মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ ও আধুনিক বিজ্ঞান


৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৪

॥ মনসুর আহমদ ॥
মহাবিশ্বের সীমানায় মানুষের জ্ঞান এখনো পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। মহাবিশ্বের অতি কাছের কিছু সৃষ্টি নিয়ে মানুষের চিন্তা-গবেষণা সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানীরা মহাকাশে সন্ধান পেয়েছেন অনেক অজানা কিছুর, সন্ধান পেয়েছেন হীরার নেকলেসের। ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনস্ট্রেশনের (নাসা) গবেষকরা মহাকাশে নেকলেসের মতো দেখায় এমন একটি নেবুলা বা নীহারিকার সন্ধান পেয়েছেন। গবেষকরা এ উজ্জ্বল নক্ষত্রমালার নাম দিয়েছেন ‘নেকলেস নেবুলা’। গবেষকরা জানিয়েছেন, নেকলেস নেবুলার অবস্থান পৃথিবী থেকে থেকে ১৫ হাজার আলোক বর্ষ দূরের স্যাজিয়াটা নক্ষত্র পুঞ্জে। এ নেকলেস নীহারিকা ১২ ট্রিলিয়ন মাইলজুড়ে উজ্জ্বল গোলাকার এক আকৃতি ধারণ করেছে, নেকলেসের মতো দেখায়। কেন্দ্রের নক্ষত্র থেকে কতগুলোর গ্যাসের বিন্দু বা তারা একত্রে আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি শোষণ করে এ নেকলেসের আকার ধারণ করেছে।
গ্রহ-নক্ষত্র অনুসন্ধানের পাশাপাশি মহাকাশে জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞান বিরামহীন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মহাশূন্যের কোথাও অক্সিজেনের সন্ধান মিলছে, কোথাও পানির অস্তিত্বের অনুমান করছে।
যেমন- শনি গ্রহের চাঁদ (উপগ্রহ) ডাইওয়ানে অক্সিজেনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে নাসার নভো খেয়াযান ডিসকভারী। সম্প্রতি জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রতিবেদনে গবেষকরা বলেছেন, প্রতিনিয়ত সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলা দৈত্যাকার গ্যাসীয় গ্রহ শনির অন্যতম চাঁদ ডাইওয়ানের চারপাশে সম্ভবত অক্সিজেনের স্তর রয়েছে। প্রতিবেদনটির লেখক প্রফেসর অ্যান্ড্রু কটিস বলেছেন, ডাইওয়ানে অক্সিজেন পাওয়া গেলেও এত কিন্তু তরল জল নেই। তাই জীবনের সম্ভাবনাও নেই। তবে শনি ও বৃহস্পতির অন্য গ্রহগুলোয় তরল জলের সমুদ্র থাকা খুবই সম্ভব। সেটি হলে ঐ উপগ্রহগুলোয় জীবনের চিহ্ন পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে।
মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের চরম পরিণতি নিয়েও বেশ ভাবছেন। আমরা যে সৌরমণ্ডলে বসবাস করছি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভাবনার শেষ নেই।
ব্রিটিশ বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’ জানিয়েছে যে, সূর্য নাকি আর পাঁচশত কোটি বছর তার আলো ছড়াবে। সূর্যের রহস্যময়তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ভেবে চলছেন কিন্তু সূর্যকে ঘিরে চূড়ান্ত রহস্য আজও শেষ হয়নি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা পৃথিবী যখন তার অন্তিম দশার দিকে উপস্থিত হবে, তখন সূর্য হবে এর নিয়ন্তা। তখন পৃথিবীতে আসবে বিরাট পরিবর্তন। বেড়ে যাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা, আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে এবং নদী সমুদ্রের পানি তীব্র তাপ বিকিরণে বাষ্পীভভূত হয়ে যাবে। দুনিয়ার সমস্ত জীবের মৃত্যু ঘটবে।
