নির্বাচন বানচালে ভারত ও আওয়ামী লীগের ড্রেস রিহার্সেল
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৫
॥ জামশেদ মেহদী॥
এই ‘সোনার বাংলাতেই’ আমি একাধিকবার লিখেছি যে, আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানা ছাড়া বাংলাদেশে নির্বাচন কেউ বানচাল করতে চায় না। আমি এ কথাও অনেকবার বলেছি যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতায় আসতে চাননি। এক-এগারোর সময়েও তাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার অফার দিয়েছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ। কিন্তু তিনি সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এবারও জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার সময় তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন। বিপ্লবের অগ্রনায়ক ছাত্রনেতৃবৃন্দ দেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাকে বার বার অনুরোধ করলে একপর্যায়ে তিনি ভাবেন যে, ছেলেরা এত বড় কুরবানি করলো। আমারও তো দেশের প্রতি কিছু দায়ভার আছে। শেষ বয়সে এসে সেই দায়ভারের তাগিদেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হতে সম্মত হন।
তার ওপর তো কোনো ম্যান্ডেট ছিল না যে, তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। বরং তিনিই বলেছিলেন যে, ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে তিনি চলে যাবেন। ড. ইউনূস তার কথা রেখেছেন। আগামী বছর জুনের আগেই ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন দেওয়ার জন্য তার সরকার নির্বাচন কমিশনকে সবরকম সহযোগিতা দিচ্ছে। সারা দেশে একটি আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আমি আগের লেখাগুলোয় সাথে সাথে এ কথাও বলেছি যে, ড. ইউনূস এবং জুলাই বিপ্লবের শক্তিগুলো নির্বাচন চাইলে কী হবে, বাংলাদেশের বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রভু ভারত এ নির্বাচন প্রথম থেকেই মেনে নেয়নি এবং আজও মানে না। ভারত প্রথম থেকেই চেষ্টা করছে নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য বাংলাদেশে প্রবল অস্থিরতা সৃষ্টি করার। বিগত ১৬ মাসে বিভিন্ন দাবি-দাওয়াভিত্তিক শতাধিক আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে তারা সেই আন্দোলনকে সহিংস পথে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ যে মুহূর্তে জনগণ বুঝতে পেরেছেন যে, এসব দাবি-দাওয়ার আন্দোলনের পেছনে পতিত সরকারের এজেন্টদের উসকানি রয়েছে, তখনই তারা সেখান থেকে সরে গেছে।
ইতোমধ্যে সরকার ঘোষণা করেছে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার আগেই দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ঘোষণার পরপরই সারা দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে থাকে। তফসিল ঘোষণার বেশ আগে থেকেই নির্বাচনী হাওয়া সৃষ্টির কারণ হলো, জনগণ বিগত ১৭ বছর ভোট দিতে পারেননি। ১৭ বছর পর যখন একটি সুযোগ এসেছে, তখন তারা সেই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করবেন।
কিন্তু নির্বাচনের এ ঘোষণায় ভারত এবং তাদের দাসানুদাস আওয়ামী লীগের মাথায় বাজ পড়ে। যদি নির্বাচন হয়ে যায় এবং সেই নির্বাচনে যারাই জিতুক না কেন, তাদের শেখ হাসিনার মতো নাচের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তারা আরো বুঝতে পারে যে, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা।’ এই স্লোগান দিয়েছেন সর্বশ্রেণির মানুষ। তবে বিশেষভাবে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন সেসব তরুণ, যাদের বয়স ২৪ থেকে ৩৮। এবার যদি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে পরেরবার অর্থাৎ ২০৩১ সালের নির্বাচনে ঐ তরুণদের বয়স হবে ৩৫ বছর বা তার ঊর্ধ্বে। এরাই তখন হবেন রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। সর্বশেষ আদমশুমারি এবং সর্বশেষ ভোটার লিস্ট থেকে জানা যায় যে, এ তরুণ গোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ কোটির কিছু ঊর্ধ্বে। পরবর্তীতে তাদের বয়স ৬০ হওয়া পর্যন্ত তারাই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং অন্যসব সেক্টর ডমিনেট করবেন। সুতরাং নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণায় ভারত এবং আওয়ামী ঘরানার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
