েছেন তাঁরা হলেনÑ শ্রী কিরণ গেপাল সিংহ (১৮৮৫-১৯৪২) ‘আমপারার কাব্যানুবাদ’, আব্দুর রশীদ ছিদ্দিকীর (১৮৭৯-১৯৫১) গদ্যে ও পদ্যে অনূদিত ‘মহাকুরআন কাব্য আমপারা’, কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) ‘কাব্য আমপারা’, ড. মুহাম্মাদ আব্দুল কাদেরের ‘কাব্য কুরআন’ (১৯৪৮), মুহাম্মদ মহাসীন আলীর ‘কাব্য আমপারা’ (১৯৪৮), মুহাম্মাদ হাসান আলীর ‘কাব্য কুরআন’ (১৯৫৯), ডা. আব্দুর রহমানের ‘কুরআন শরীফ আমপারার কাব্যানুবাদ’ (১৯৬৪), মুহাম্মাদ রহমাতুল্লাহ বাঙ্গলিজের কুরআনের কাব্যরূপ আখ্যায় সম্পূর্ণ কুরআনের বাংলায় ‘কাব্যানুবাদ’ (১৯৮০) করেন, এম এ ওহাব নামে একজন আয়কর উকিলও কুরআনের পূর্ণাঙ্গ ‘কাব্যানুবাদ’ প্রকাশ করেন। আহমদুর রহমান ‘কাব্যে কুরআন কণিকা’ (১৯৭০), মুহাম্মাদ সুলতান আলীর ‘ছন্দেপাক (পুত) কুরআন’ (১৯৭৬), তাজুল ইসলামের ‘আল-কুরআন হইতে কাব্য’ (১৯৭৯), শরীফ হকের পবিত্র কুরআন শরীফের ‘আমপারার কাব্যানুবাদ’ (১৯৮৭), আব্দুল হাকিম তাপদানের ‘কাব্য কথায় কুরআন শরীফ’ (১৯৯৩), মুহাম্মদ ওয়াহেদ আলী আনছারীর (গরীবপুর, ছৌগাছা, যশোর-১৯০৭) ‘কাব্যে কুরআন’ (১৯৭৮)-ইত্যাদি। (ড. মোহাম্মাদ আবদুল অদুদ, বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ঢাকা: আল-কুরআন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ একাডেমী, ২০০৪, পৃ-১০০-১০৮)। এই পথ অনুসৃত হয়েই এম আহমদ আলী ‘কাব্যে কুরআন ও নানা প্রবন্ধ প্রকাশনায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন।
১৮৬১ সালে যশোরের ছাতিয়ান তলায় জন্মগ্রহণ করেন কর্মবীর মুন্সী মোহাম্মাদ মেহেরুল্লাহ এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯০৭ সালে। এম আহমদ আলী যশোরের চৌগাছার কয়ারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৫ সালে, মৃত্য ১৯৯১ সালে। এ অঞ্চলে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মুসলিম জাগরণে এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিলেন মুন্সী মেহেরুল্লাহ। মুসলিম নবজাগরণে ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকের অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর প্রেরণায় বাংলায় অসংখ্য মকতব-মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ ইতিহাস সমাজ সচেতন এম আহমদ আলীর অগোচর ছিল না। তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন এবং সাংবাদিকতায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তিনি নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াত করতেন। হিন্দু-মুসলিম নবজাগরণে কলকাতা ছিল তখন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অন্যতম রাজধানী, ঢাকা তখন অনকে পিছিয়ে। এম আহমদ আলী উপলব্ধি করেন কলকাতা থেকে লেখাপড়ায় বাংলার গ্রাম্য সমাজ বিশেষ করে মুসলিম সমাজ কত পিছিয়ে। তিনি এগিয়ে এলেন কয়েকটি বিষয় হাতে নিয়ে। ঘুমন্ত মুসলিমদের জাগরণে একই সাথে সাংবাদিকতা, শিক্ষার গোড়া পত্তনে (৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা) ও কুরআনি সাহিত্য রচনায়। তিনি অত্যন্ত কর্মঠ, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন উন্নত চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সর্বদায় আল্লাহ তার সহায় ছিলেন। কুরআনেও বলা হয়েছে, ‘ইয়াসতাজিবুল্লাযিনা আমানু ওয়ামিলুস-সালিহাত ওয়া ইয়াজিদুহুম মিন ফাদলিহি’ (সূরা আশ শুরা : ২৬) অর্থাৎ আল্লাহ তাঁদের ডাকেই সাড়া দেন, যাঁরা মুমিন এবং সৎকমপরায়ণ এবং তাঁদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ বর্ধিত করে দেন’। সালাত, সিয়াম, হজ, যাকাত উল্লেখ করার পর কখনো এত বড় পুরস্কারের কথা (জান্নাত দেওয়ার কথা) ঘোষণা হয়নি কুরআনে। কিন্তু সৎকর্মের পরে ৯৩টি স্থানে জান্নাত দেওয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে কুরআনে। তাই আহমদ আলী সারা জীবন সমাজকে নিয়ে, দেশকে নিয়ে ভেবেছেন, কাজ করেছেন। একটি ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। এম আহমদ আলীর কাজও হারিয়ে যায়নি। সমাজ আলোকিত হওয়ার উৎস খুঁজে পেয়েছে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার মধ্যে। তাই তিনি সরাসরি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে জীবন ধন্য করেছেন। তাঁর পথ এবং চিন্তা সাথে নিয়েই আগামীর দেশ-কাল-পাত্র-পরিবার-সমাজ নতুরূপে গড়ে উঠবে- এই প্রত্যাশায়।
লেখক : বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ, ঢাকা।
ইনসিটু [শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়] সরকারি নুরুন্নাহার মহিলা কলেজ, ঝিনাইদহ।