এ বিরাট সূর্যের একদিন মৃত্যু ঘটবে। সূর্য প্রতিনিয়ত এত শক্তি ছড়ায় যা চিন্তা করা আমাদের জন্য কষ্টকর। সূর্য যে শক্তি বিকিরণ করে তার মাত্র কয়েক ভগ্নাংশ এসে পৌঁছে পৃথিবীতে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন সে শক্তির পরিমাণ ৭৮ হাজার বিলিয়ন পারমাণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত শক্তির সমান। সুর্যের মধ্যে এ শক্তি উৎপাদিত হয় পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়ায়। সূর্যের জ্বালানি হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম, যে দিন এ জ্বলানিতে টান পড়বে সেদিন সূর্যের জীবনও ফুরিয়ে যাবে। সেদিন মহাকাশে ঘটবে এক বিরাট ভয়ঙ্কর ঘটনা। সূর্য থেকে সাত শত আশি কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৃহস্পতি গ্রহ সূর্যের পৃষ্ঠ তলে এমন এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির করবে, যার পরিণতিতে পারমাণবিক চার্জ যুক্ত কণিকা মহাকাশে এক ভয়াবহ সৌর ঝড়ের জন্ম দিতে পারে। ধীরে ধীরে এ কণিকাগুলোর ঘূর্ণায়ন গতি বৃদ্ধি পাবে। কণিকাগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অণুর সঙ্গে সূর্যের চারপাশে ঘিরে থাকা নানা গ্যাসের বিক্রয়ায় আকাশ হয়ে উঠবে অসম্ভব উজ্জ্বল। তবে এ উজ্জ্বলতা হবে ক্ষণস্থায়ী। কণিকাগুলো দ্রুত শীতল ও নি®প্রভ হয়ে এক কঠিন পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। সূর্যের ভিতরে থাকা তখন সামান্য পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম সূর্যের বাইরের স্তরকে আচ্ছাদিত করে ফেলবে। পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে মহাশূন্যে যে ছাই সৃষ্টি হবে তা হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সাথে মিশে একটি আচ্ছাদন সৃষ্টি হয়ে সূর্যকে ঘিরে ফেলবে। ফলে সূর্যের তাপ মাত্রা কমে যাবে এবং তার আকারেও সংকোচন ঘটবে। সংকোচনের ফলে সূর্যের তাপ মাত্রা কমে যাওয়া ও আকারে ছোট হওয়ার কারণে সৌরমণ্ডল অসম্ভব ঠাণ্ডা ও আঁধারে ডুবে যাবে। আর এ ভাবে আমাদের সৌরজগতের মৃত্যু ঘটবে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। বিজ্ঞানের এ তথ্য কুরআনের ‘ইযাশ্ শামসু কু’য়েরাতÑ যখন সূর্যকে গুটিয়ে ফেলা হবে’ এ ঘোষণাকে সমর্থন করে।
মহাবিশ্বের প্রলয় সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা : ‘তিনি আসমান জমীনকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং যেদিন তিনি বলবেন হাশর হও সেদিনই হাশর হবে। তাঁর কথা সর্বাত্মকভাবে সত্য এবং যে দিন শিংগায় ফুঁ দেওয়া হবে সেই দিন নিরংকুশ বাদশাহী তারই হবে।’ কুরআনে বর্ণিত শিংগার ফুঁক যে বিজ্ঞানের ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ নয় তা জোর করে বলা চলে না। ‘শিংগার ফুঁকের সঠিক রূপ ও ধরন কেমন হবে তার বিস্তারিত বিবরণ মানুষের জ্ঞানের অতীত। কুরআন থেকে আমরা যতটুকু জানতে পারি তা হলো, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নির্দেশে একবার শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে। ফলে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর এক অজানা দীর্ঘকাল পরে (কতকাল পরে তা আল্লাহই ভালো জানেন) দ্বিতীয় বার শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে এবং প্রথম ও শেষ সমগ্র সৃষ্টি কুল পুনর্বার জীবন্ত হয়ে নিজদের হাশরের ময়দানে উপস্থিত পাবে। প্রথম বার শিংগায় ফুঁক দেওয়ার ফলে সমগ্র সৃষ্টির ব্যবস্থা চূর্ণবিচূর্ণ হবে এবং দ্বিতীয় বারের শিংগার ফুঁকে অপর একটি বিশ্বলোক নতুন রূপ ও নবতর বিধানের ভিত্তিতে অস্তিত্ব লাভ করবে।’ (তাফহীমুল কুরআন)।
এ মহাবিশ্বে এক রহস্যময় বস্তু আছে যা দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য বস্তুর নাম ডার্ক ম্যাটার। আমাদের চোখে দৃশ্যমান স্বাভাবিক বস্তু মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ। বাকি সব ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে মহাবিশ্বের গঠন উপাদানের মাত্র পাঁচ শতাংশ স্বাভাবিক বস্তু, ২৫ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ৭৫ শতাংশ ডার্ক এনার্জি। এ ডার্ক ম্যাটার আলো বা ইলেকট্রো- ম্যাগনেটিক বিকিরণ ঘটায় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন মহাবিশ্বের ত্বরিত সম্প্রসারণের জন্য এই ডার্ক এনার্জি মূলত দায়ী। মহাবিশ্ব বিলয় সম্পর্কে একটা থিওরি রয়েছে যা ‘বিগ রীপ’ নামে পরিচিত। এ থিওরি মতে ডার্ক এনার্জির কারণে যে বিশ্ব সম্প্রসারণ চলছে তার গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মহাবিশ্বের সব কিছু চরম ভাবে হঠাৎ একে অপর থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেÑ যেন মহাবিশ্বে কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।
