স্কুলের প্রথম দিন
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০৪
শাকেরা বেগম শিমু
সকাল থেকেই আম্মু তাড়া লাগাচ্ছেন, “শিমু, তাড়াতাড়ি নাশতা সেরে এই কাপড়গুলো পরে ফেল।”
: কিন্তু কেন আম্মু? আজ কি কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবে?
: আরে না রে না, আজ তো তোকে স্কুলে ভর্তি করানো হবে। সবার ছেলেমেয়ে দেখিস না কেমন সেজেগুজে স্কুলে যায়? কাল থেকে ইনশাআল্লাহ আমার মেয়েও যাবে। নে এবার তাড়াতাড়ি নাশতাটা খেয়ে নে তো।
: সে কী আম্মু! আমার আবার এ বয়সে স্কুল! আমি স্কুলে যাবো না। স্কুলে গেলে আমি মাঠে গিয়ে গোল্লাছুট খেলবো কখন? আর বড়বাড়িতেই বা তেঁতুল কুড়াতে যাবো কীভাবে?
: পাগলামি করিস না তো, দেখিস না তোর বয়সী সবাই এখন স্কুলে যায়, তুই আর কতদিন এভাবে খেলেধুলে কাটাবি? তোকেও তো লেখাপড়া শিখতে হবে রে মা। তুই অনেক বড় হবি লেখাপড়া করে। মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবি। তোকে অনেক অনেক বড় হতে হবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তাই আজ তোর “স্কুলের প্রথম দিন”॥
যা এখন তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নে। যাঃ
*****
কি আর করা। আম্মুর কথায় একরকম অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাপরগুলো পরে রেডি হতে হলো। মা নতুন জুতাটা পরিয়ে দিলেন আর বললেন স্কুলে যেন কারো সাথে কোনোপ্রকার খারাপ ব্যবহার না করি। সাথে আরো একগাদা উপদেশ শুনিয়ে আমাকে ছেড়ে দিলেন ‘মবু’ ভাইয়ের সাথে স্কুলে যাবার জন্য।
আমার মনে কীরকম একটা শিহরণ হচ্ছিলো যে আজ আমার “স্কুলের প্রথম দিন”। কাল থেকেই যদি স্কুলে যাওয়া শুরু হয় তবে তো আর আমার হাঁড়িপাতিল নিয়ে খেলা করা ভেস্তে যাবে। মার্বেলও খেলতে পারতাম, তাও বা খেলবো কখন? এসব কথা ভাবছিলাম আর আনমনে গুটিগুটি পায়ে ভাইয়ের সাথে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমার ধ্যান ভাঙলো ভাইয়ের ডাক শুনে।
: আচ্ছা শিমু, তুমি কি তোমার ডান হাত দিয়ে বাম কানটা ছুঁতে পারো।
: এটা কি কোনো একটা কাজ হলো? পারবো না কেন এই দেখো এ বলে আমি ডান হাতটা বুকের নিচের দিকে বাড়িয়ে আমার বাম কানটা ছুঁই। তা দেখে ভাই হেসে বলেন-
: আরে পাগলি ওভাবে না। ওপর দিয়ে বুঝলে? তোমার হাতটা মাথার ওপর দিয়ে নিয়ে ঐপাশের কানটা ছুঁতে হবে। কারণ এটাই হলো স্কুলে ভর্তি হবার প্রাথমিক শর্ত বা নিয়ম।
: এটা কেমন কথা! স্কুলে ভর্তির সাথে লেখাপড়ার সম্পর্ক না হয়ে কানের সম্পর্ক হলো কীভাবে? এসবের মানে টা কী?
: ইশ, এই বোনটা তো দেখছি আমায় জ্বালিয়ে খেলো! আমি অতসব জানি না। স্কুলের নিয়ম এটা; এটা আগে থেকেই সবার ক্ষেত্রে এ নিয়ম চলে আসছে, তাই তোমার ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না, বুঝলে পাকনা বুড়ি?
: আচ্ছা বুঝলাম, আর যদি আমি কান ছুঁতে না পারি, তাহলে?
: তাহলে আর কি, সোজা তোমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে।
ভাইয়ের এ কথায় আমার মধ্যে এক ধরনের অপমানবোধ কাজ করলো। আমি মনে মনে জেদ ধরি চাহে কান ছুঁতে পারি কি না, স্কুলি ভর্তি আমি হবোই।
হ্যাঁ, এতে যা হয় হবে কিন্তু স্কুলে আমাকে ভর্তি হতেই হবে। কিছুতেই আমি ভর্তি না হতে পারার অপমান গায়ে মাখতে পারবো না। হুহ!
এসব ভাবতে ভাবতে ভাইয়ের সাথে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম স্কুলে। ওরে বাবারে! কী বড় দুটি বিল্ডিং! স্কুল আবার এত বড়ও হয় নাকি! এসবই ছিলো তখন আমার শিশুমনের কৌতূহল আর ভাবনা।
মবুভাই আমাকে নিয়ে হেড স্যারের অফিসে ঢুকলেন। তখন সালাম বিনিময়ের পর হাসিব নামে একজন স্যারের সাথে কথা বললেন যে-
: আমার এই বোনটাকে স্কুলে ভর্তি করাতে চাই।
: সে কি আপনার আপন বোন?