এরই মধ্যে গণহত্যার বিচারের রায় ঘোষিত হয়। সেই রায়ে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। ঐ রায়ে আরো বলা হয় যে, রায় ঘোষণার পর থেকে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যদি তারা উচ্চ আদালতে আপিল না করেন, তাহলে তাদের আর আপিল করার সুযোগ থাকবে না। সেক্ষেত্রে তারা দেশে আসেন অথবা বিদেশে থাকেন, যদি বাংলাদেশ সরকার তাদের নাগালের মধ্যে পায়, তাহলে সেই রায় কার্যকর হবে।
এ রায় ছিল ভারত এবং আওয়ামী ঘরানার মাথায় দ্বিতীয়বার বজ্রপতন। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। ঘোষিত তফসিল মোতাবেক আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আর মাত্র ১ মাস ২৫ দিন অবশিষ্ট রয়েছে। নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় যাক, তারা শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড খণ্ডাতে পারবে না। এর মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে গেছে। সেটি হলো মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিডিআর ম্যাসাকারের স্বাধীন তদন্ত কমিশন রিপোর্ট। ঐ রিপোর্টে কোনোরূপ রাখঢাক না করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে যে, বিডিআর ম্যাসাকার ঘটিয়েছে ৩টি শক্তির মিলিত প্রয়াস। এ ৩টি শক্তি হলো- আওয়ামী লীগের সরকার, জেনারেল মঈনের সেনাবাহিনী এবং ভারত সরকার। তদন্ত রিপোর্ট একবার যখন দিনের আলো দেখেছে, তখন আগামী কোনো সরকার এ রিপোর্ট আর চেপে রাখতে পারবে না। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে বিচার করতেই হবে। আর বিচার করতে গেলেই ফেঁসে যাবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ সরকার, সেনাবাহিনীতে মঈন উ আহমেদের অনুগত অংশ এবং ভারত সরকার।
এসব আসন্ন বিপদ সম্যকভাবে উপলব্ধি করার পর ভারত এবং আওয়ামী লীগের মাথা খারাপ হয়েছে। তাদের যেকোনো মূল্যে নির্বাচন বানচাল করতেই হবে। আর প্রয়োজন হলে তার জন্য অনেক রক্ত ঝরিয়ে হলেও সেটি করতে হবে।
ভারত এবং আওয়ামী লীগ সেই রক্তপাতের ড্রেস রিহার্সেল করেছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলিবর্ষণ করে।
শরীফ ওসমান হাদিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের মাঝ থেকে নিয়ে যাবেন, নাকি রেখে দেবেন, সেটি তিনিই জানেন। তবে এ মুহূর্তে ওসমান হাদি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এ লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে, তখন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালে তার অবস্থা কোন পর্যায়ে যায়, সেটি কেউ জানে না। তবে যতই দিন যাচ্ছে, ততই ওসমান হাদিকে কারা গুলি করেছে, কেন গুলি করেছে এবং কীভাবে এ হামলা সাজিয়েছে, তার অনেক কিছুই বেরিয়ে আসছে।
বিশ্ববিখ্যাত টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের কয়েকটি ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, ‘পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা গত কয়েক মাসে অন্তত ৮০ জন সুব্রত বাইনের মতো আততায়ীকে দেশের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করিয়েছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ড, কুষ্টিয়া মেহেরপুর অঞ্চলের চরমপন্থি গ্রুপ এক হয়ে নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতা, এলাকার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করে হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি সুব্রত বাইনের হ্যান্ডলার ছিলেন, জামিনে থাকা পিচ্চি হেলাল ও চরমপন্থি গ্রুপ গণমুক্তি ফৌজের প্রধান মুকুল সম্প্রতি টেলিফোনে কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন।