মহাবিশ্ব ক্রমেই সম্প্রসারণ হচ্ছে। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যাডাম রিয়েস প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মহাবিশ্ব কতদূর সম্প্রসারিত তার সংবাদ দিয়েছে ‘হাই্য়ার-জেড এসএন সার্চ প্রজেক্ট’ নামক একটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এ প্রকল্প ১০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব পর্যন্ত মহাবিশ্বের বিস্তরণ চিহ্নিত করেছে। এখানেই শেষ নয়। এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ এক দিন বন্ধ হয়ে যাবে। মহাবিশ্ব একসময় শেষ হয়ে যাবে এ নিয়ে যেসব বৈজ্ঞানিক মতবাদ আছে, তার ভিতরে একটি বিখ্যাত মতবাদ ‘ক্রাঞ্চ থিওরি।’ এই থিওরি অনুসারে ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে, যখন আমাদের এ মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়া কার্যক্রমই বন্ধ হবে না, বরং প্রচণ্ড মহাকর্ষের কারণে মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হয়ে প্রচণ্ড (সুপার) উত্তপ্ত, প্রচণ্ড (সুপার) ঘনত্বের একটি অদ্ভুত বস্তুর (সিঙ্গুলারিটি) রূপ ধারণ করবে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন, এই সংকোচনে সৃষ্ট ‘ব্লাকহোল’ চূড়ান্ত ভাবে আর একটি ‘বিগ ব্যাংগ’ সৃষ্টি করবে। এ মহাবিশ্ব বিগ ব্যাংগ-এর কারণে সৃষ্ট সম্প্রসারণ- মোমেন্টাম ও মহাকর্ষের দোটানায় অবস্থান করছে। সম্প্রসারণ হার নির্ণয় করা হয় ‘হাবল কনস্টান্ট’ দ্বারা। হাবল কনস্টান্ট হলো মহাবিশ্বের আপত প্রতীয়মান (অ্যাপারেন্ট) সম্প্রসারণের হার অর্থাৎ পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির সরে যাওয়ার গতি এবং পৃথিবী ও গ্যালাক্সির দূরত্বের অনুপাত। মহাকর্ষ শক্তিনির্ভর করে বস্তুর ঘনত্ব ও মহাবিশ্বের মাঝে বস্তু যে চাপে বিদ্যমান তার উপরে। মহাবিশ্বের অস্তিত্বনির্ভর করছে তার ঘনত্বের ওপর। যদি মহাবিশ্বের ঘনত্ব ক্রিটিকাল ডেনসিটির চাইতে বেশি হয় তখন মাহাকর্ষ সম্প্রসারণ সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে মহাবিশ্বকে ধ্বংস করে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’-এর স্তরে উপনীত করবে। কিন্তু যদি মহাবিশ্বের ঘনত্ব ক্রিটিকাল ডেনসিটির চেয়ে কম হয়, তখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ করতেই থাকবে, আর তখন মহাকর্ষ শক্তি সম্প্রসারণ গতিকে শুধু মাত্র মন্থর করতে পারবে। তখন সে ক্ষেত্রে বিগ ক্রঞ্চের মতো কোনো বিপরীত টান আর ঘটবে না বরং সে ক্ষেত্রে ‘বিগ চিল’ বা মহা ঠাণ্ডা বা শৈত্য করণ ঘটবে যার ফলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে শীতল হতে থাকবে যতদিন না পর্যন্ত মহাবিশ্বে বিরাজিত সমস্ত কিছুর ধ্বংস না ঘটবে। এভাবেই মহাবিশ্ব শেষ হয়ে যাবে, শুধু টিকে থাকবেন মহান সৃষ্টিকর্তা আলাহ তায়ালা- ‘কুল্লু মান আলাইহা ফান ওয়া ইয়াবক্কা ওয়াজহু রাব্বিকা জুল জালালি ওয়াল ইকরাম।’- আবার শিংগা বেজে উঠবে, বিগ ব্যাংগ সৃষ্টি হবে। মানুষ নতুন জগতে হাজির হয়ে নতুনভাবে অনন্ত জীবন শুরু করবে। এভাবেই হয়তো অনন্তকাল ধরে বিগ ব্যাংগ ও বিগ ক্রাঞ্চের খেলা চলতে থাকবে। এ ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞানই চূড়ান্ত, মানুষের জ্ঞান সত্যিই অতি সামান্য।
১. (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ আগস্ট-২০১১)।
২. (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ মার্চ-২০১২)।
৩. (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ সেপ্টেম্বর-২০১১)।