: জ্বি না, সে আমার বড় মামার দ্বীতিয় মেয়ে।
: আচ্ছা, নাম কি ওর?
: ওর নাম “শাকেরা বেগম শিমু”।
: বাবার নাম?
: হাজী মোঃ লিয়াকত আলী।
: বয়স কত ওর?
: পাঁচ বছর
: ওর জন্ম কবে?
: ১৯৯৩ সালের ১৮ এপ্রিল স্যার।
: ঠিক আছে, বলে স্যার কম্পিউটার নিয়ে বসে গেলেন। একটু পরে ভাইকে বলে আমাকে ডেকে নিলেন। আমি কাঁচুমাচু করে সালাম দিলাম উনাকে। স্যার হাসিমুখে সালামের জবাব দিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি আমার নাম বললাম। তারপর স্যার উঠে এসে আমাকে বললেন, তোমার ডান হাতটা সামনে বাড়াও তো। আমি হাত বাড়ালে স্যার হাতটা ধরে আমার মাথার ওপর দিয়ে নিয়ে কানটা ছোঁয়াতে চেষ্টা করলেন। আমিও তাই চাইছিলাম যেন কানটা ছুঁতে পারিÑ যাতে স্কুলের খাতায় আমার নামটা উঠে আসে। কিন্তু না আমার হাত কিছুতেই আমার কান পর্যন্ত যাচ্ছে না। স্যার আবারো চেষ্টা করলেন। কিন্তু এখনো সেই আগের মতোই দুই ইঞ্চি দূরে গিয়ে হাত থেমে যায়। এদিকে আমি একরকম হাঁপিয়ে উঠেছি প্রায়।
হাত দিয়ে কান স্পর্শ করানোর জন্য যেই না স্যার হাত আরো একটু টেনে ধরলেন, অমনি আমি খামচে ধরলাম স্যারের শার্টের কলার। ধরে দিলাম স্যারকে এক রামধাক্কা। আমার ধাক্কাতে স্যার কিছুটা দূরে গিয়ে ছিটকে দাঁড়ালেন। আমি আমার হাতটা ওপর নিচ করছি আর স্যারকে কচি মুখে একগাদা কথা শুনিয়ে দিলাম যে- “ছাড়ুন তো আমার হাত। এই দেখুন আমি পারি কি না,” এ বলে আমি আমার মাথার পিছন দিকে হাত নিয়ে বাম কানে ছোঁয়ালাম। তখনো আমি বিড়বিড় করে আউড়ে চলছিÑ “টেনে টেনে একেবারে আমার হাতটাই ছিঁড়ে ফেলছিলেন”। বাহরে…..!
অবস্থা তখন বেগতিক দেখে হেড স্যার হাসিব স্যারকে ডেকে বললেন, “আপনি ওর নাম খাতায় লিখে ফেলুন। আমি দেখছি কী করা যায়”। হাসিব স্যারও জ্বি স্যার বলে আবার কম্পিউটার ও খাতা নিয়ে বসে পড়লেন। আমি মবু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, ভাই একটু লাজুক ভঙ্গিতে মিটিমিটি হাসছেন। হয়তো ভাইকে তখন অনেকটাই লজ্জার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো আমার জন্য।
এখন এ দিনগুলো কেবল স্মৃতি! কালের পরিক্রমায় আমি এখন আমেরিকার নাগরিক। ভাইয়াও বিয়েশাদী করে তিনটি সন্তানের পিতা। আর নেই সেই স্কুল, নেই সেই গোল্লাছুট খেলার মাঠ। সেটা এখন অর্ধেকই ঢুকে গেছে দালানবাড়ির ভিতরে। নেই সেই মার্বেল খেলার ছোট্ট সাথীরা। ওরা সবাই এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। কেউ দেশে, কেউ আবার আমার মতোই বিদেশের বাসিন্দা হয়ে ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু আমার তো মনে হয় এই কিছুদিন আগেই তো সবাই মিলে চড়ুইভাতি খেতাম, বা লুকোচুরি খেলতাম একসাথে। এখন অধিকাংশই সংসারি।
কেউবা আবার এ দুনিয়া থেকেও বিদায় নিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। এমনকি সেই মবু ভাইও আজ আর এ জগতে নেই। উনিও এক রমজানের শুক্রবার ফজরের সময়ে মাবুদের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন উপরওয়ালার কাছে! আর আজ সেই সোনালি দিনগুলো শুধু স্মৃতি হয়েই চোখে ভাসে। থাক না সেগুলো স্মৃতিই হয়ে। বর্তমান জীবনে ওসব নিয়ে ভাবার সময়ই-বা কোথায়।
লেখিকা : মিশিগান, আমেরিকা প্রবাসী।