গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির অবস্থা সংকটাপন্ন
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৩৮
স্টাফ রিপোর্টার : গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর প্রকাশ্যে দিবালোকে পরিকল্পিতভাবে গুলি চালানো হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হওয়ার পর স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে। গত ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের দেওয়া এক এক বিবৃতিতে এমন তথ্য জানানো হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। গুলি ওসমান হাদির মাথার এক পাশ দিয়ে প্রবেশ করে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর পরবর্তীতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৫ ডিসেম্বর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক সিদ্ধান্তে তাকে আরও উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল।
সংকটাপন্ন হাদির অবস্থা
সন্ত্রাসীদের গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালে (এসজিএইচ) চিকিৎসাধীন শরীফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন এবং অপরিবর্তিত রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, তিনি এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। দেশটি নিউরো সার্জনদের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী হাদির ব্রেইনের ইস্কেমিক পরিবর্তন ও ইডেমা কমেনি; ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ‘টাইম উইন্ডো’কেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে সিঙ্গাপুরে হাদির চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরো সার্জন ও হাদির চিকিৎসায় যুক্ত ডা. আব্দুল আহাদ। তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঢাকায় অস্ত্রোপচার ও নিবিড় চিকিৎসা শেষে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি কমপ্লেক্সে ভর্তির পর থেকেই নিউরো সার্জারি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার টিম যৌথভাবে তার চিকিৎসা শুরু করে। নেওয়ার পর করা ব্রেইনের সিটি স্ক্যানে হাদির বাম পাশের ইস্কেমিক পরিবর্তন অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি ব্রেইনে ফোলা বা ইডেমা এখনো বিদ্যমান। ব্রেইন স্টেমে আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকুলার সিস্টেমেও চাপ তৈরি হয়েছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালটিতে হাদির চিকিৎসকদের বরাতে ডা. আব্দুল আহাদ জানান, বর্তমানে হাদির কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস কৃত্রিম ভেন্টিলেশনের সহায়তায় সচল রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার জিসিএস স্কোরে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ নিউরোলজিক্যাল রেসপন্সে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি বা অবনতি কোনোটিই লক্ষ করা যাচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। ব্রেইন ইনজুরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা বা ‘টাইম উইন্ডো’ থাকে, যার মধ্যে যদি শরীর ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে পরবর্তী অবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সময়সীমার মধ্যেই হাদির শরীর কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কী না, সেদিকেই এখন চিকিৎসকদের নজর। ডা. আহাদ আরও জানান, হাদির ফুসফুসের সর্বশেষ সিটি স্ক্যানে আগের মতোই রক্তের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ কারণেই বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তাঁর বুকে চেস্ট ড্রেন দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরেও সেই জটিলতা মাথায় রেখেই শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থাপনা চলমান রয়েছে।
এদিকে, ১৬ ডিসেম্বর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের দেওয়ার বিবৃতিতে বলা হয়, মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় সিঙ্গাপুর থেকে তার (শরীফ ওসমান হাদি) ভাইয়ের তরফ থেকে জানা যায়, শরীফ ওসমান হাদির প্রাইমারি টেস্টের (প্রাথমিক পরীক্ষা) পর অবস্থার কিছুটা অবনতি দেখা গেলেও বর্তমানে তা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে।’ ওসমান হাদির আরেকটি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তবে সেটি করার মতো শারীরিক পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।’
ঘাতক অধরা, বেশ কয়েকজন আটক
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার মূল সন্দেহভাজন পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ। কোনো কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে ফয়সাল ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে পুলিশ বলছে, এমন তথ্য তাদের কাছে নেই। হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিকানা নিয়ে আদালতে নতুন তথ্য দিয়েছেন ফয়সালের ঘনিষ্ঠবন্ধু এবং এ মামলার অপর আসামি মো. কবির। তার দাবি, মোটরসাইকেলটি তার বন্ধু মাইনুদ্দিন ইসলাম শুভ কিনেছেন। তবে কেনার সময় তার জাতীয় পরিচয়পত্রটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এ মামলায় পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী মো. কবিরের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গত মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামানের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এদিন কবিরকে আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক কবির এবং তিনি মোটরসাইকেল সরবরাহের মাধ্যমে অপরাধে সহযোগিতা করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তবে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। শুনানিতে কবির আদালতকে বলেন, তিনি উবার গাড়ি চালাতেন এবং মাঝেমধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ তাকে ফোন করে গুলশানসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। প্রায় ১৮ থেকে ২০ দিন আগে ফয়সাল ফোন করে তাকে হাদির অফিসে নিয়ে যেতে বলেন এবং সেখানে নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেলটি তার বন্ধু মাইনুদ্দিন ইসলাম শুভ কিনেছেন। তারা দুজন একই দিনে মোটরসাইকেল কিনতে যান। তখন শুভ তার (কবিরের) আইডি কার্ড ব্যবহার করে মোটরসাইকেলটি কেনেন। মোটরসাইকেলের অন্যান্য কাগজপত্র শুভর নামে রয়েছে এবং অনেক দিন আগে সেটি কেনা হয়েছে। এর আগে ১৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন এলাকা থেকে কবিরকে গ্রেফতার করে র্যাব। গত ১৪ ডিসেম্বর রোববার ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
প্রসঙ্গত, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রচার চালাচ্ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার মতিঝিল এলাকায় প্রচার চালিয়ে ফেরার পথে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে মোটরসাইকেল থেকে তাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদিকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ওই রাতেই তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে তার ভাই ছাড়া বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্সরা রয়েছেন।