সুব্রত বাইন কারাগার থেকে তার মেয়ের মোবাইলে ফোন দিয়ে কনফারেন্স করে পিচ্চি হেলাল ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পলাতক মুকুলের সাথে কথা বলেছে। পরবর্তীতে সুব্রত বাইনের মেয়ে সিনথিয়া বিতু নেপালে পলাতক বিডিআর মামলার পলাতক আসামি লেদার লিটন, পিচ্চি হেলাল, মুকুল, বাড্ডার বড় সাঈদ ও দিপুর সাথে কথা বলিয়ে দেয়।’
কদরুদ্দিন শিশির নামক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বাংলাদেশের অন্যতম সাংবাদিক ‘দি ডিসেন্ট’ নামে একটি ডিজিটাল অনুসন্ধানী নিউজ পোর্টালে লিখেছেন, ‘ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর ডাকাতির সময় অস্ত্রসহ গ্রেফতার হলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়।’
গত ১৩ ডিসেম্বর একটি বাংলা সহযোগীর রিপোর্ট মোতাবেক দিল্লি এবং আওয়ামী লীগের প্রথম টার্গেট ছিলেন ৩ জন। এরা হলেন- শরীফ ওসমান হাদি, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং এনসিপির অন্যতম শীর্ষনেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। হাদির ওপর গুলিবর্ষণের পূর্বে বরিশালের এক সমাবেশে যখন ব্যারিস্টার ফুয়াদ বক্তৃতা করছিলেন, তখন তার ওপর হামলা করা হয়। তবে হামলাকারীরা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। ব্যরিষ্টার ফুয়াদ আহত হলেও হামলাকারীদের জনগণ প্রতিরোধ করেন এবং প্রতিরোধের মুখে হানাদাররা পালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন হামলার তথ্য পেয়ে আমরা সরকারকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
দেশি এবং বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেসব খবর থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যা প্রচেষ্টাই প্রথম এবং শেষ প্রচেষ্টা নয়। আগামী দিনগুলোয় নির্বাচন বানচাল করার জন্য আওয়ামী লীগ এবং ভারত মরণপণ চেষ্টা চালাবে। বাংলাদেশে এদের কোনো শক্তি ও সমর্থন নাই। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এই যে, বিশাল ভারত তাদের সক্রিয় মদদদাতা এবং বাংলা-ভারতের বিশাল অভিন্ন সীমান্ত এসব ঘাতকের জন্য ভারত উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর সোমবার রাতে যখন এ ভাষ্য লিখছি, তখন পর্যন্ত ঘাতক ফয়সাল করিম এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ ধরা পড়েনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, ময়মনসিংহ বিশেষ করে হালুয়াঘাট বর্ডারে বিডিআরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, এ নিরাপত্তাবর্ম ভেদ করে যেন কিলাররা পালিয়ে যেতে না পারে। তবে অভিজ্ঞ মহল বলছেন যে, বেলা আড়াইটায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি করে ফয়সাল করিম এবং আলমগীর সরাসরি সাভার যায়। সাভার থেকে তারা হালুয়াঘাট বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। মাঝখানে তারা একাধিকবার তাদের বাহন এবং পোশাক বদল করে।
বাংলাদেশের আরেকটি বাংলা দৈনিক খবর দিয়েছে যে, বিগত ৬ মাস ধরে এ ধরনের কিলিং মিশনকে ভারতে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথম অপারেশনে তারা আংশিক সফল। এরপর একের পর এক অপারেশন চলবে।
সুখের বিষয়, ড. ইউনূসের সরকার এবং জনগণ ভারত এবং আওয়ামী লীগের এ হত্যা মিশনের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছেন। ইতোমধ্যেই জামায়াত, শিবির, এনসিপি, ড. মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে নাগরিক সমাজসহ সকলেই ভারতীয় আধিপত্য মোকাবিলায় এখন ঐক্যবদ্ধ। ড. ইউনূস বলেছেন, হাদির ওপর আক্রমণ বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ।
এ স্পিরিট নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী আধিপত্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারকে মোকাবিলা করলে ওরা যত শক্তিই প্রয়োগ করুক, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রাকে দমাতে পারবে না।