জানুয়ারির প্রথম সকাল
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০৬
॥ আনিসুর রহমান এরশাদ ॥
শীতের সকাল। জানালার কাচে কুয়াশা জমে আছে। এ সময় ঘুম ভাঙলেও কম্বল ছেড়ে উঠতে মন চায় না। তবু আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন ঠাণ্ডা বাতাসে ভেসে আসে, তখন সেই পবিত্র ডাকে সাড়া দিতেই হয়। কখনো আম্মু, আবার কখনো আব্বু গরম পানির সঙ্গে হালকা কুসুম মিশিয়ে অজুর জন্য পানি প্রস্তুত করে দেন। অজু করে নামাজে দাঁড়ালে বুকের ভেতর এক ধরনের উষ্ণ শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ফজরের নামাজ শেষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে যখন ধীরে ধীরে আলো ফোটে, তখন মনে হয়- দিনটা যেন আল্লাহর নামে নতুন করে শুরু হলো। শীতের সকাল তখন আর কষ্টের নয়; হয়ে ওঠে আত্মার প্রশান্তির সময়।
জানুয়ারির ১ তারিখ, ইংরেজি নববর্ষ। ৩১ ডিসেম্বর রাত বারোটার পর বাইরে পটকা ফোটার শব্দে আদিফার ঘুমাতে একটু দেরি হয়েছিল। তবু সকাল সকাল উঠতে পেরে এবং সময়মতো নামাজ আদায় করে আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে সে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত শেষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে বড় বোন আরিবাকে জিজ্ঞেস করল, আপু, আজই কেন ইংরেজি নববর্ষ? সবসময়ই কি জানুয়ারি থেকেই বছর শুরু হতো? আরিবা মুচকি হেসে বললেন- না, সবসময় না। এর পেছনে আছে অনেক দিনের গল্প। শুনবে? আদিফা আনন্দে চিৎকার করে উঠল-শুনব! শুনব!
আরিবা গল্প শুরু করলেন। অনেক আগে, যখন মানুষ ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার বানাতে জানত না, তখন তারা চাঁদ, সূর্য আর ঋতু দেখে সময় হিসাব করত। ইংল্যান্ডের মতো দেশে মানুষ মাঠে গর্ত করে সূর্যের ছায়া দেখে বুঝত-কখন বীজ বুনতে হবে, কখন ফসল কাটতে হবে। আদিফা আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল, তারপর কী হলো?
-এরপর এলো রোমানরা। তারা একটি ক্যালেন্ডার বানাল, যার নাম জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। এ ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছর পরপর একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হতো, যাকে আমরা লিপ ইয়ার বলি।
আদিফা মাথা নেড়ে বলল, এটা তো এখনো আছে! আরিবা বললো- আছে, তবে একটু বদলে গেছে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের একটি সমস্যা ছিল। এটি বছরে প্রায় ১১ মিনিট বেশি ধরে নিত। শুনতে কম মনে হলেও শত শত বছরে এ ভুল অনেক বড় হয়ে যায়। আরিবা যোগ করলেন, আরও মজার ব্যাপার জানো? তখন ইংল্যান্ডে নতুন বছর শুরু হতো ২৫ মার্চ থেকে, যাকে বলা হতো ‘লেডি ডে’। আদিফা চোখ বড় করে বলল, তাহলে জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি কী ছিল?
-সেগুলো আগের বছরের অংশ হিসেবেই ধরা হতো। তাই কেউ যদি ১০ ফেব্রুয়ারিতে জন্মাত, তার জন্মসাল লেখা হতো আগের বছর। আদিফা হেসে ফেলল। কী গোলমেলে! আরিবা বললো- ঠিক তাই। এজন্য এ পদ্ধতিকে বলা হতো ‘ওল্ড স্টাইল’।
আরিবা বলতে থাকলো, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবগুলো ধীরে ধীরে ঋতুর সঙ্গে মিলছিল না; বিশেষ করে ইস্টার। তাই ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ একটি নতুন ক্যালেন্ডার চালু করেন। আদিফা জানতে চাইল- সেটাই কি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার?
-হ্যাঁ। এতে নিয়ম করা হয়- যেসব বছর ১০০ দিয়ে ভাগ যায়, সেগুলো লিপ ইয়ার হবে না, যদি না ৪০০ দিয়ে ভাগ যায়। এতে সূর্যের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের মিল অনেক ভালো হয়।
আদিফা প্রশ্ন করল- তাহলে সবাই এটা নিল না কেন? আরিবা বললো- কারণ এটি পোপের তৈরি ছিল। ইংল্যান্ড তখন প্রোটেস্ট্যান্ট দেশ। তারা ভাবল, ‘পোপের ক্যালেন্ডার আমরা মানব না।’ তাই ইউরোপের অনেক দেশ নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করলেও ইংল্যান্ড তখনো পুরোনোটাই চালিয়ে গেল। কিন্তু এতে সমস্যা বাড়তে লাগল। ১৭০০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের ক্যালেন্ডার ইউরোপের চেয়ে ১১ দিন পিছিয়ে পড়ে।
আদিফা বিস্মিত হয়ে বলল, তাহলে কী হলো?
