হযরত শাহজালাল (রহ.)
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০৫
॥ অধ্যাপক আশরাফ জামান ॥
পীরে কামেল হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহ.) আরবের ইয়েমেন প্রদেশে ৫৯৮ হিজরী সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ। বাল্যকালেই তার পিতা ও মাতা ইন্তেকাল করেন। শৈশবে তার মামা সৈয়দ আহমদ কবীর সোহরাওয়ার্দী তাকে পুত্রস্নেহে লালন-পালন করেন।
তার পিতা কুরাইশ বংশীয় ও মাতা সৈয়দ বংশীয় ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেইশাহজালাল মামা হযরত আহমদ কবীর সোহরাওয়ার্দীর কাছে শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেন এবং ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত শরীয়ত ও মারেফতের বিদ্যা হাসিল করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত সুফী সাধক।
দিল্লি থেকে হযরত শাহজালাল (রহ.) বদায়ন হয়ে মুসলিম বাংলার প্রথম রাজধানী লক্ষ্মাবতীতে আগমন করেন। এখানে এসেই তিনি ইসলাম প্রচার করেন এবং বেশকিছু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কথিত আছে একটি গাছের নিচে এসে আস্তানা গাড়েন।
ধীরে ধীরে লোকজন তার কাছে আসতে থাকে এবং তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়। এ মাকা অবন দেও-দৈত্যের উপদ্রবে মানুষ অশান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। হযরত শাহজালালের প্রবেশের পর দেও-দৈত্যগুলো তখন সে স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। মানুষ শান্তি লাভ করে। এভাবে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় শাহজালালের (রহ.) অবদানে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। এভাবে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সূত্রপাত।
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী আন্দোলনের নেতা হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ জন শিষ্য নিয়ে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে পদার্পণ করেন।
তখন গৌড় রাজ্যের অধীনস্ত ছিলেন রাজা গৌড় গোবিন্দ। সিলেট ছিল রাজধানীর নাম, গৌড় গোবিন্দের রাজত্বকালে সিলেটে কয়েকজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বসবাস করতেন।
জানা যায়, সিলেট শহরের অদূরবর্তী টুলটিকর মহল্লায় এক ধর্মপ্রাণ মুসলমান বোরহান উদ্দিন তার পুত্রের আকিকা উপলক্ষে একটি গরু জবাই করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে একটি পাখি এক খণ্ড গোশত জনৈক ব্রাহ্মণের বাড়িতে ফেলে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রাহ্মণ গৌড় গোবিন্দের কাছে এজন্য বিচার প্রার্থনা করে। জাদুবিদ্যায়ও রাজা পারদর্শী ছিল।
রাজা গৌড় গোবিন্দের হুকুমে সে শিশু সন্তানসহ বোরহান উদ্দিনকে ধরে আনা হয়। জালিম রাজা গৌড় গোবিন্দ শিশুটিকে বাবার হাত থেকে নিয়ে টুকরো টকরো করে হত্যার নির্দেশ দেয়। রাজার নির্দেশ পালিত হয়।
এমন পাশবিক অত্যাচার, কোনো মানুষই সহ্য করতে পারে না।
বোরহান উদ্দিন তৎকালীন সুলতান ফিরোজ শাহের কাছে এ জুলুমের ইনসাফ চেয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেন।
সুলতান তার সেনাপতি সিকান্দার খানকে এর প্রতিকারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু শেখ সিকান্দারের সিলেট অভিযান ব্যর্থ হয়। এ সময় হযরত শাহজালাল সোনারগাঁয়ে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর সিকান্দার খান ও নাসিরউদ্দীন একত্র হয়ে হযরত শাহজালালের (র.) খিদমতে হাজির হন।
হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহ.) তাদের জন্য দোয়া করেন ও ৩৬০ জন শিষ্যসহ জিহাদে শরিক হন গৌড় গোবিন্দ খবর পেয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর নৌকা বা খেয়া পারের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। মুসলিম বাহিনীসহ হযরত শাহজালাল তখন হবিনা চর্ম নির্মিত জায়নামাজে করে নদী পার হন।
১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে চৌকিতে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে গৌড় গোবিন্দের বাহিনীর প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যখন ঝাঁকে ঝাঁকে মুসলিম বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর গোবিন্দের সেনাদলের ওপর পড়তে থাকল, তখন তারা মনে করল হযরত শাহজালালের অলৌকিক শক্তির প্রভাবে বুঝি তাদেরই তীর ফিরে আসছে। ফলে গোবিন্দের সেনাদল ভীত হয়ে পড়ল।
যুদ্ধে হযরত শাহজালালের বাহিনী বিজয়ী হলো। রাজা গৌড় গোবিন্দকে তিনি ক্ষমা করলেন রাজা-রাজের আশা ত্যাগ করে পলায়ন করলেন।
হযরত শাহজালাল (রহ.) এ দেশে এসেছেন ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার করার জন্য, রাজ্য জয় করার জন্য নয়। ইয়েমেনের শাহজাদা ও পিতৃরাজ্য ত্যাগ করে আল্লাহর ওলি হযরত শাহজালালের সঙ্গী হয়ে সিলেটে আগমন করেছিলেন।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আদেশে তিনদিন পর্যন্ত আল্লাহর শোকর গুজারী করা হয়। তারই আদেশে এক শিষ্য সিলেটে প্রকাশ্যে আজান দিলেন। এর ফলে গৌড় গোবিন্দের পৌত্তলিক প্রাসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ল। সিলেটে কালেমার পতাকা উড্ডীন হলো।
৭০৩ থেকে ৭০৮ হিজরী পর্যন্ত হযরত শাহজালাল ও তার অনুসারী ওলি-দরবেশদের দ্বারা ও তাদের আউলাদের অংশবিশেষ সিলেট তরফ বিজিত হয়। সিলেটে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের পটভূমি ও বুনিয়াদ এ সময়ের মধ্যেই রচিত হয়। সিলেট ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হযরত শাহজালাল (রহ.) নিশ্চিন্তে ধর্ম সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং একাধারে চল্লিশ বছর রোজা রাখেন।
৭৪৮ হিজরী সনে বাংলার আউলিয়া কুলের শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৫০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।