-শেষে ১৭৫০ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিল এ সমস্যা আর চলতে দেওয়া যাবে না। তারা একটি আইন পাস করল-ক্যালেন্ডার (নিউ স্টাইল) অ্যাক্ট ১৭৫০। তারপর ১৭৫২ সালে ঠিক করা হলো- নতুন বছর শুরু হবে ১ জানুয়ারি থেকে। আর সেপ্টেম্বর মাসে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।
আদিফা ফিসফিস করে বলল, কী ঘটনা? আরিবা বললো- ২ সেপ্টেম্বরের পরের দিন আর ৩ সেপ্টেম্বর এলো না।
সরাসরি হলো ১৪ সেপ্টেম্বর। হারিয়ে গেল মাঝের পুরো ১১ দিন! কিছু মানুষ তখন চিৎকার করেছিল, ‘আমাদের দিন ফিরিয়ে দাও!’ অবশ্য মানুষ প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হলেও ধীরে ধীরে সবাই মানিয়ে নিয়েছিল।
গল্প শেষ করে আরিবা বললেন, এভাবেই জানুয়ারির ১ তারিখ ইংরেজি নববর্ষ হলো। এখন আমরা যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, সেটাই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। আদিফা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল- রোদ উঠছে। নতুন দিনের আলো। সে বলল- তাহলে নতুন বছর মানে শুধু নতুন ক্যালেন্ডার না, মানুষ বদলাতেও শিখেছে, তাই না? আরিবা আদিফার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো- একদম ঠিক। ভুল বুঝলে ঠিক করা আর সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলাই নতুন বছরের আসল শিক্ষা। আদিফা হেসে বলল, আর ভাগ্যিস এগারো দিন এখন আর হারায় না! দুজন একসঙ্গে হেসে উঠল। তাদের হাসি শুনে আম্মু নাশতা হাতে এসে পাশে বসে পড়লেন।
আরিবা বললেন, জানুয়ারির প্রথম সকাল তখন আর শুধু একটি তারিখ নয়, এটি হয়ে উঠল ইতিহাস, শেখা আর নতুন করে শুরু করার এক সুন্দর গল্প। আদিফা একটু চুপ করে থেকে বলল, আপু, তাহলে ক্যালেন্ডার বদলানো মানে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করেছে? আরিবা হাসিমুখে বললেন, হ্যাঁ আদিফা। মানুষ বুঝেছিল, ভুল আঁকড়ে ধরে থাকলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যায় না। জানালার বাইরে আদিফা দেখল, আব্বু মসজিদ থেকে নামাজ শেষে হালকা মর্নিং ওয়াক করে ফিরছেন, হাতে নতুন ক্যালেন্ডার। সে বলল, আপু, এখন তো সারা পৃথিবী প্রায় একই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে, তাই না? আরিবা বললো, বেশিরভাগ দেশই করে। এতে ভ্রমণ, পড়াশোনা আর ব্যবসা-সবই সহজ হয়েছে।
আদিফার চোখ চকচক করে উঠল।
-তাহলে ক্যালেন্ডার আমাদের বন্ধুদের মতো সবাইকে একসঙ্গে রাখে?
খুব সুন্দর কথা বলেছ- আরিবা হাসলো। ক্যালেন্ডার আমাদের শেখায় সময় সবার জন্য এক, আর সময়কে ঠিকভাবে ধরতে হলে জ্ঞান আর পরিবর্তনের দরকার।
মা চা নিয়ে এলেন। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল নতুন বছরের এক ধরনের নরম উষ্ণতা।
আদিফা মনে মনে ভাবল- ইতিহাস শুধু পুরোনো দিনের গল্প নয়; এটি আজকের দিনকে বোঝার চাবি। স্কুলে ফিরে সে বন্ধুদের বলবে, ‘জানো, একসময় সেপ্টেম্বর মাসে ১১ দিনই ছিল না!’
তার ছোট্ট মনে তখন একটাই অনুভূতি- নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; নতুনভাবে ভাবা, প্রশ্ন করা আর শেখার সাহস নেওয়া। জানুয়ারির প্রথম দিনটি তাই তাদের কাছে হয়ে উঠল- একটি তারিখের চেয়েও বেশি, একটি জীবন্ত ইতিহাসের গল্প।